সূচনা ও সমাপ্তি বিএনপির হাতে, শেষ হচ্ছে র্যাবের ২ যুগের ইতিহাস
মাহিদুল হোসেন সানি
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বাংলাদেশের একটি বিশেষায়িত এলিট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ এবং ২০০০ সালের শুরুর দিকে দেশে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পায়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন বিএনপি–জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ২০০৩ সালের ১৪ এপ্রিল ‘সশস্ত্র পুলিশ ব্যাটালিয়ন (সংশোধন) আইন, ২০০৩’ কার্যকর করার মাধ্যমে র্যাব গঠনের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়। পরবর্তীতে ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে বাহিনীটি। ওই সময় এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হতো।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন জঙ্গিবিরোধী অভিযান, বিশেষ করে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযান, মাদকবিরোধী কার্যক্রম এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বাহিনীটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন সময়ে আলোচিত অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও অপহৃত ব্যক্তিদের উদ্ধারেও সাফল্য দেখায় তারা।
আরো পড়ুন: বিলুপ্ত হচ্ছে র্যাব, আসছে ‘এসআরবি’
২০০৬ সালে বিএনপি–জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর রাজনৈতিক সংকটের মুখে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগ আমলেও র্যাবের অভিযান অব্যাহত থাকে। তবে একই সময়ে বাহিনীটির বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগ নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ ছিল, র্যাবের একাধিক অভিযানে বহু ব্যক্তি "বন্দুকযুদ্ধ" বা "ক্রসফায়ারে" নিহত হয়েছেন। সংস্থাগুলো এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানালেও, র্যাব বরাবরই দাবি করে এসেছে যে—অভিযান পরিচালনাকালে আত্মরক্ষার্থেই এসব ঘটনা ঘটেছে।
অন্যদিকে, বিভিন্ন সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় র্যাবের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ ওঠে। ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় র্যাব-১১-এর কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযুক্ত হন। পরবর্তীতে আদালত র্যাবের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তাসহ আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন, যা র্যাবের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত বিচারিক ঘটনাগুলোর একটি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ২০০৯ সালের পর একাধিক প্রতিবেদনে র্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাব এবং এর কয়েকজন সাবেক ও তৎকালীন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। যদিও তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার ও র্যাব এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট টানা ১৭ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ৬ আগস্ট জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করা হয় এবং ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।
আরো পড়ুন: মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা করা হচ্ছে
দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দাবির মুখে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার র্যাবের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। সে সময় তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা র্যাবের নাম পরিবর্তন করে 'স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স (SIF)' রাখার প্রাথমিক সিদ্ধান্তের কথা জানান।
পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পুনর্নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করে। নতুন বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চলতি বছরের আগস্টে র্যাবকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করে 'স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)' নামে নতুন একটি বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের উদ্যোগ সম্পন্ন করে। এ লক্ষ্যে 'স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬'-এর খসড়া প্রস্তুত করা হয়।
প্রস্তাবিত নতুন আইন অনুযায়ী, পুরোনো র্যাব বিলুপ্ত হয়ে সরাসরি বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে 'স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)' হিসেবে কাজ করবে। অতীতের অভিযোগগুলো রোধে নতুন কাঠামোর অধীনে একটি ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ থাকবে।
আরো পড়ুন: স্যার, এগুলোকে কি নিয়ে যাবো বাহিরে
নাম পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাহিনীটির দীর্ঘ ২৪ বছরের বিতর্কিত ও আলোচিত ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটবে। নতুন আইনে এসআরবি সদস্যরা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা পাবেন। বিশেষ করে মাদক, অস্ত্র, বিস্ফোরক, সন্ত্রাসবাদ, মানবপাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ, সাইবার অপরাধ এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে পারবে এই বাহিনী।
একই সঙ্গে সরকার বা পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) নির্দেশে ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত পরিচালনার সুযোগও রাখা হয়েছে। অন্তত সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তা এই তদন্ত পরিচালনা করবেন এবং পুরো প্রক্রিয়ায় ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ রেগুলেশন অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের সুবিধার্থে এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ থাকবে।
