×

জাতীয়

আন্দোলনের ‘প্ল্যান-বি’ নিয়ে মাঠে তারা

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দাবি মেনে নিল সরকার

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৪, ১০:০৫ পিএম

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দাবি মেনে নিল সরকার

ছবি: সংগৃহীত

চলমান কোটা সংস্কারের আন্দোলনের পর সরকার জনজীবনকে যখন স্বাভাবিক করতে চাইছে তখনই বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক চিহ্নিত কিছু শিক্ষার্থী নিয়ে মাঠে নামলেন। এর ফলে সোমবার (২৯ জুলাই) ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ নানা জায়গায় তারা জড়ো হতে চাইলেও পুলিশ তাদেরকে হটিয়ে দেয়। এরপরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসে শিক্ষকদের দাবি মেনে নিয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রত্যয়’ স্কিমে যুক্ত রাখবে না সরকার। কিন্তু এরপরেও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা আন্দোলন থেকে সরে আসবেন কিনা তা রাত ৯টা পর্যন্ত খোলাসা করেননি।  

প্রসঙ্গত, সর্বজনীন পেনশন স্কিম প্রত্যাহারের দাবিতে গত ১ জুলাই থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ করে সর্বাত্মক কর্মবিরতিতে যান দেশের প্রায় ৩৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের ডাকে এই কর্মসূচি শুরু হয়। এই ইস্যুতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে তাদের বৈঠক হয়। কিন্ত সমাধান না আসায় ফের আন্দোলন চালু রাখেন তারা। এদিন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠকে তাদের দাবি মেনে নেয় সরকার।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে জামায়াত-শিবির ঢুকে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পাশাপাশি সরকারকে ফেলে দেয়া ছিল তাদের প্রথম পরিকল্পনা। কিন্তু সরকারের কঠোর সিদ্ধান্তের কারণে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। এরপর তারা এদিন আন্দোলনের প্ল্যান-বি (দ্বিতীয় পরিকল্পনা) নিয়ে হাজির হয়। এবার শুধু শিক্ষার্থী আর জামায়াত-শিবির নয়, সঙ্গে নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা আন্দোলনে নামলে নতুন মাত্রা পাবে এবং তাতে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা যাবে-এমন পরিকল্পনায় তারা নতুন কিছু দাবি তুলে রাস্তায় নামার চেষ্টা করে। কিন্তু পুলিশের কঠোরতার কারণে আন্দোলনকারীরা আধাঘণ্টার মধ্যেই হাওয়া হয়ে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মন্ত্রী ভোরের কাগজকে বলেন, গত ১ জুলাই থেকে সর্বজনীন পেনশন স্কিম ‘প্রত্যয়’-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তারা সেটি না মেনে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। শিক্ষকদের আন্দোলনের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু করে এবং সেটি পরে সহিংস হয়ে উঠে। এখন সরকারের শক্তি দিয়ে সেই আন্দোলন দমন করার মধ্যেই বার্তা আসে সর্বজনীন পেনশন স্কিম নিয়ে শিক্ষকদের আন্দোলন না থামালে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও আন্দোলনে থামবেন। শিক্ষকরা আন্দোলন শুরু করলে সরকার আরো চাপে পড়বে। এ কারণে আন্দোলনরত শিক্ষকদের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।  

প্রসঙ্গত, সেই বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী মহিববুল হাসান চৌধুরী, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী শামসুন্নাহার চাঁপা, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী, ডিজিএফআই প্রতিনিধি, এনএসআই প্রতিনিধি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতনরা অংশ নেন। 

বৈঠকে অংশ নেয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অধ্যাপক জানান, সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রত্যয়’ স্কিম থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রত্যাহার করা হয়েছে। অর্থাৎ ২৯ জুলাইয়ের সভায় নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রত্যয় স্কিমে যুক্ত হবেন না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে শিগগিরই আদেশ জারি করবেন। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের স্বতন্ত্র পে-স্কেল দেয়া যায় কিনা সে বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। 

আন্দোলনের ‘প্ল্যান-বি’ ঠেকাতেই কি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেনশন সংক্রান্ত দাবি মেনে নিল সরকার-এমন প্রশ্নের জবাবে বিষয়টিকে এভাবে বিশ্লেষণ করা উচিত হবে না জানিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মন্ত্রী ভোরের কাগজকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সরকারের দেয়া সর্বজনীন পেনশন স্কিমে যেতে চাইছেন না। তারা সরকারের কাছে কিছু দাবিও দিয়েছিলেন। শিক্ষকদের দাবি সরকার আগেই মেনে নিয়েছিল। এদিনের বৈঠকে সেই বিষয়টিতে আরো পাকাপোক্ত সিদ্ধান্ত হলো। এখন অর্থ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আদেশ জারি করবে। 

