শেখ হাসিনা ইস্যুতে ঢাকা–দিল্লি–ওয়াশিংটন: নেপথ্যে কি নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ?
রাসেল আহমদ
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম
ফাইল ছবি
একটি জন্মদিন, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার আকস্মিক ঢাকা সফর এবং ওয়াশিংটনের একটি সংযত কূটনৈতিক বার্তা- তিনটি ঘটনাকে আলাদা আলাদা করে দেখলে এগুলো নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষভাগের ঘটনাপ্রবাহ পাশাপাশি রাখলে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আসে: শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ কি এখন আর শুধু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি দ্বিপক্ষীয় ইস্যু, নাকি তা দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হয়ে উঠেছে?
উত্তরটি সরল নয়। তবে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা অন্তত এটুকু দেখাচ্ছে- ঢাকা, নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটন তিনটি ভিন্ন স্বার্থ ও অগ্রাধিকার নিয়ে একই জটিল সমীকরণের দিকে তাকিয়ে আছে।
১৭ সেপ্টেম্বর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের ঢাকা সফরের খবর ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি অল্প সময়ের জন্য ঢাকায় এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফরের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
তবে ঢাকা বা নয়াদিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে সফরটির বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। ফলে সফরটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তের চেয়ে এটিকে সম্ভাব্য উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসংগত।
তবে এই সফরের সময়টাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই সময়ে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ককে একটি নতুন কাঠামোয় নেওয়ার চেষ্টা চলছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর নিয়ে আলোচনা চলছে এবং ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহকে সম্ভাব্য সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সফরটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত বিষয়।
অর্থাৎ আলোচনার টেবিলে একটি দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। একদিকে দুই দেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়; অন্যদিকে সেই সম্পর্কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি।
বাংলাদেশের অবস্থান এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট। সরকার বলছে, ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক/দণ্ডিত ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণ দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর একটি। ১৫ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও প্রকাশ্যে বলেছেন, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে উত্থাপিত হয়েছে।
অন্যদিকে ভারতের প্রকাশ্য অবস্থান এখন পর্যন্ত বিষয়টিকে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রেখেছে। ফলে হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নকে কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্ন হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। এর সঙ্গে প্রত্যর্পণ চুক্তি, সংশ্লিষ্ট আইনি ব্যাখ্যা, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক- সবকিছুই জড়িত।
এখানেই সম্ভাব্য তারেক রহমান-নরেন্দ্র মোদি বৈঠনের গুরুত্ব। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর হলে তার তাৎপর্য সীমিত থাকত। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য সফরটি হবে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি পরীক্ষাক্ষেত্র।
প্রশ্ন হলো, সেই পুনর্গঠন কীভাবে হবে?
বাংলাদেশের জন্য শেখ হাসিনার বিষয়টি কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যর্পণ নয়। এর সঙ্গে বিচারিক সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়ার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। ভারতের জন্যও বিষয়টি কেবল একজন সাবেক প্রতিবেশী রাষ্ট্রপ্রধানকে আশ্রয় দেওয়ার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে তার নিরাপত্তা, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং ভারতের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ জড়িত।
এই দ্বৈত স্বার্থের জায়গাটিই সম্ভাব্য সমঝোতার সবচেয়ে কঠিন অংশ।
আর ঠিক এখানেই ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে নিউইয়র্ক ফরেন প্রেস সেন্টারের এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, শেখ হাসিনা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বড় একটি টানাপোড়েনের কারণ এবং ওয়াশিংটন আশা করে, দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধানে পৌঁছাবে।
এই বক্তব্যের তাৎপর্য বুঝতে হলে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার। যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে শেখ হাসিনার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে- এমন কথা ওই বক্তব্যে নেই।
আবার ওয়াশিংটন বাংলাদেশকে কোনো নির্দিষ্ট সমাধান গ্রহণের নির্দেশও দেয়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে নিজেকে এই দ্বিপক্ষীয় বিরোধের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করে সিদ্ধান্তটি মূলত ঢাকা ও দিল্লির আলোচনার ওপর ছেড়ে দিয়েছে।
এটি কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। কারণ একই ব্রিফিংয়ে ওয়াশিংটন বলেছে, তারা বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে চায় এবং বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে।
