রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই : প্রধানমন্ত্রী
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৮ এএম
ছবি : সংগৃহীত
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ও সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়া যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ১২ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এভাবে অনির্দিষ্টকাল তাদের দায়িত্ব বহন করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের মাধ্যমেই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব।
বক্তব্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময়ে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, অতীতে তাদের নেতৃত্বে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়েছিল। তবে ২০১৭ সালের সহিংসতার পর সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
মানবিক কারণে বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ প্রায় নয় বছর ধরে এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
রোহিঙ্গা ও কক্সবাজারের স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জরুরি সহায়তায় ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। এই সহায়তা প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক সহায়তার ঘাটতিকে রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
পাঁচ দফা প্রস্তাব
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এগুলো হলো—
১. দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করা।
২. মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সব ধরনের নির্যাতন বন্ধ করে তাদের নিজ ভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৩. রোহিঙ্গা এবং তাদের আশ্রয় দেওয়া ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও স্থিতিশীল মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা।
৪. আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) চলমান জবাবদিহির প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সমর্থন দেওয়া এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা।
৫. মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, অবৈধ অস্ত্র ও ডিজিটাল প্রতারণার মতো আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ যেন নিপীড়ন ও বাস্তুচ্যুতির আরেকটি অধ্যায় না হয়। তাদের ভাগ্য ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার সঙ্গে যুক্ত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এর আগে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিয়ে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার প্রধান বারহাম সালেহর সঙ্গেও বৈঠক করেন তারেক রহমান। সেখানে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি এবং সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী। ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণ।
সফরে রোহিঙ্গা সংকটের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বৈশ্বিক বৈষম্য মোকাবিলার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।
