হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
মানবাধিকার সুরক্ষায় বিএনপি সরকার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫১ এএম
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থাকে দুর্বল করে সেপ্টেম্বরে সংসদে তিনটি আইন অনুমোদন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির দাবি, এসব আইন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া কিছু সুরক্ষা ব্যবস্থা বাতিল করেছে এবং মানবাধিকার সংস্কারের বিষয়ে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটির মতে, নতুন আইনগুলো কার্যকর হওয়ার ফলে অতীতে ব্যাপকভাবে সংঘটিত জোরপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কমেছে।
এইচআরডব্লিউ জানায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে (এনএইচআরসি) শক্তিশালী করতে দুটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এসব ব্যবস্থায় গুম প্রতিরোধ, অভিযোগ তদন্ত এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছিল।
তবে চলতি বছরের শুরুতে নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এসব সংস্কারকে আইনে পরিণত না করে নতুন আইন প্রণয়ন করেছে। এইচআরডব্লিউর দাবি, নতুন আইনে এনএইচআরসির স্বাধীনতা ও তদন্ত ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, ৬ সেপ্টেম্বর সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত আইন এবং ‘জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’ পাস করা হয়। নতুন ব্যবস্থায় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে এনএইচআরসির সরাসরি ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্বও অভিযুক্ত সংস্থা ছাড়া অন্য কোনো নিরাপত্তা সংস্থাকে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধ্যাদেশে আটককেন্দ্র পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণের যে ক্ষমতা এনএইচআরসিকে দেওয়া হয়েছিল, নতুন আইনে তা বাতিল করা হয়েছে বলে দাবি করেছে এইচআরডব্লিউ। একই সঙ্গে জোরপূর্বক গুমের ঘটনায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায় নির্ধারণের আইনগত মানদণ্ডও পরিবর্তন করা হয়েছে। আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম স্ট্যাটিউটভিত্তিক মানদণ্ডে কোনো কর্মকর্তা কোনো লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতেন বা জানা উচিত ছিল এবং তা প্রতিরোধ করতে পারতেন—এমন পরিস্থিতিতেও দায় নির্ধারণের সুযোগ ছিল। নতুন আইনে সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার প্রমাণ প্রয়োজন হবে।
র্যাবের নাম পরিবর্তন নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে সংস্থাটি। ১০ সেপ্টেম্বর সংসদে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন আইন’ পাস করে র্যাবের নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী র্যাবের জনবল, ক্ষমতা, সম্পদ ও নথিপত্র নতুন বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে এসআরবি কার্যক্রম শুরু করেছে বলে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন বাহিনীর লোগোতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়নি; শুধু ‘RAB’-এর পরিবর্তে ‘SRB’ লেখা হয়েছে। মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা নতুন আইনে পর্যাপ্ত সুরক্ষা, প্রশিক্ষণ, তদারকি ও জবাবদিহির বিধান না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেন, অতীতে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বাংলাদেশের প্রকৃত নিরাপত্তা খাত সংস্কার এবং নির্যাতন ও অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্বাধীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন।
তিনি বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীকে কঠোর তদারকি ও জবাবদিহির বাইরে রাখার প্রচেষ্টা হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনা অতীতেই সীমাবদ্ধ থাকবে—এমন আস্থা তৈরি করে না।
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, জোরপূর্বক গুম, নির্বিচারে গ্রেপ্তার এবং বিক্ষোভে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল।
২০০৯ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হলেও কমিশনটির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা সীমিত ছিল। এইচআরডব্লিউর মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে কমিশনের তদন্ত ক্ষমতা ও স্বাধীনতা বাড়ানো হলেও পরবর্তী সরকার সেই ব্যবস্থাগুলো বহাল রাখেনি।
র্যাবের প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। বাহিনীর সাবেক সাতজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ওপরও নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। একই সঙ্গে র্যাবের সাবেক কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক গুমসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে বলে উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, নতুন সরকারের উচিত নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর কার্যকর ও স্বাধীন নজরদারি নিশ্চিত করা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা শক্তিশালী করা এবং র্যাবের পরিবর্তিত কাঠামোর ক্ষেত্রে মানবাধিকার সুরক্ষা ও জবাবদিহির সুস্পষ্ট ব্যবস্থা রাখা।