বাংলাদেশ কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে- এমন প্রশ্নের উত্তরে মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ওয়াশিংটন কোনো দেশকে একটি পক্ষ বেছে নিতে চাপ দিতে চায় না; বরং যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে একটি বিকল্প অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়।
এই বক্তব্যের মধ্যেই বাংলাদেশের জন্য একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা আছে।
বাংলাদেশকে এখন আর কেবল ভারত-নির্ভর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কাঠামোর মধ্যে বিষয়গুলো বিবেচনা করলে চলবে না। ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগরীয় যোগাযোগ, চীন-ভারত প্রতিযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্বার্থ- সব মিলিয়ে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে। ফলে ঢাকা-দিল্লির কোনো সমঝোতার প্রতিটি পদক্ষেপেরই বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
এখানে ভারতের কৌশলগত বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না। দিল্লি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে চাইবে- সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি, জ্বালানি, যোগাযোগ ও নিরাপত্তার স্বার্থেই। একই সঙ্গে ভারতের জন্য শেখ হাসিনার অবস্থান একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রশ্ন। তাই দোভালের মতো জাতীয় নিরাপত্তা পর্যায়ের কর্মকর্তার সম্ভাব্য ঢাকা সফরকে কেবল প্রোটোকলগত যোগাযোগ হিসেবে দেখারও কারণ নেই। তবে সফরের প্রকৃত এজেন্ডা প্রকাশ্যে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এর নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সমীচীন নয়।
বাংলাদেশের সামনেও একই ধরনের ভারসাম্যের প্রশ্ন। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা প্রয়োজন, কিন্তু সেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মূল্য কী হবে- সেটিও রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারণ করতে হবে। কোনো সমঝোতা যদি হয়, তার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে সেটি বাংলাদেশের আইন, বিচারিক প্রক্রিয়া ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তার ওপর।
অন্যদিকে শেখ হাসিনার নিজের বক্তব্যও এই সমীকরণকে আরও জটিল করেছে। তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এবং একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগের কথা বলেছেন। ফলে তাঁর প্রত্যাবর্তন এখন আর কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি দুই রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের বিচারিক বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত।
তাহলে সেপ্টেম্বরের ঘটনাগুলো কী বলছে?
সবচেয়ে সতর্ক উত্তর হলো- এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। কিন্তু আলোচনার ক্ষেত্রটি বদলেছে।
একসময় শেখ হাসিনা প্রশ্নটি ছিল মূলত প্রত্যর্পণ বনাম আশ্রয়ের দ্বন্দ্ব। এখন সেটি ধীরে ধীরে বৃহত্তর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক পুনর্গঠনের আলোচনায় ঢুকে পড়ছে। আর ওয়াশিংটন সেই আলোচনায় সরাসরি কোনো ফল চাপিয়ে না দিয়ে দুই দেশকেই সমাধানের অংশীদার হিসেবে দেখছে। একই সময়ে ভারত ও বাংলাদেশ সম্ভাব্য শীর্ষপর্যায়ের বৈঠকের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এ কারণেই অজিত দোভালের ঢাকা সফর, তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর এবং ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে একই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা যায়।
এখানে ‘গোপন চুক্তি’ বা ‘নেপথ্যের চূড়ান্ত সমঝোতা’ খোঁজার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কূটনৈতিক সংকেতগুলো পড়া। সেই সংকেত বলছে- ঢাকা ও দিল্লি সম্পর্ককে নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন অনুভব করছে; শেখ হাসিনা সেই পুনর্বিন্যাসের সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্নগুলোর একটি; আর যুক্তরাষ্ট্র আপাতত এই প্রশ্নে নির্দিষ্ট সমাধান চাপিয়ে না দিয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পথকে স্বীকৃতি দিচ্ছে।
অতএব, সামনে আসল পরীক্ষা শেখ হাসিনা ফিরবেন কি ফিরবেন না- শুধু তা নয়। আসল পরীক্ষা হলো, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কি এমন একটি নতুন ভিত্তি খুঁজে পাবে, যেখানে কূটনৈতিক স্বার্থ, বিচারিক প্রক্রিয়া, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য- সবকিছুকে একই সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া সম্ভব?
সম্ভাব্য তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফর সেই প্রশ্নের প্রথম বড় পরীক্ষা হতে পারে। আর যদি সেখানে কোনো সমঝোতার পথ তৈরি হয়, তার প্রকৃত তাৎপর্য শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ভবিষ্যতের চেয়েও বড় হবে। সেটি নির্ধারণ করবে- ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক পুরোনো অবিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে, নাকি নতুন বাস্তবতার ভিত্তিতে একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে।
সেপ্টেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ তাই কোনো চূড়ান্ত গল্পের সমাপ্তি নয়। বরং এটি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা- যেখানে শেখ হাসিনা ইস্যু একটি ব্যক্তি-প্রশ্নের সীমা অতিক্রম করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূ-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
