×

মতামত

গর্ভকালীন সময়ে প্যাকেটজাত খাবার

মা ও শিশুর পুষ্টি সুরক্ষায় এখনই প্রয়োজন সহজবোধ্য খাদ্য লেবেল

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১১:১৩ পিএম

মা ও শিশুর পুষ্টি সুরক্ষায় এখনই প্রয়োজন সহজবোধ্য খাদ্য লেবেল

ছবি : সংগৃহীত

গর্ভধারণ একটি পরিবারের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি এটি মা ও অনাগত শিশুর সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ সময়। গর্ভকাল থেকেই মায়ের পুষ্টি, খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যগত যত্ন শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে গর্ভধারণ থেকে শিশুর দুই বছর বয়স পর্যন্ত ‘প্রথম ১,০০০ দিন’ পুষ্টি ও বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই সময়ে কী খাওয়া হচ্ছে, সেটি শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্যেরও বিষয়।

বাংলাদেশে নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক-অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে মাতৃস্বাস্থ্য ও পুষ্টির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও এখনও অনেক নারী, বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েরা, রক্তস্বল্পতা, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি ও পুষ্টির বৈচিত্র্যের অভাবসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ফলে গর্ভাবস্থায় মায়ের খাদ্যাভ্যাস শুধু পর্যাপ্ত খাবার গ্রহণের বিষয় নয়; খাবারের গুণগত মান, পুষ্টিমান এবং নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়ার সুযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাস এবং বাজারে সহজলভ্য প্যাকেটজাত ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের বিস্তারের প্রেক্ষাপটে গর্ভবতী নারীদের জন্য সঠিক খাদ্য নির্বাচন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন: মা মারা যাচ্ছে, চিকিৎসা করাতে পারছি না

বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় খাদ্যের গুণগত মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় গর্ভাবস্থায় অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের বেশি গ্রহণের সঙ্গে নিম্নমানের খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত গর্ভকালীন ওজন বৃদ্ধি এবং কিছু গর্ভকালীন জটিলতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এ সময়ে উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-একলাম্পসিয়া, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া এবং অতিরিক্ত বমির মতো নানা জটিলতাও দেখা দিতে পারে, যা সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে মা ও অনাগত শিশুর জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার পাশাপাশি প্রতিদিনের খাবারের মান ও ধরন সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়া জরুরি।

সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় ১০৫টি প্রক্রিয়াজাত ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের সোডিয়ামের মাত্রা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় ৪০ শতাংশ পণ্যে লেবেলে ঘোষিত মাত্রার তুলনায় সোডিয়াম কম দেখানোর প্রবণতা এবং ৯ শতাংশ পণ্যে সোডিয়াম-সংক্রান্ত তথ্য না থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। একই গবেষণায় অংশ নেওয়া ৯৭৪ জনের মধ্যে ৯৭ শতাংশ আগের সপ্তাহে কোনো না কোনো প্রক্রিয়াজাত বা অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

এই বাস্তবতায় শুধু ‘লেবেল পড়ুন’ বলা যথেষ্ট নয়। একটি প্যাকেটের পেছনে ছোট অক্ষরে দেওয়া দীর্ঘ উপাদান তালিকা বা পুষ্টি সারণি দেখে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সবার পক্ষে সহজ নয়। একজন ব্যস্ত মা, একজন কর্মজীবী নারী কিংবা পরিবারের কোনো সদস্য যখন দোকানে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দুটি পণ্যের মধ্যে একটি বেছে নেন, তখন তাঁর প্রয়োজন এমন তথ্য, যা প্যাকেটের সামনের অংশেই সহজে দেখা ও বোঝা যায়। এটাই এফওপিএল বা প্যাকেটের সামনের অংশে সহজবোধ্য পুষ্টি সতর্কীকরণ লেবেল।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দেখিয়েছে, কার্যকর ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং ভোক্তাকে দ্রুত বুঝতে সাহায্য করে কোনো পণ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ/সোডিয়াম বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট রয়েছে কি না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এফওপিএলকে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সুপারিশকৃত ‘বেস্ট বাই’ নীতিগত পদক্ষেপগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার চিলি, মেক্সিকো, পেরু, উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও কলম্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় সহজ, দৃশ্যমান ও অক্টাগোনাল সতর্কীকরণ লেবেল ভোক্তাদের অতিরিক্ত চিনি, সোডিয়াম ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট শনাক্ত করতে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

গর্ভাবস্থায় তাই বার্তাটি হওয়া উচিত- প্যাকেটজাত খাবার মানেই নিষিদ্ধ নয়; তবে খাবারের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত বৈচিত্র্যময়, নিরাপদ, পুষ্টিকর ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার। প্রথম তিন মাসে সাধারণত অতিরিক্ত ক্যালোরির প্রয়োজন হয় না। তবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ত্রৈমাসিকে মায়ের অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন বাড়ে। কতটুকু অতিরিক্ত খাবার প্রয়োজন হবে, তা মায়ের বয়স, ওজন, উচ্চতা, শারীরিক সক্রিয়তা, গর্ভাবস্থার অবস্থা ও চিকিৎসকের পরামর্শের ওপর নির্ভর করে। এ সময়ে খাদ্যতালিকায় ভাত বা রুটি, ডাল, মাছ, ডিম, মাংস, দুধ বা দুধজাতীয় খাবার, বিভিন্ন শাকসবজি, মৌসুমি ফল, বাদাম ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখা উচিত। বিশেষ করে ফলিক অ্যাসিড, আয়রন, ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আয়রন-ফলিক অ্যাসিডসহ অন্যান্য সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে হবে।

মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব। নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি এমন একটি খাদ্যপরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যেখানে স্বাস্থ্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া মানুষের জন্য সহজ হয়।

বাংলাদেশ যখন অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝা মোকাবিলা করছে, তখন খাদ্যের প্যাকেটের সামনের একটি সহজবোধ্য সতর্কীকরণ লেবেল ছোট একটি নীতিগত পদক্ষেপ মনে হতে পারে। কিন্তু কোটি কোটি মানুষের প্রতিদিনের খাদ্য নির্বাচনে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও পরিবারের জন্য প্যাকেটজাত খাবার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সহজবোধ্য তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শিশু, কিশোর-কিশোরী ও সাধারণ ভোক্তাদের জন্যও এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য বিনিয়োগ।

সুস্থ মা, সুস্থ শিশু এবং সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য তাই এখন সময়- ভোক্তার হাতে শুধু তথ্য নয়, বোঝার মতো তথ্য তুলে দেওয়ার।

মাহফিদা দীনা রূবাইয়া

প্রকল্প ব্যবস্থাপক ও পুষ্টিবিদ

ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ইয়াবাসহ পল্লবী থানার এএসআই গ্রেফতার

ইয়াবাসহ পল্লবী থানার এএসআই গ্রেফতার

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩২৭ রাউন্ড গুলিসহ নারী আটক

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩২৭ রাউন্ড গুলিসহ নারী আটক

সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতার মতবিনিময়

সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতার মতবিনিময়

শর্ত পূরণ হলেই ভারতের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক : নাহিদ ইসলাম

শর্ত পূরণ হলেই ভারতের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক : নাহিদ ইসলাম

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App