বিড়ালের আঁচড়ের পর শিশুর ‘মিউ মিউ’ শব্দ, জানা গেল আসল কারণ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। ভিডিওতে এক শিশুকে বিড়ালের মতো ‘মিউ মিউ’ শব্দ করতে দেখা যায়। ভিডিওটির সঙ্গে দাবি করা হয়, পোষা বিড়ালের আঁচড়ের পর শিশুটির এমন অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিয়েছে। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিশুটি জলাতঙ্কে আক্রান্ত নয়; চিকিৎসকেরা তার এমন আচরণকে প্যানিক অ্যাটাকের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে জানিয়েছেন।
অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস টুডে’ গত ২০ আগস্ট তাদের ফেসবুক পেজে ‘পোষা বিড়ালের আঁচড় খেয়ে অস্বাভাবিক আচরণ বালিকার’ শিরোনামে ভিডিওটি প্রকাশ করে। এতে শিশুটিকে ‘মিউ মিউ’ শব্দ করতে দেখা যায়। তবে ভিডিওর ক্যাপশন বা বিবরণে ঘটনাটি কোথায় ঘটেছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তির কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, এটি জলাতঙ্কের লক্ষণ হতে পারে এবং চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে রাজশাহী নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুর পর্যন্ত ভিডিওটি প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ বার দেখা হয়েছে। ‘টাইমস টুডে’র পাশাপাশি চ্যানেল আই, এশিয়া পোস্টসহ আরও কয়েকটি গণমাধ্যমও বিস্তারিত তথ্য ছাড়াই ভিডিওটি প্রচার করে।
আরও পড়ুন: বিআরটিসির বাসে নানা সমস্যা, ৯ দফা দাবি বেরোবি প্রশাসনের
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুটিকে নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়। কেউ ঘটনাটিকে ‘নাটক’ বলে মন্তব্য করেন, আবার কেউ প্রশ্ন তোলেন, বিড়ালের আঁচড়ের কারণে কোনো শিশুর এমন আচরণ করার আদৌ সম্ভাবনা আছে কি না।
অনুসন্ধানে যা জানা গেল
রিউমর স্ক্যানারের ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশন টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৭ আগস্ট শিশুটিকে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখানকার চিকিৎসকদের পরামর্শে পরে তাকে ঢাকায় নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা জানান, শিশুটির প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে এবং বর্তমানে সে অনুযায়ীই তার চিকিৎসা চলছে।
কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের দুই কর্মকর্তার ১৭ ও ১৮ আগস্টের ফেসবুক পোস্ট থেকে জানা যায়, ১৭ আগস্ট সন্ধ্যায় শিশুটির মা-বাবা তাকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন। সে সময় শিশুটি বিড়ালের মতো আচরণ করছিল। পোস্টগুলোতে দাবি করা হয়েছিল, পাঁচ বছর বয়সী শিশুটি বাসার পোষা বিড়ালের আঁচড়ের পর জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়েছে। পাঁচ মাস আগে তাকে র্যাবিসের টিকাও দেওয়া হয়েছিল বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়।
অর্থাৎ, ঘটনাটি ১৭ আগস্টের হলেও ২০ আগস্টের পর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
চিকিৎসকেরা কী বলছেন
কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ইকবাল হোসেন ২২ আগস্ট সাংবাদিকদের জানান, বিড়ালের আঁচড়ের পর শিশুটিকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও র্যাবিসের টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে শিশুটির মধ্যে জলাতঙ্কের কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি।
শিশুটির ‘মিউ মিউ’ শব্দ করা বা অস্বাভাবিক আচরণ প্রসঙ্গে ডা. ইকবাল বলেন, এর সঙ্গে জলাতঙ্কের সম্পর্ক রয়েছে- এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ভয় বা মানসিক চাপ থেকেও শিশুর এ ধরনের আচরণ হতে পারে।
অনুসন্ধানে শিশুটির নাম মুস্তারীন আদ্রিতা বলে জানা গেছে। সে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার বাহিরচর এলাকার ব্যাংকার সাব্বিরের মেয়ে।
২২ আগস্ট সন্ধ্যায় শিশুটির মামা মো. আলিফ রহমান ফেসবুকে জানান, শিশুটি আগের তুলনায় অনেকটা সুস্থ। পোস্টের সঙ্গে দেওয়া ভিডিওতে তাকে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে দেখা যায়। একই সঙ্গে তিনি শিশুটিকে নিয়ে যাচাই ছাড়া মন্তব্য বা হাসাহাসি না করার অনুরোধ জানান।
