গণপিটুনিতে এক মাসে প্রাণ গেছে ৩২ জনের
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৪০ পিএম
ফাইল ছবি
গত এক মাসে সারাদেশে গণপিটুনিতে প্রাণ গেছে ৩২ জনের। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) গত অক্টোবরের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই পরিসংখ্যান। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে নিহতের সংখ্যা বেড়েছে ৩৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। আর গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৬৪টি।
ইসলাম অবমাননার অভিযোগে গত ১৩ অক্টোবর সাতক্ষীরার দেবহাটায় এক যুবককে ঘিরে ধরে উত্তেজিত জনতা। তাদের মারধরে নিহত হন ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের ওই ব্যক্তি।
সাতক্ষীরার ওই ঘটনার রেশ না কাটতেই গত ২৫ অক্টোবর রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় অটোরিকশা চুরির অভিযোগে দুই যুবককে পিটিয়ে হত্যা করে এলাকাবাসী। পরদিন ভোরে একই জেলার মিঠাপুকুরে গরু চোর সন্দেহে খালিদ হাসান (৩২) নামের এক যুবককে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়।
এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে গণপিটুনিতে নিহত হন ২৩ জন। অক্টোবরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ জনে। একই সময়ে আহতের সংখ্যা ৭৪ থেকে কমে ৫৪ জনে দাঁড়িয়েছে। সংস্থাটি বলছে, আহতের সংখ্যা কমা সহিংসতার মাত্রা কমে যাওয়ার প্রমাণ নয়। এটি বরং নির্দেশ করে, বর্তমানে গণপিটুনির ধরন অনেক বেশি আক্রমণাত্মক এবং সরাসরি প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করছে।
অক্টোবরে সংঘটিত ৬৪টি গণপিটুনির ঘটনা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বেশির ভাগ হামলা হয়েছে চুরির সন্দেহে। শুধু চুরির অভিযোগেই পিটিয়ে হত্যা করা হয় ১৪ জনকে। এর মধ্যে রংপুরে অটোরিকশা ও গরু চুরির অভিযোগে নিহত হয়েছেন তিনজন।
টঙ্গী, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামেও চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। সাধারণ বিবাদ ও সামাজিক বিরোধের জেরে নিহত হয়েছেন ৫ জন। চাঁদাবাজি ও জমি নিয়ে বিরোধসহ নানা অভিযোগে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ১১ জন।
সাতক্ষীরা ও রংপুর ছাড়াও অক্টোবরে চুয়াডাঙ্গা, গাজীপুর, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ অন্তত ২৪ জেলায় গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। বাদ যায়নি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। টাঙ্গাইল, গাইবান্ধা ও কুষ্টিয়ার বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষক ও পরিচালকদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন বা বলাৎকারের অভিযোগ উঠেছিল। এসব ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থার পরিবর্তে জনতা সরাসরি তাদের গণপিটুনি দেয়।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বলাৎকারের অভিযোগে গণপিটুনির শিকার এক মাদ্রাসাশিক্ষককে উদ্ধার করতে গিয়ে উত্তেজিত জনতার হামলায় গুরুতর আহত হন তিন পুলিশ সদস্য। গত ৮ অক্টোবর উপজেলার খলিশাকুন্ডি ইউনিয়নের মালিথাপাড়া এলাকায় অবস্থিত মার্কাজুল মাদ্রাসায় এ ঘটনা ঘটে।
এমএসএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অক্টোবরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিমা ভাঙচুর ও মন্দিরে চুরির ঘটনা ঘটেছে ৩৫টি। দুটি ঘটনায় বসতবাড়িতে হামলা হয়েছে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রতিশোধমূলক হামলায় বিএনপির চারজন ও আওয়ামী লীগের একজন নিহত হয়েছেন।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন বলছে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার সত্যতা যাচাই করা এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। চুরির সন্দেহ ও অন্য কোনো অভিযোগে কাউকে পিটিয়ে হত্যা বা নির্যাতনের অধিকার কারও নেই। বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিতের পাশাপাশি অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনা উচিত।
মবের পেছনে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতাকে দায়ী করছেন মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিন এলান। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থার স্থবিরতার সুযোগে মানুষের মধ্যে নিজের হাতেই আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও দায়মুক্তি এই অপরাধকে উৎসাহিত করছে। হত্যার পরও মব ভায়োলেন্সে জড়িত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজার কোনো নজির দেখা যায় না। বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। এটি সমাজে মব জাস্টিসের একটি স্থায়ী অপসংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। এ ছাড়া দলবদ্ধভাবে হিংস্র হয়ে ওঠার প্রবণতা এবং ব্যক্তিগত আক্রোশ ও দ্বন্দ্ব চরিতার্থ করার অস্ত্র হিসেবেও মব ভায়োলেন্সকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
নাসির উদ্দিন এলান বলেন, ‘মব ভায়োলেন্সে জড়িতদের অবশ্যই চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এমন ব্যাপকভিত্তিক প্রচার চালানো জরুরি।’
