ভারতকে নাস্তানাবুদ করা চীনা যুদ্ধবিমান কবে আসছে, জানা গেল সময়
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৬ এএম
ছবি : সংগৃহীত
দেশের আকাশসীমা সুরক্ষা ও সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বহরে যুক্ত হতে যাচ্ছে চীনের তৈরি ২০টি আধুনিক জে-১০সিই যুদ্ধবিমান। ৪ দশমিক ৫ প্রজন্মের এই মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট কেনার প্রক্রিয়ায় নীতিগত ও আর্থিক অনুমোদন পাওয়ার কথা জানা গেছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৭ সালের মধ্যে যুদ্ধবিমানগুলো বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারে।
সরকার থেকে সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থাপনায় চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল অ্যারো-টেকনোলজি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএটিআইসি) থেকে এসব যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রায় ২৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বা ২১৩ কোটি ১৬ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধের জন্য রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি দেওয়ার অনুমোদনও দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, যুদ্ধবিমান কেনার জন্য সিএটিআইসিকে প্রথম কিস্তিতে মোট অর্থের ২০ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ করা হবে। যুদ্ধবিমানগুলোর মূল দাম প্রায় ১৯৬ কোটি মার্কিন ডলার। এর সঙ্গে সুদ বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৭ কোটি ডলার। প্রথম কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে ৩৯ কোটি ১৯ লাখ ডলার।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, প্রথম কিস্তি পরিশোধের পর দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড পাওয়া যাবে। এরপর বাকি অর্থ ছয়টি অসমান বার্ষিক কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে। এভাবে দীর্ঘ সময় ধরে অর্থ পরিশোধের সুযোগ থাকায় একবারে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের চাপ এড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে জে-১০সিই যুদ্ধবিমানগুলো বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। শুধু যুদ্ধবিমান সরবরাহ নয়, এ প্যাকেজে পাইলট ও ক্রুদের প্রশিক্ষণ, লজিস্টিক সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্নত যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সহযোগিতার পরিধি আরও বাড়তে পারে।
সূত্রের দাবি, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে চীনের কাছ থেকে এসব যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়েছে বিমানবাহিনীর সদর দপ্তর। এদিকে যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, চীনের তৈরি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনার জন্য একটি কমিটি খসড়া চুক্তি প্রস্তুত করেছে।
তিনি বলেন, রাফালকে ৪ দশমিক ৫ প্রজন্মের অন্যতম আধুনিক যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের পারফরম্যান্স ভালো ছিল বলে দাবি করে তিনি বলেন, বাংলাদেশও বিমানটি কেনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
কেমন এই জে-১০সিই যুদ্ধবিমান
জে-১০সিই চীনের জে-১০সি যুদ্ধবিমানের রপ্তানি সংস্করণ। এটি এক ইঞ্জিন ও এক আসনবিশিষ্ট আধুনিক মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান। আকাশপথে যুদ্ধের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে বিমানটি।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় পাকিস্তানের জে-১০সি যুদ্ধবিমান ব্যবহারের খবর আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে। পাকিস্তানের দাবি, ওই সংঘাতে তাদের যুদ্ধবিমান ভারতীয় রাফালসহ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। তবে এসব দাবির সবকিছু স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। সংঘাতের পর জে-১০ সিরিজের যুদ্ধবিমান নিয়ে বিভিন্ন দেশের আগ্রহ বাড়ে।
জে-১০সিইতে রয়েছে অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (এইএসএ) রাডার। এর মাধ্যমে একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও অনুসরণ করা যায়। শত্রুপক্ষের ইলেকট্রনিক জ্যামিং মোকাবিলার সক্ষমতাও রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া বিমানটি চীনের তৈরি দূরপাল্লার বিয়ন্ড-ভিজ্যুয়াল-রেঞ্জ এয়ার-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পিএল-১৫ বহন ও নিক্ষেপ করতে পারে। উন্নত ডেটা লিংক এবং আকাশ থেকে নজরদারি ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর যোগাযোগ ও অভিযান পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। রাফাল বা ইউরোফাইটার টাইফুনের মতো ইউরোপীয় যুদ্ধবিমানের তুলনায় জে-১০সিই কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণে তুলনামূলক কম ব্যয় হতে পারে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থায়ন ও রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি
যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে চীনের সঙ্গে দর-কষাকষির আগেই অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিমানবাহিনীর আলোচনা হয়েছিল বলে সূত্র জানিয়েছে। রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির অনুমোদন চেয়ে অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো সারসংক্ষেপে বলা হয়, কেনার প্রস্তাবে থাকা ২০টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের মোট মূল্যের ৮০ শতাংশ পরবর্তী সময়ে ছয়টি অসমান বার্ষিক কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে।
সারসংক্ষেপে আরও বলা হয়, বাকি অর্থ কিস্তিতে পরিশোধের বিষয়টি মূলত বাকিতে কেনার মতো। ফলে অপরিশোধিত অর্থ সরকারের জন্য সরাসরি দায় হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ধরনের দায় পরিশোধে সাধারণত রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির প্রয়োজন না হলেও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ অনুরোধ এবং প্রকল্পটির স্পর্শকাতরতা বিবেচনায় এবার গ্যারান্টি দেওয়ার বিষয়টি অনুমোদন করা হয়েছে।
তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর প্রকল্পে কোনো রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা শুরুর আগেই অর্থ বিভাগের সঙ্গে অর্থায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করার নির্দেশনার কথাও সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে।
আকাশ প্রতিরক্ষায় আধুনিকায়নের পরিকল্পনা
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চীনের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা গতি পায়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারও বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের এ উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাহিনীর বহরে থাকা পুরোনো এফ-৭ এবং সীমিতসংখ্যক মিগ-২৯ যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি আধুনিক যুদ্ধবিমান যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন যুদ্ধবিমান যুক্ত হলে দেশের আকাশসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারে বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বাড়বে। তবে চূড়ান্ত চুক্তি, সরবরাহের সময়সূচি ও প্রকৃত ব্যয় সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত ২০২৭ সালে যুদ্ধবিমান পৌঁছানোর বিষয়টি সম্ভাব্য সময় হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