ঢাকায় পরীক্ষার পর জানা গেল প্যানিক অ্যাটাক
শিশুটির মা জানান, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল থেকে তাকে ঢাকার মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, শিশুটি জলাতঙ্কে আক্রান্ত নয়; তার প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে। বর্তমানে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা চলছে। তবে শিশুটির কাশি কিছুটা বেশি রয়েছে।
তিনি আরও জানান, তার মেয়ে গত দুই বছর ধরে ঠান্ডা ও অ্যাজমার সমস্যায় ভুগছে। এ কারণে কুষ্টিয়ায় একজন চিকিৎসকের অধীনে তার নিয়মিত চিকিৎসা চলছে এবং মাঝেমধ্যে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছে।
শিশুটির মা বলেন, তাদের বাসায় দুটি পোষা বিড়াল ছিল। সেগুলো হঠাৎ চলে যাওয়ার পর শিশুটির মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। পরবর্তীতে তার প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
শিশুটি তখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। তার বুকের এক্স-রে করা হয়েছে। রিপোর্ট ভালো থাকলে এক-দুই দিনের মধ্যে তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হতে পারে বলে জানান তার মা।
প্যানিক অ্যাটাকে অস্বাভাবিক আচরণ হতে পারে
প্যানিক অ্যাটাকের সময় শিশুদের মধ্যে অস্বাভাবিক শারীরিক ও আচরণগত প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, তীব্র ভয় বা আতঙ্কের সময় দ্রুত শ্বাস নেওয়ার ফলে গলার মাংসপেশিতে সংকোচন তৈরি হতে পারে, যার কারণে কান্না বা গোঙানির মতো স্বরের পরিবর্তন ঘটতে পারে।
এমএসডি ম্যানুয়ালসের একটি লেখাতেও প্যানিক অ্যাটাকের শারীরিক উপসর্গের মধ্যে হাঁপানো বা অস্বাভাবিক শব্দ করার মতো প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। ২০১৭ সালের একটি গবেষণায়ও বলা হয়েছে, কোনো ভীতিকর ঘটনার কারণে শিশু মানসিকভাবে চরম চাপের মধ্যে পড়লে ‘ডিসোসিয়েশন’ বা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতার মতো অবস্থায় যেতে পারে। এ সময় অবচেতনভাবে বিড়ালের ডাক অনুকরণসহ বিভিন্ন অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিতে পারে।
তবে বিড়ালের আঁচড়ের কারণে কোনো শিশু স্বাভাবিকভাবে বিড়ালের মতো ‘মিউ মিউ’ শব্দ করবে- এমন কোনো চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিড়ালের আঁচড় থেকে ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজ হতে পারে। এ ছাড়া শারীরিক ব্যথা, ভয় বা আতঙ্কের কারণে শিশুর কান্না, খিটখিটে মেজাজ কিংবা আতঙ্কিত আচরণ দেখা দিতে পারে; তবে এতে তার কণ্ঠস্বর বিড়ালের ডাকে পরিণত হওয়ার কথা নয়।
যাচাই ছাড়া ভিডিও প্রচারে বিভ্রান্তি
ঘটনাটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি শিশুটির আচরণ নিয়ে নানা অনুমান ও বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। বিস্তারিত তথ্য যাচাই না করেই একাধিক গণমাধ্যমে ভিডিওটি প্রকাশিত হওয়ায় সেই বিভ্রান্তি আরও ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষ করে ঘটনার স্থান, সময়, শিশুটির পরিচয়, চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ কিংবা আচরণের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে কোনো তথ্য না থাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের অনেকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কেউ শিশুটিকে ‘নাটক’ করার অভিযোগ করেছেন, আবার কেউ তাকে জলাতঙ্কে আক্রান্ত বলে দাবি করেছেন।
তবে পরবর্তী অনুসন্ধান ও চিকিৎসকদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, শিশুটি জলাতঙ্কে আক্রান্ত নয়। ঢাকার মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা তার আচরণকে প্যানিক অ্যাটাক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ফলে একটি ভিডিও দেখে শিশুটির রোগ নির্ণয় করা কিংবা তাকে নিয়ে উপহাস-বিদ্রূপ করা দুটিই ছিল অযাচিত। ঘটনাটি আবারও দেখিয়েছে, অসুস্থতা বা অস্বাভাবিক আচরণসংক্রান্ত কোনো ভিডিও যাচাই ছাড়া প্রচার করলে তা কত দ্রুত জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এমন সংবেদনশীল বিষয় প্রকাশের আগে ঘটনার স্থান, সময়, চিকিৎসকদের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করা জরুরি।
