×

জাতীয়

প্রতিদিন গড়ে ১০ খুন, নিয়ন্ত্রণহীন সহিংসতায় বাড়ছে উদ্বেগ

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৮ পিএম

প্রতিদিন গড়ে ১০ খুন, নিয়ন্ত্রণহীন সহিংসতায় বাড়ছে উদ্বেগ

ছবি : সংগৃহীত

রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত কয়েক মাসে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক সংঘাত ও মব সহিংসতার ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে থেকে জুলাই—এই তিন মাসে সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৯৩৪টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৩১১টির বেশি হত্যা মামলা হয়েছে। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ১০টিরও বেশি হত্যা মামলা হয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতি মাসে কমবেশি ৩০০টি খুনের ঘটনা ঘটছে। তার ভাষায়, গড়ে প্রতিদিন ১০টি হত্যাকাণ্ড যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

সাত মাসে দুই হাজারের বেশি হত্যা মামলা

পুলিশের হিসাব বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মোট ২ হাজার ৭৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি, মার্চে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি, মে মাসে ৩১০টি, জুনে ৩২৬টি এবং জুলাইয়ে ২৯৮টি মামলা হয়েছে।

অর্থাৎ মাসভেদে কিছুটা ওঠানামা থাকলেও হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছে।

তবে অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু মামলা ও গ্রেপ্তার দিয়ে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি সম্ভব নয়। হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

মব ও রাজনৈতিক সহিংসতায়ও উদ্বেগ

হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংঘাত ও মব সহিংসতার ঘটনাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে মব সহিংসতায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৭৭ জন। এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ৪০০টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ২ হাজার ৯৭৪ জন।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, স্থানীয় বিরোধ, মাদক, পারিবারিক কলহ, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তারসহ নানা কারণে হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতা বাড়ছে।

অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, বর্তমানে অনেক মানুষের হাতে অস্ত্র চলে গেছে। অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালানও বেড়েছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক বিরোধ ও ক্ষমতার আধিপত্যের কারণে সহিংসতা বাড়ছে।

সরকার পরিবর্তনের পরও কমেনি হত্যা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। বিভিন্ন থানায় হামলা ও অস্ত্র লুটের ঘটনাও ঘটে। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ছয় মাসেও হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১ হাজার ৭৮৯টি মামলা হয়েছে। এর আগের ছয় মাসে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭৮০টি। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে ৯টি।

শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাও বেড়েছে। গত ছয় মাসে এ ধরনের ঘটনায় ১১ হাজার ১৬৫টি মামলা হয়েছে। এর আগের ছয় মাসে মামলা হয়েছিল ১০ হাজার ৯০টি। অর্থাৎ বেড়েছে ১ হাজার ৭৫টি মামলা।

রাজনৈতিক কোন্দলেও প্রাণহানি

রাজনৈতিক বিরোধও সাম্প্রতিক সহিংসতার অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। গত রোববার (২৩ আগস্ট) রাতে কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতা আল আমিনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি, জামায়াত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এনসিপির মধ্যে সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতার ৪০০টি ঘটনায় অন্তত ৭৭ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সংঘাতে চারজন, জামায়াত ও বিএনপির সংঘাতে নয়জন এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১৬ জন নিহত হয়েছেন।

মানবাধিকারকর্মী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এলিনা খান বলেন, নির্বাচিত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতা বাড়ছে। পদ-পদবি ও আধিপত্য নিয়ে সংঘাত হচ্ছে। এসব ঘটনার দায় সরকারকেই নিতে হবে।

তবে পুলিশের দাবি, রাজনৈতিক সংঘাত নতুন কিছু নয়। এসব ঘটনা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে এবং সরকারের পক্ষ থেকে তাদের ওপর কোনো ধরনের চাপ নেই।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন

চলতি বছরে ঢাকার মিরপুরে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। ওই ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় নিম্ন আদালত মামলার রায় দেন।

তবে অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, একটি ঘটনায় দ্রুত বিচার হলেও দেশে প্রতিনিয়ত নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। সব ঘটনায় একই ধরনের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

তাদের মতে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো পুরোপুরি আগের সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। এই সুযোগে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বাড়ছে।

অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, খুন ও সহিংসতার মতো অপরাধ বাড়লেও সেগুলো দমনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষায়িত অভিযান চালানো এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন।

থামছে না মব সহিংসতাও

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মব সহিংসতা নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও এ ধরনের ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে মব সহিংসতায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকায় ৫০ জন এবং চট্টগ্রামে ৩১ জন নিহত হয়েছেন।

মানবাধিকারকর্মী এলিনা খান বলেন, মানুষ সরকারের কাছে নিরাপত্তা চায়। যেকোনো মূল্যে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

অবশ্য পুলিশের অতিরিক্ত আইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম দাবি করেছেন, আগের তুলনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে প্রতিদিন গড়ে ১০টির মতো হত্যা মামলা, রাজনৈতিক সংঘাত এবং মব সহিংসতার ধারাবাহিক ঘটনা সেই দাবির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে শুধু অপরাধীদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না। অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার বন্ধ, রাজনৈতিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রীরা হিজাব পড়তে পারবে না

হাইকোর্টের রায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রীরা হিজাব পড়তে পারবে না

প্রতিদিন গড়ে ১০ খুন, নিয়ন্ত্রণহীন সহিংসতায় বাড়ছে উদ্বেগ

প্রতিদিন গড়ে ১০ খুন, নিয়ন্ত্রণহীন সহিংসতায় বাড়ছে উদ্বেগ

মারা গেছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

মারা গেছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

‘প্রতিদিন গড়ে ১০ জন খুন, ব্যর্থ সরকারের দৃষ্টান্ত’

‘প্রতিদিন গড়ে ১০ জন খুন, ব্যর্থ সরকারের দৃষ্টান্ত’

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App