কিন্তু তড়িঘড়ি করে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য কোনো বার্তা ছিল কি-এমন প্রশ্নের জবাবে ওই মন্ত্রী বলেন, যেসব সমস্যা আলোচনার মধ্যে শেষ করা যায় সেগুলো আলোচনা করে মিটিয়ে ফেলা উত্তম। বিশেষ চাপ দিয়ে সব আন্দোলনকে নিবৃত্ত করা যায় না বলেও জানান তিনি। 

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের কোষাধ্যক্ষ সাব্বির আহমেদ চৌধুরী ভোরের কাগজকে বলেছেন, শিক্ষকদের দাবি সরকার মেনে নিয়েছে। এখন শিক্ষকরা ফেডারেশনের নেতাদের নিয়ে মিটিং করে তাদের অবস্থান সরকারকে জানিয়ে দেবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সাইদ ফেরদৌসের সভাপতিত্বে এদিন বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে  শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা-মামলা ও নির্বিচারে গণগ্রেফতারের প্রতিবাদে সমাবেশ করেছে ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক সমাজ’। 

সমাবেশ থেকে আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তি ও দ্রুত সব ক্যাম্পাস খুলে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুশাদ ফরিদী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক সায়মন রেজা, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ নাহিদ নেওয়াজ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসুদ ইমরান, ঢাবির আন্তর্জাতিক ব্যবসা বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস, গ্রিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রীতু শরমিন, স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তামান্না মাকসুদ ও ঢাবির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুনসহ প্রমুখ। 

সমাবেশ শেষে দেশাত্মবোধক গানে গানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত স্থানগুলোতে পদযাত্রা করেন শিক্ষকরা। এর আগে শাহবাগে জড়ো হয়ে সেখান থেকে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে আসেন তারা। কর্মসূচির শুরুতে তারা এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়েও এমন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। 

প্রসঙ্গত, শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের আন্দোলন গত ১৬ জুলাই সহিংস রূপ পাওয়ার পর এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তবে সরকারের তরফ থেকে ১৫০ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। 

২০১৮ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করে জারি করা পরিপত্র হাই কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করলে ছাত্ররা চলতি জুলাইয়ের শুরু থেকে ফের মাঠে। ধীরে ধীরে তাদের আন্দোলনের মাত্রা ও ব্যপ্তি বাড়তে থাকে। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সঙ্গে কোটা আন্দোলনকারীদের সংঘাতের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। পরদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রংপুর থেকে ৬ জনের মৃত্যুর খবর আসে। 

এর প্রতিক্রিয়ায় ১৮ জুলাই সারা দেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা হয়। সেদিন মাঠে নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরাও। গোটা দেশে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় রাষ্ট্রীয় সম্পদে হামলা শুরু হয়। প্রাণহানির সংখ্যাও বাড়তে থাকে। রামপুরায় বিটিভি ভবন, মেট্ররেলের দুটি স্টেশন, বনানীতে সেতু ভবন, মহাখালীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ভাংচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাব স্টেশন, মেট্রোরেলের দুটি স্টেশনেও ভাংচুর হয় সেদিন। 

পরদিন পরিস্থিতির অবনতি হলে কারফিউ জারি করে সেনা মোতায়েন করা হয় সারা দেশে। দুই দফায় তিন দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলে পুরো দেশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসায় কারফিউ শিথিল করে অফিস-আদালত ও কলকারখানা আবার খুলে দেয়া হয়েছে। দূরপাল্লার বাস ও লঞ্চ চলাচল শুরু হলেও ট্রেন চলাচল এখনো বন্ধ আছে। 

টাইমলাইন: কোটা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

হাজিদের জন্য বড় সুখবর দিলো ধর্ম মন্ত্রণালয়

হাজিদের জন্য বড় সুখবর দিলো ধর্ম মন্ত্রণালয়

‘এমন কার্ড দেন, যা দিয়ে বাসায় গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে’

আসিফ মাহমুদ ‘এমন কার্ড দেন, যা দিয়ে বাসায় গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে’

২০১৩ সালের চুক্তিতে হাসিনাকে ফেরত পাঠাবে ভারত?

২০১৩ সালের চুক্তিতে হাসিনাকে ফেরত পাঠাবে ভারত?

২০২৭ সালে গৃহযুদ্ধের শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র

২০২৭ সালে গৃহযুদ্ধের শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App