রংপুর বিভাগ কেন অবহেলিত: উন্নয়ন বৈষম্যের নেপথ্যে কী?
নাজমুল হাসান
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৭ পিএম
মো. নাজমুল হাসান। ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশের উন্নয়নচিত্রে একদিকে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প, শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাফল্যের গল্প। অন্যদিকে, দেশের কিছু অঞ্চলে এখনো দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের সংকট, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা এবং সীমিত নাগরিক সুবিধা মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। রংপুর বিভাগ সেই বৈপরীত্যের অন্যতম উদাহরণ।
স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও উত্তরাঞ্চলের এই জনপদের মানুষের মনে উন্নয়নবঞ্চনার প্রশ্ন রয়ে গেছে। জাতীয় অর্থনীতিতে রংপুরের অবদান থাকলেও সেই অনুপাতে উন্নয়নের সুফল কতটা পৌঁছেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কেন এ অঞ্চলে শিল্পায়ন প্রত্যাশিত মাত্রায় এগোয়নি? কেন কর্মসংস্থানের জন্য তরুণদের অন্য বিভাগ কিংবা বিদেশমুখী হতে হয়? কেন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্পের অবস্থান নির্ধারণ নিয়ে বারবার বিতর্ক তৈরি হয়?
রংপুরের উন্নয়নবৈষম্যকে কেবল অর্থ বরাদ্দের ঘাটতি হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্পায়নের দুর্বলতা, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, যোগাযোগ অবকাঠামোর অসমতা, নীতিনির্ধারণে আঞ্চলিক অগ্রাধিকারের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দুর্বলতা। এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, ন্যায্য বাজেট বণ্টন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার কার্যকর প্রয়োগ।
দারিদ্র্যের বাস্তবতা ও উন্নয়নের অসম বণ্টন
রংপুরের পিছিয়ে থাকার আলোচনায় দারিদ্র্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন প্রতিবেদন ও আর্থসামাজিক সূচকে দেশের অঞ্চলভেদে জীবনযাত্রার মানের পার্থক্য উঠে এসেছে। সম্পদভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসেও রংপুরের পিছিয়ে থাকার বিষয়টি বিভিন্ন আলোচনায় উঠে এসেছে।
তবে সম্পদভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস, আয়ভিত্তিক দারিদ্র্যের হার এবং ভোগব্যয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত দারিদ্র্যের হার এক নয়। তাই রংপুরের দারিদ্র্য পরিস্থিতি মূল্যায়নে নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ পরিসংখ্যান ব্যবহার করা জরুরি।
প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি যদি মানুষের জীবনমানের উন্নতি ঘটায়, তাহলে সেই সুফল সব অঞ্চলে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না কেন? উন্নয়ন পরিকল্পনা যদি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে আঞ্চলিক বৈষম্যের প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যেতে পারে।
একটি অঞ্চলের উন্নয়ন পরিমাপ করতে হলে মানুষের আয়, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ, নিরাপদ পানি, শিল্পায়ন এবং নাগরিক সুবিধার বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় নিতে হবে।
কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, কিন্তু শিল্পায়ন কোথায়?
রংপুর বিভাগের অর্থনীতি ঐতিহাসিকভাবে কৃষিনির্ভর। ধান, আলু, ভুট্টা, তামাক, শাকসবজি ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসল এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু কৃষিতে উৎপাদন বাড়লেই কৃষকের আয় সমান হারে বাড়ে না।
সংরক্ষণব্যবস্থার ঘাটতি, ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, বাজারজাতকরণে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব, প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সীমাবদ্ধতা এবং পরিবহন ব্যয় কৃষকের মুনাফা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে উৎপাদনের সঙ্গে কৃষকের প্রকৃত আয় ও স্থানীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির মধ্যে প্রত্যাশিত সামঞ্জস্য তৈরি হয় না।
আলু, ভুট্টা, ফল ও সবজি সংরক্ষণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিযন্ত্র উৎপাদন এবং কৃষিভিত্তিক রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলা গেলে এ অঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। স্থানীয় কাঁচামালকে কেন্দ্র করে শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, পরিবহন ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের জন্যও অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।
কিন্তু এসব শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উপযোগী জ্বালানি, উন্নত সড়ক-রেল যোগাযোগ, গুদাম ও হিমাগার, সহজ ঋণ, দক্ষ শ্রমিক এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। এসব সুবিধার সমন্বিত উন্নয়ন ছাড়া শুধু অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করলেই শিল্পায়ন সম্ভব নয়।
রংপুরের উন্নয়নের জন্য কৃষিকে কেবল উৎপাদনের খাত হিসেবে না দেখে শিল্পায়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বাজেট বরাদ্দে বৈষম্য: প্রয়োজনভিত্তিক বণ্টন কতটা জরুরি?
