পে-স্কেলে বড় পরিবর্তন
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪০ এএম
ছবি : সংগৃহীত
নতুন জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এ সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন কাঠামোয় গ্রেডভেদে ইনক্রিমেন্টের হার নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার তুলনামূলক কম হবে।
বর্তমানে সব গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবী মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পান। নতুন পে-স্কেলে এ অভিন্ন হার আর থাকছে না। গ্রেড যত ওপরে উঠবে, ইনক্রিমেন্টের হার তত কমবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-৬ পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট পাবেন। গ্রেড-৫-এ এ হার হবে ৪ শতাংশ। গ্রেড-৪ ও গ্রেড-৩-এ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গ্রেড-২-এ ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীতেও একই ধরনের কাঠামো রাখা হচ্ছে। ক্যাপ্টেন ও সমতুল্য এবং তার নিচের পদে ইনক্রিমেন্ট ৫ শতাংশ, মেজর পদে ৪ শতাংশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল পদে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হচ্ছে।
বিশেষ প্রণোদনা বাতিল
২০২৪ সালে চালু হওয়া বিশেষ প্রণোদনাও নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার সঙ্গে বাতিল হবে। এ প্রণোদনা প্রথমে মূল বেতনের ৫ শতাংশ এবং পরে ১০ শতাংশ করা হয়েছিল।
গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই রাখা হয়েছে। গ্রেড-২০-এর প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং গ্রেড-১-এর নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে।
অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বাড়ছে প্রায় ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান বিবেচনায় বেতন-ভাতা আরও যৌক্তিক করাই নতুন কাঠামোর অন্যতম লক্ষ্য। তবে আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বাড়ি ভাতার হারও কমছে
নতুন পে-স্কেলে বাড়ি ভাতা দেওয়ার হারেও পরিবর্তন আসছে। বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।
ঢাকার বাইরে অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভারে বর্তমানে ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় এ হার হবে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ। আর সিটি করপোরেশন ও সাভারের বাইরে বর্তমান ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশের পরিবর্তে ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে মূল বেতনের তুলনায় বাড়ি ভাতার হার কমলেও নতুন কাঠামোয় মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় ভাতার প্রকৃত টাকার পরিমাণ বাড়বে।
আট বছরেই উচ্চতর গ্রেড
উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমানে একই গ্রেডে ১০ বছর চাকরি করলে পদোন্নতি না হলেও উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন কাঠামোয় এ সময় কমিয়ে ৮ বছর করা হচ্ছে।
দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে একই গ্রেডে আরও ছয় বছর চাকরির শর্ত থাকছে। পদোন্নতিযোগ্য পদে কর্মরতরা পদোন্নতি না পেলে চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার এ সুবিধা পাবেন।
অন্যদিকে পদোন্নতির সুযোগ নেই বা ‘ব্লকড পদ’ হিসেবে ঘোষিত পদে কর্মরতরা সর্বোচ্চ তিনবার উচ্চতর গ্রেড সুবিধা পাবেন। প্রথমবার আট বছর, দ্বিতীয়বার আরও ছয় বছর এবং তৃতীয়বার পরবর্তী আট বছর চাকরির পর এ সুবিধা পাওয়ার বিধান রাখা হচ্ছে।
চিকিৎসা ও মোবাইল ভাতায় পরিবর্তন
নতুন কাঠামোয় চিকিৎসা ভাতাও বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে সব কর্মচারী মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। নতুন কাঠামোয় ৫০ বছর পর্যন্ত বয়সী চাকরিজীবীরা ৩ হাজার টাকা এবং ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত বয়সীরা ৪ হাজার টাকা পাবেন।
পেনশনভোগীদের চিকিৎসা ভাতাও বাড়ানো হচ্ছে। ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সীরা মাসে ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীরা ৬ হাজার টাকা পাবেন।
এ ছাড়া প্রথমবারের মতো সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডে মাসে ৫০০ টাকা এবং ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডে ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
যাতায়াত ভাতা ৩০০ থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ২০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ থেকে ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে বাংলা নববর্ষ ভাতা ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত রয়েছে।
পাহাড়ি ভাতা এবং হাওড়, দ্বীপ ও চরভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশই থাকছে। তবে এসব ভাতার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হবে। ঝুঁকি ভাতাসহ বিভিন্ন বিশেষ ভাতার পরিমাণও বিদ্যমান হারের তুলনায় বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীতেও পরিবর্তন
জাতীয় বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামোও পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। নন-কমব্যাট্যান্ট (এনরোল্ড) বা এনসি (ই) ও সমতুল্য পদে প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার টাকা এবং মেজর জেনারেল ও সমপদে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদকে গ্রেড-২ এবং কর্নেল ও সমপদকে গ্রেড-৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিমানবাহিনীর ফ্লাইং পে বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে।
কমান্ড, স্টাফ, টিচিং, কোয়ালিফিকেশন, ডিস্টার্বেন্স ও বিশেষজ্ঞ বেতন ১০ শতাংশ করে এবং দক্ষতা, নিযুক্তি, প্যারাসুট, কমান্ডো/স্নাইপার, স্কুবা ডাইভিং ও সদাচরণ বেতন ১৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। জরিপ ভাতা বাড়তে পারে ৩০ শতাংশ।
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিদ্যমান ৮১ ধরনের ভাতা পর্যালোচনা করেছে সচিব কমিটি। বেশ কিছু ভাতা বিদ্যমান হারের ওপর বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। তবে বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত, টিফিন, চিকিৎসা, উৎসব, শিক্ষা সহায়ক ও অন্যান্য কয়েকটি ভাতা নতুন জাতীয় বেতন স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা হবে।
সরকারের হিসাবে নতুন কাঠামোর আওতায় প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন।
নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
