ব্রিকস সম্মেলন
ভারতে যাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৪ পিএম
ফাইল ছবি
ভারতে অনুষ্ঠেয় বহুল আলোচিত ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঢাকার এ সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে দিল্লিকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা ও দিল্লির একাধিক কূটনৈতিক সূত্র। প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে তাঁর একজন প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেবেন বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ প্রোগ্রামে বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গত ১৪ জুলাই ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন কূটনৈতিক চিঠির মাধ্যমে এ আমন্ত্রণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়।
সোমবার (১০ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়ে এখনো কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি। তাঁর ভাষ্য, ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে নয়, বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আমন্ত্রণপত্রে তারেক রহমানের নামের আগে ‘প্রধানমন্ত্রী’ শব্দটি উল্লেখ করা হয়নি। তাঁদের মতে, এটি কূটনৈতিকভাবে বিব্রতকর। কারণ তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং একই সঙ্গে পদাধিকারবলে বিমসটেকের চেয়ারপারসন।
দিল্লির দূতের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
এদিকে সোমবার ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে ভারতের কাছে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের বিষয়টি তোলা হয়। পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের শহীদ শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজনদেরও দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘র’ প্রধানের ঢাকা সফর নিয়ে যা বললেন তথ্য উপদেষ্টা
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, হাদি হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজনদের বিষয়ে ভারত যেসব কাগজপত্র চেয়েছিল, সেগুলো ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দ্রুত প্রত্যর্পণের জন্য ভারতকে অনুরোধ করা হয়েছে।
দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ইতিবাচক ও সহায়ক পরিবেশ তৈরির ওপরও বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান খলিলুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশকে হেয়প্রতিপন্ন করে এমন কোনো পদক্ষেপ ভারত নেবে না বলে হাইকমিশনার আশ্বস্ত করেছেন।
সীমান্ত হত্যা, পুশইনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, এসব বিষয় মূলত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনার বিষয়, সরকারপ্রধান পর্যায়ের বৈঠকে এগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা হয়নি।
৫ আগস্টের ঘটনাও আলোচনায়
বৈঠকে গত ৫ আগস্টের ঘটনা নিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর দাবি, এ বিষয়ে বাংলাদেশের অসন্তোষ ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে এবং ভারত বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করেছে।
খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের বিচার বিভাগের প্রতি অবজ্ঞা বা বিদ্বেষ ছড়ানোর মতো কোনো কর্মকাণ্ড যাতে ভবিষ্যতে না ঘটে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে। তাঁর ভাষ্য, ভারতের পক্ষ থেকে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হওয়ার বিষয়ে তিনি কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছেন।
সম্পর্ক কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা বলা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
ব্রিকসের আমন্ত্রণ নিয়ে কূটনৈতিক বিতর্ক
প্রধানমন্ত্রীর ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কূটনীতিক গণমাধ্যমকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সম্মেলনে যাওয়ার কোনো তথ্য তাঁর কাছে নেই। সফরের সিদ্ধান্ত হলে সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা আসত।
ভিভিআইপি সফর নিয়ে কাজ করেন এমন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর নিয়ে কোনো প্রস্তুতি তাঁর জানা নেই। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন নিউইয়র্ক সফরের প্রস্তুতিই অগ্রাধিকার পাচ্ছে। আগামী ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক যাওয়ার কথা রয়েছে।
আরও পড়ুন: ৭১ ও ২৪-এর শহীদদের স্বপ্নপূরণে সবাইকে কাজ করতে হবে
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো ভারতের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। তাঁদের মতে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপোড়েনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লিতে আমন্ত্রণ জানিয়ে ভারত কূটনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক এম. শহীদুজ্জামান বলেন, বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য খুব বেশি গুরুত্ব বহন করে না। তাঁর মতে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হলে আগে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মৌলিক বিষয়গুলোতে ভারতের নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
হাইকমিশনারের বক্তব্য
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর দীনেশ ত্রিবেদী জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তিনি তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও দূরদর্শী মনোভাব নিয়ে কাজ করার ভারতের আগ্রহের কথাও জানান তিনি।
দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বৈঠকে মতবিনিময় হয়েছে বলে জানায় ভারতীয় হাইকমিশন। জনগণকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও জোরদারের উপায় নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গেও বৈঠক করেন ভারতীয় হাইকমিশনার।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যু থাকা স্বাভাবিক। তবে নেতৃত্ব পর্যায়ে নিয়মিত আলোচনা হলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব।
ভারতীয় হাইকমিশনার আরও বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক পরিবর্তন করার সুযোগ নেই। দুই দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা— সম্পর্ক ভালো থাকুক। বিদ্যমান সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে আগামী দিনে দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
