অনুমোদন মিলেছে, তবু পে-স্কেলের গেজেট হচ্ছে না কেন?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩১ পিএম
ফাইল ছবি
মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়ার পরও নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ হয়নি। নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটবে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর। তখন এক সপ্তাহের মধ্যে গেজেট প্রকাশের কথা বলা হলেও এরই মধ্যে ১২ দিন পেরিয়ে গেছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন করে অপেক্ষা ও নানা প্রশ্ন।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং বা আইনি যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। ভেটিং শেষ হওয়ার পর প্রয়োজনীয় এসআরও নম্বর দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হবে। অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পে-স্কেল মূল সিদ্ধান্তের পর্যায়ে আটকে নেই; বরং মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরের আনুষ্ঠানিক ও আইনি প্রক্রিয়াতেই সময় লাগছে।
কোথায় আছে পে-স্কেলের গেজেট?
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর নবম পে-স্কেলের রেজল্যুশন গত ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ে (বিজি প্রেস) পাঠানো হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে তা অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফেরত আসে। এরপর প্রজ্ঞাপনটি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে।
আইনি যাচাই শেষ হলে প্রজ্ঞাপনে এসআরও নম্বর দেওয়া হবে। এরপরই বাংলাদেশ গেজেটে নতুন বেতনকাঠামো প্রকাশের কথা রয়েছে।
অর্থাৎ, বর্তমানে পে-স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অপেক্ষা আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হওয়ার দিকে। এই ধাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তাহলে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরও এত সময় কেন?
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর দ্রুত গেজেট প্রকাশের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে। কারণ বেতনকাঠামোর খসড়া, রেজল্যুশন ও প্রজ্ঞাপনের কাজ অনুমোদনের আগেই অনেকটা এগিয়ে ছিল। ফলে অনুমোদনের পর এক সপ্তাহের মধ্যে গেজেট প্রকাশের কথা বলা হলেও নির্ধারিত সময়ে তা হয়নি।
আরও পড়ুন: কৃষি মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে ৬ তলা হেঁটে উঠলেন প্রধানমন্ত্রী
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদন মূল নীতিগত সিদ্ধান্তকে অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তকে কার্যকর করতে আরও কিছু প্রশাসনিক ও আইনি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। প্রজ্ঞাপন চূড়ান্ত করা, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং এসআরও জারির মতো প্রক্রিয়াগুলো শেষ হওয়ার পরই গেজেট প্রকাশ করা সম্ভব।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের পে-স্কেল নিয়ে কাজ করা এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মন্ত্রিসভার অনুমোদন মূল সিদ্ধান্তের অনুমোদন। এরপর অনুমোদিত সিদ্ধান্তকে আইনগত ও প্রশাসনিকভাবে কার্যকর করার জন্য প্রজ্ঞাপন ও এসআরও তৈরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এখন আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং চলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আসলে পে-স্কেল আটকে নেই। এটি বাস্তবায়নের শেষ ধাপের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হওয়ার পরই গেজেট প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
জুডিশিয়ারি সার্ভিসের বেতন-ভাতায়ও জটিলতা
গেজেট প্রকাশে বিলম্বের পেছনে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি জুডিশিয়ারি সার্ভিসের বেতন ও বিভিন্ন ভাতা নিয়েও কিছু বিষয় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা নিয়ে কিছু বিষয় সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। নতুন বেতনকাঠামোর সঙ্গে এসব বিষয় কীভাবে সামঞ্জস্য করা হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের কিছু ভাতা নিয়ে তাদের প্রত্যাশা এবং অর্থ বিভাগের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করে গেজেট প্রকাশের ব্যাপারে সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কবে থেকে কার্যকর নতুন বেতনকাঠামো?
গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভা নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদন করে। একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য জয়েন্ট ফোর্সেস ইনস্ট্রাকশনও অনুমোদিত হয়। নতুন বেতনকাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘খালি ভারত ভারত না করে নিজের দেশের চিন্তা করেন’
নতুন পে-স্কেলে প্রথম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আর ২০তম গ্রেডে মূল বেতন বাড়বে সর্বোচ্চ প্রায় ১৪২ শতাংশ। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা এবং সব গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য মোবাইল ভাতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
ফলে গেজেট প্রকাশের পর শুধু নতুন মূল বেতন নির্ধারণই নয়, কর্মচারীদের বেতন ফিক্সেশন, বকেয়া বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাস্তবায়নের কাজও শুরু হবে।
১ জুলাই থেকে কার্যকর হলে বকেয়া কীভাবে?
নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হলেও এখনো গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে বেতন ফিক্সেশন ও বকেয়া পাওনা নিয়ে।
গেজেট প্রকাশে আরও সময় লাগলে ১ জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকরের হিসাব কীভাবে হবে—এ প্রশ্নও রয়েছে। একই সঙ্গে বকেয়া অর্থ কখন ও কীভাবে দেওয়া হবে এবং নতুন মূল বেতনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা কবে থেকে কার্যকর হবে, তা নিয়েও আগ্রহ রয়েছে সরকারি কর্মচারীদের।
এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর গেজেট প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে। কারণ প্রজ্ঞাপনেই নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের বিস্তারিত নির্দেশনা ও পদ্ধতি উল্লেখ থাকবে।
পে-স্কেল কি তাহলে আটকে আছে?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, পে-স্কেল আটকে নেই। বরং মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এটি বাস্তবায়নের শেষ দিকের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর রেজল্যুশন বিজি প্রেসে পাঠানো, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফেরত আসা এবং পরে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং—সবই গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়ার অংশ।
তবে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে অপেক্ষা বাড়ার মূল কারণ হলো মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর দ্রুত গেজেট প্রকাশের প্রত্যাশা। এক সপ্তাহের মধ্যে গেজেট প্রকাশের কথা বলা হলেও নির্ধারিত সময়ে তা না হওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠেছে—আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?
এখন অপেক্ষা ভেটিং শেষ হওয়ার
দীর্ঘ আলোচনা, পর্যালোচনা ও মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর নবম পে-স্কেলের সিদ্ধান্ত এখন বাস্তবায়নের শেষ ধাপে। সামনে মূলত আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হওয়ার অপেক্ষা। এরপর এসআরও নম্বর দিয়ে বাংলাদেশ গেজেটে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হবে।
অর্থাৎ, মন্ত্রিসভার অনুমোদনে নতুন বেতনকাঠামোর নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলেও সরকারি কর্মচারীদের হাতে নতুন বেতনকাঠামো পৌঁছাতে এখনও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার একটি ধাপ বাকি।
আর সেই গেজেট প্রকাশের ওপরই নির্ভর করছে নতুন বেতন অনুযায়ী ফিক্সেশন, বকেয়া পাওনা এবং অন্যান্য সুবিধা বাস্তবায়নের পরবর্তী কার্যক্রম। তাই সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীদের এখন একটাই অপেক্ষা—কবে প্রকাশ হবে নবম জাতীয় পে-স্কেলের সেই বহুল প্রতীক্ষিত গেজেট?