রংপুরের উন্নয়নবঞ্চনার আলোচনায় বারবার উঠে আসে সরকারি বরাদ্দের প্রশ্ন। তবে বিভাগভিত্তিক বরাদ্দের বৈষম্য নিয়ে আলোচনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের বাজেট নথি, প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ এবং বাস্তব ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বরাদ্দের পরিমাণের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হলো- অর্থ কীভাবে বণ্টন করা হচ্ছে, কোন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং বরাদ্দের অর্থ বাস্তবে কতটা ব্যয় হচ্ছে।
উন্নত অঞ্চলের সঙ্গে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলকে একই পরিমাণ অর্থ দেওয়া সব সময় ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করে না। যেসব অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো, শিল্পায়ন ও নাগরিক সুবিধার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করতেই তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে।
এ কারণে রংপুরের জন্য বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণের দাবি যৌক্তিকভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। তবে বরাদ্দ যেন রাজনৈতিক আনুকূল্য কিংবা লোকদেখানো প্রকল্পে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রকল্প নির্বাচন, অর্থ ছাড়, বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং সুফলভোগীর সংখ্যা- সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
বিভাগীয় প্রকল্প অন্য জেলায় কেন?
রংপুরের উন্নয়নবৈষম্যের প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে বিভাগের জন্য অনুমোদিত ২০০ শয্যার মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রস্তাবিত অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রটি প্রথমে রংপুর সদর উপজেলার মন্থনা মৌজায় স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। এ জন্য ১০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু প্রস্তাবিত জমি তিন ফসলি হওয়ায় জমির মালিকেরা আপত্তি জানান। এতে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়।
পরবর্তী সময়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রটি লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ি ইউনিয়নের বৈরাগিকুমার ও নওদাবস মৌজায় স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এ জন্য প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি সংশোধনের প্রয়োজন হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট চিঠিতে জমি অধিগ্রহণের জটিলতার বিষয়টি উল্লেখ করা হলেও রংপুর সদর এলাকায় বিকল্প জমি খোঁজার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—রংপুরে বিকল্প জমি অনুসন্ধান ও মূল্যায়নের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই কেন প্রকল্পটি অন্য জেলায় স্থানান্তরের প্রস্তাব করা হলো?
অবশ্য জমি অধিগ্রহণের বাস্তব জটিলতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তিন ফসলি জমি রক্ষা, কৃষকের স্বার্থ এবং পরিবেশগত বিষয় বিবেচনা করাও জরুরি। কিন্তু একটি স্থানে জমি পাওয়া না গেলে প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত বিকল্প স্থান অনুসন্ধান, সম্ভাব্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়।
বিশেষ করে বিভাগীয় পর্যায়ের সেবাকেন্দ্রের অবস্থান নির্ধারণে শুধু জমির প্রাপ্যতা নয়, জনসংখ্যা, যোগাযোগব্যবস্থা, রোগীর সম্ভাব্য চাপ, ভৌগোলিক অবস্থান এবং সেবাগ্রহীতাদের যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
রংপুরেই কেন্দ্র স্থাপনের দাবি
প্রস্তাবিত কেন্দ্রটি লালমনিরহাটে স্থানান্তরের খবর সামনে আসার পর রংপুরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও কেন্দ্রটি রংপুর শহরে স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন।
রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব ও রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডনের বক্তব্য অনুযায়ী, জমি অধিগ্রহণে জটিলতা দেখা দিলে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চাওয়া হয়নি। রংপুরে সরকারি এ ধরনের প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।
রংপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলামও কেন্দ্রটি রংপুরে বাস্তবায়নের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, অন্য কোনো জেলা এ ধরনের প্রতিষ্ঠান চাইলে সেখানে পৃথক উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজনের রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু মনে করেন, সেবাকেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে পুরো বিভাগের মানুষের যাতায়াত ও সেবা পাওয়ার সুবিধাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর মতে, কোনো একটি এলাকার সুবিধার চেয়ে সামগ্রিক আঞ্চলিক প্রয়োজন বিবেচনা করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় নাগরিক পার্টির রংপুর মহানগরের সদস্যসচিব আব্দুল মালেকও প্রস্তাবিত স্থান পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, মাদকাসক্তি একটি গুরুতর সামাজিক ও জনস্বাস্থ্যগত সমস্যা। তাই এ ধরনের বিশেষায়িত কেন্দ্রের অবস্থান নির্ধারণে রাজনৈতিক প্রভাবের পরিবর্তে জনসংখ্যা, রোগীর চাপ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
তিনি মনে করেন, লালমনিরহাটের মানুষেরও উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সেখানে এমন কেন্দ্রের প্রয়োজন থাকলে সরকার পৃথক প্রকল্প গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু একটি অঞ্চলের জন্য পরিকল্পিত প্রতিষ্ঠান অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে জনস্বার্থ ও ন্যায্যতার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলালও প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর মতে, রংপুর বিভাগীয় সদর হওয়ায় কেন্দ্রটি রংপুর শহরে স্থাপন করা উচিত।
এসব বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, প্রকল্পের অবস্থান নিয়ে বিতর্কটি কেবল রাজনৈতিক বিরোধের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আঞ্চলিক পরিকল্পনা, সেবাপ্রাপ্তির সমতা এবং সরকারি সম্পদের ন্যায্য ব্যবহারের প্রশ্ন।
তবে প্রকল্পটি স্থানান্তরের সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক পক্ষপাত কাজ করেছে- এমন অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা, জমির বিকল্প প্রস্তাব এবং প্রকল্পের সম্ভাব্যতা মূল্যায়নের তথ্য প্রকাশ করা হলে বিতর্কের প্রকৃত কারণ আরও স্পষ্ট হবে।
উন্নয়ন কি রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর নির্ভর করবে?
