ভাঙচুর-লুটপাটে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখন ধ্বংসস্তূপ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ভাঙাচোরা ইট-কাঠ, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাঁচের টুকরা আর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে রোগীদের চিকিৎসাপত্র, জরুরি নথি, ওষুধ ও শিশুদের টিকার ভাঙা শিশি। বাইরে পড়ে আছে কেটে ফেলা তিনটি আমগাছের বড় বড় ডাল। পুরো দৃশ্য দেখে মনে হতে পারে, কোনো বোমা হামলায় বিধ্বস্ত হয়েছে ভবনটি। কিন্তু এটি রাজধানীর একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র- মিরপুর-১-এর শাহ আলী মাজারের পেছনে অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। রাতের আঁধারে ভাঙচুর ও লুটপাটের পর কেন্দ্রটি এখন পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে।
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসা এই বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ১৯৭৬ সাল থেকে এলাকার নিম্ন আয়ের ও দুস্থ মা-শিশুদের প্রাথমিক চিকিৎসা, মাতৃত্বকালীন সেবা, পরিবার পরিকল্পনা এবং সরকারের বিনামূল্যের ইপিআই টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। কিন্তু হামলার পর কেন্দ্রটির মূল অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সেবাগ্রহীতা মা ও শিশুরা।
রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার জানান, বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ১২টার দিকে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত ২০০ থেকে ২৫০ জন মুখোশধারী ব্যক্তি হঠাৎ কেন্দ্রটিতে প্রবেশ করে। তারা দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে হাত-পা বেঁধে ফেলে। এরপর কেন্দ্রের মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম, জরুরি নথিপত্র, ওষুধ ও নগদ অর্থ লুট করে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, লুটপাটের পর হামলাকারীরা ভারী এক্সকাভেটর ব্যবহার করে কেন্দ্রের একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেয়। পরে সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’ নামের দুটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে তারা চলে যায়।
প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের দাবি, কোনো সরকারি দপ্তর থেকে আগাম নোটিশ না দিয়েই হামলা ও উচ্ছেদের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এ ঘটনায় আনুমানিক দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা।

কর্তৃপক্ষের হিসাবে, লুট হওয়া সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা নগদ, বিনামূল্যে বিতরণের জন্য রাখা প্রায় ৫ লাখ টাকার ওষুধ ও টিকা এবং প্রায় ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন। এ ছাড়া জেনারেটর, ফ্রিজ, এসি, সিসিটিভি ক্যামেরা, ল্যাবরেটরির সরঞ্জাম, কম্পিউটার, ল্যাপটপ এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রও লুট হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সানাউল্লাহ বলেন, ঘটনার রাতে হঠাৎ অনেক শব্দ শুনে তিনি বাসা থেকে বের হয়ে কেন্দ্রটির কাছে যান। তবে দেশীয় অস্ত্র হাতে অনেক লোকজন থাকায় ভয়ে আর সামনে এগোতে পারেননি। সকালে এসে তিনি স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ধ্বংসাবশেষ দেখতে পান। তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প খরচে মানুষ এখানে চিকিৎসাসেবা পেয়ে আসছেন। জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে সেটি আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান করা উচিত ছিল।
তবে জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়ে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’ ভিন্ন দাবি করেছে। সংগঠনটির ভাষ্য, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ২০০৬ সালে জমিটি তাদের নামে বরাদ্দ দেয় এবং ২০২১ সালে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়। তবে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কারণে তারা জায়গাটির দখল নিতে পারেনি বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
ঘটনার পর ডা. নাসরিন আখতার বাদী হয়ে শাহ আলী থানায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মো. হানিফ মিয়াসহ ২০০ থেকে ২৫০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার প্রধান আসামি হানিফ মিয়া তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
এদিকে মামলার তদন্তে নেমে শুক্রবার রাতে অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলেন মো. সোহেল, মো. জুয়েল, জিহাদ হাসান ও মো. রাব্বি।
শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা টাকার বিনিময়ে ভাঙচুরে অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তাদের অধিকাংশই শাহ আলী মাজার এলাকার ভাসমান ব্যক্তি বলে জানান তিনি।
তবে ভাঙচুরের সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকার পরও কেন তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে আটক করা হয়নি, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

ঘটনার নিন্দা জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন টিকাদানকেন্দ্রে ভাঙচুরের ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, জনস্বার্থে সরকারি টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পরিদর্শন করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, রাতের আঁধারে এভাবে স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়াকে সিটি করপোরেশন সমর্থন করে না। জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে তা আদালতের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং ভাঙচুরের কারণে ব্যাহত হওয়া টিকাদান কর্মসূচি পুনরায় চালু করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।
