হালুয়াঘাট সাবরেজিস্ট্রি অফিসে সিন্ডিকেট বাণিজ্যের অভিযোগ
রুহুল আমীন খান, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৪ পিএম
ছবি : ভোরের কাগজ
ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী উপজেলা হালুয়াঘাটের সাবরেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে জমি ক্রেতা-বিক্রেতারা নানা ধরনের হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ গুনতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
জানা গেছে, একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সাবরেজিস্ট্রি অফিসের কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছে। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঘোষ বাণিজ্য বেড়েছে কয়েকগুণ। সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা আদায় এবং নানা ধরনের হয়রানির কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতি সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হালুয়াঘাট সাবরেজিস্ট্রি অফিসে চাঁদাবাজির কারণে প্রায় প্রতিদিনই হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। তাদের দাবি, বিগত সরকারের সময় গড়ে ওঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে স্থানীয় একটি রাজনৈতিক অংশের যোগসাজশে জমি রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে সরকারি ফির পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এতে জমি ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
উপজেলার ভুবনকুড়া ইউনিয়নের সিরাজুল ইসলাম জানান, কিছুদিন আগে একই এলাকার জুবেদ আলীর ২ কাঠা জমি তার নামে রেজিস্ট্রি করতে গেলে নানা অজুহাতে দলিল লেখক সমিতির লোকজন তার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা আদায় করেন। উপায় না দেখে বাধ্য হয়ে ওই টাকা দিতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
হালুয়াঘাট উপজেলার সাবেক বিএনপি নেতা নাজিম আহমেদ বলেন, “আওয়ামী লীগের পতন হলেও তাদের দোসরদের পতন হয়নি। তারা স্থানীয় বিএনপির একটি অংশের সঙ্গে আঁতাত করে সাবরেজিস্ট্রি অফিসকে একটি অদৃশ্য শক্তিতে পরিণত করেছে। শুধু এই প্রতিষ্ঠান নয়, তাদের ইশারায় সরকারি বিভিন্ন অফিসেও ঘুষ লেনদেন চলে আসছে।”
তিনি আরও বলেন, “স্থানীয় বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার যোগসাজশে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে দলিল লেখক সমিতির নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় করা হচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত হয়রানি করা হচ্ছে। ৫ আগস্টের আগেও যেভাবে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে চাঁদা আদায় হতো, সরকার পরিবর্তনের পরও জমি ক্রেতা-বিক্রেতাদের জিম্মি করে একইভাবে টাকা আদায় করা হচ্ছে।”
ভুক্তভোগী মহলের অভিযোগ, হালুয়াঘাট সাবরেজিস্ট্রি অফিসে সিন্ডিকেট বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য, সরকারি কাজে প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার চলছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমেও এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
সেবা নিতে আসা অনেকের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা দিতে না চাইলে নানা অজুহাতে কাজ বিলম্ব করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, সংশ্লিষ্ট অফিসের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দলিল লেখকদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ছাড়া সরকারি কাজ সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তাদের অভিযোগ, দলিল রেজিস্ট্রি বা জমি সংক্রান্ত যেকোনো সরকারি কাজে গেলে বিভিন্ন অজুহাতে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি করা হয় এবং সময়ক্ষেপণ করা হয়।
হালুয়াঘাট সাবরেজিস্ট্রি অফিস থেকে দালাল ও সিন্ডিকেট চক্রকে উৎখাতে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন এবং উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষ কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে- এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে জবাবদিহিতা দাবি করেছেন উপজেলাবাসী।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হালুয়াঘাট উপজেলা দলিল লেখক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা। তিনি বলেন, “এখানে এ ধরনের কোনো অভিযোগ নেই। সেদিন স্থানীয় এমপি সালমান মো. রুবেলের লোকজন জড়ো হয়ে যে ঘটনা ঘটিয়েছে, তার কোনো ভিত্তি নেই। এ বিষয়ে ইউএনও স্যার আমাদের ডেকেছিলেন। তাকে সব বিষয় জানানো হয়েছে।”
চাঁদা নেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা পার্টির সঙ্গে সমন্বয় করে কিছু টাকা নিই। তা না হলে চলব কীভাবে? কারও কাছ থেকে ২ হাজার টাকা, জমির পরিমাণ অনুযায়ী বড়জোর ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। এর বাইরে এখানে বড় ধরনের অর্থ লেনদেনের কোনো অভিযোগ নেই।”
এ বিষয়ে হালুয়াঘাট উপজেলার সাবরেজিস্ট্রার গোলাম সারোয়ারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
