নতুন পে-স্কেলে কোন গ্রেডে কত শতাংশ ইনক্রিমেন্ট
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৭ এএম
ছবি : সংগৃহীত
নতুন জাতীয় পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রেডভেদে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হারও পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়লেও উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তাদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার তুলনামূলক কম থাকবে।
বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের সব গ্রেডেই মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়। নতুন পে-স্কেলে এ অভিন্ন হার আর থাকছে না। গ্রেড যত ওপরে উঠবে, বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার তত কমবে।
কোন গ্রেডে কত ইনক্রিমেন্ট
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-৬ পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পাবেন।
গ্রেড-৫-এ ইনক্রিমেন্টের হার হবে ৪ শতাংশ। গ্রেড-৪ ও গ্রেড-৩-এ এ হার নির্ধারণ করা হচ্ছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। আর গ্রেড-২-এ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট হবে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
অর্থাৎ উচ্চ গ্রেডে মূল বেতন বেশি হলেও প্রতিবছর বেতন বৃদ্ধির শতাংশ তুলনামূলক কম থাকবে।
সশস্ত্র বাহিনীতেও একই হার
সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রেও গ্রেডভিত্তিক একই ধরনের ইনক্রিমেন্ট কাঠামো রাখা হচ্ছে। ক্যাপ্টেন ও সমপদ এবং তার নিচের পদে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট হবে ৫ শতাংশ।
মেজর পদে ৪ শতাংশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল পদে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণ করা হচ্ছে।
মূল বেতন বাড়ছে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ
নতুন পে-স্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই রাখা হয়েছে। গ্রেড-২০-এর প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং গ্রেড-১-এর নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ বাড়ছে। নতুন কাঠামোর লক্ষ্য হলো মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান বিবেচনায় বেতন-ভাতা আরও যৌক্তিক করা।
তবে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নতুন পে-স্কেল একবারে বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পে-স্কেলটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও মূল বেতন পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
বাতিল হচ্ছে বিশেষ প্রণোদনা
নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০২৪ সালে চালু করা বিশেষ প্রণোদনা বাতিল হবে। এই প্রণোদনা প্রথমে মূল বেতনের ৫ শতাংশ এবং পরে ১০ শতাংশ করা হয়েছিল।
নতুন পে-স্কেলে বাড়ি ভাড়া ভাতার হারও পরিবর্তন করা হচ্ছে। বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় এ হার কমিয়ে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।
ঢাকার বাইরে অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভারে বর্তমানে ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশের পরিবর্তে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন ও সাভারের বাইরে বর্তমান ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশের পরিবর্তে ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় শতাংশের হার কমলেও বাড়ি ভাতার প্রকৃত টাকার অঙ্ক গ্রেডভেদে বাড়তে পারে।
আট বছরেই উচ্চতর গ্রেড
উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমানে একই গ্রেডে ১০ বছর চাকরি করলে পদোন্নতি না হলেও উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন কাঠামোয় এ সময় কমিয়ে ৮ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে একই গ্রেডে আরও ছয় বছর চাকরির শর্ত থাকছে। পদোন্নতিযোগ্য পদে কর্মরতরা পদোন্নতি না পেলে চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার এ সুবিধা পাবেন।
অন্যদিকে পদোন্নতির সুযোগ নেই এবং ‘ব্লকড পদ’ হিসেবে ঘোষিত পদে কর্মরতরা চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ তিনবার উচ্চতর গ্রেড সুবিধা পাবেন। প্রথমবার আট বছর, দ্বিতীয়বার আরও ছয় বছর এবং তৃতীয়বার পরবর্তী আট বছর চাকরির পর এ সুবিধা পাওয়ার বিধান রাখা হচ্ছে।
চিকিৎসা ও মোবাইল ভাতায় পরিবর্তন
নতুন কাঠামোয় চিকিৎসা ভাতাও বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় ৫০ বছর পর্যন্ত বয়সি চাকরিজীবীরা ৩ হাজার টাকা এবং ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত বয়সিরা ৪ হাজার টাকা পাবেন।
পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসা ভাতা বাড়ানো হচ্ছে। ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সিরা মাসে ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সিরা ৬ হাজার টাকা পাবেন।
এ ছাড়া প্রথমবারের মতো সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডে মাসে ৫০০ টাকা এবং ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডে ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ২০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ থেকে ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে বাংলা নববর্ষ ভাতা ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীর ভাতাতেও পরিবর্তন
জাতীয় বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামোও পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। এনসি (ই) ও সমতুল্য পদে প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার টাকা এবং মেজর জেনারেল ও সমপদে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদকে গ্রেড-২ এবং কর্নেল ও সমপদকে গ্রেড-৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বিমানবাহিনীর ফ্লাইং পে বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
কমান্ড, স্টাফ, টিচিং, কোয়ালিফিকেশন, ডিস্টার্বেন্স ও বিশেষজ্ঞ বেতন ১০ শতাংশ এবং দক্ষতা, নিযুক্তি, প্যারাসুট, কমান্ডো/স্নাইপার, স্কুবা ডাইভিং ও সদাচরণ বেতন ১৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। জরিপ ভাতা বাড়তে পারে ৩০ শতাংশ।
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিদ্যমান ৮১ ধরনের ভাতাও পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন ভাতা ১০ শতাংশ এবং জরিপ ভাতা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
সরকারের হিসাবে নতুন কাঠামোয় প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন।