বাংলাদেশে বড় প্রকল্পের অবস্থান নির্ধারণ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক দেখা গেছে। কোনো জনপ্রতিনিধি নিজের এলাকায় উন্নয়ন চান, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দাবি পূরণ করতে গিয়ে অন্য অঞ্চলের মানুষের জন্য পরিকল্পিত সেবা সংকুচিত করা হলে ন্যায্যতার প্রশ্ন উঠবেই।
একজন জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব শুধু নিজের নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন নিশ্চিত করা নয়; বরং বৃহত্তর জনস্বার্থ রক্ষা করাও তাঁর দায়িত্বের অংশ।
রংপুরের জন্য অনুমোদিত একটি বিভাগীয় সেবাকেন্দ্র কোথায় স্থাপন করা হবে, তা নির্ধারণে রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত প্রভাবের চেয়ে গ্রহণযোগ্য সমীক্ষা ও জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। একইভাবে লালমনিরহাটের মানুষের প্রয়োজনকেও উপেক্ষা করা যাবে না।
এখানে মূল প্রশ্ন কোনো জেলা অন্য জেলার প্রতিদ্বন্দ্বী কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো- সরকারি প্রতিষ্ঠান কোথায় স্থাপন করলে সবচেয়ে বেশি মানুষ কার্যকরভাবে সেবা পাবেন এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রকল্পের উদ্দেশ্য অর্জিত হবে।
এ সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি, জমির বিকল্প, যাতায়াতের সময়, সম্ভাব্য রোগীর সংখ্যা এবং ব্যয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রকাশ করা হলে জনমনে তৈরি হওয়া সন্দেহ অনেকটাই দূর করা সম্ভব।
যোগাযোগ অবকাঠামো: দূরত্ব কমলেই কি উন্নয়ন হবে?
রংপুর বিভাগের উন্নয়নের পথে যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। রেল যোগাযোগের আধুনিকায়ন, সড়ক ও সেতুর উন্নয়ন এবং ঢাকার সঙ্গে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের।
উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা পণ্য পরিবহনের খরচ কমাতে পারে, কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করতে পারে এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু শুধু সড়ক, রেললাইন কিংবা সেতু নির্মাণ করলেই দারিদ্র্য দূর হবে না। যোগাযোগ অবকাঠামোর সঙ্গে উৎপাদন, বাজার, শিল্পায়ন এবং দক্ষতা উন্নয়নের সংযোগ তৈরি করতে হবে।
অর্থাৎ, অবকাঠামো হবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সহায়ক শক্তি; নিজেই উন্নয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়।
গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বিনিয়োগের পরিবেশ
শিল্পায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রংপুর বিভাগে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, উপযোগী জ্বালানি, জমি এবং পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
গ্যাস সরবরাহ সম্প্রসারণের দাবি বিবেচনার পাশাপাশি সম্ভাব্য শিল্পচাহিদা, পাইপলাইন নির্মাণের ব্যয়, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি প্রাপ্যতা এবং বিকল্প জ্বালানির সম্ভাবনাও মূল্যায়ন করতে হবে। সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগও খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
রংপুরে বিনিয়োগ বাড়াতে শিল্পপার্ক, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ঋণসুবিধা এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রশাসনিক জটিলতা কমানো প্রয়োজন। বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হলে কর্মসংস্থান বাড়বে; আর কর্মসংস্থান বাড়লে মানুষের আয় ও স্থানীয় বাজারের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও উত্তরাঞ্চলের মানুষের ক্ষতি
রংপুর বিভাগের উন্নয়ন আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বন্যা, নদীভাঙন, খরা, শৈত্যপ্রবাহ, তাপদাহ ও অতিবৃষ্টির মতো দুর্যোগ এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে নদীভাঙনে বসতভিটা ও কৃষিজমি হারানো পরিবারগুলো দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়ে।
দুর্যোগের ক্ষতি শুধু ঘরবাড়ি বা ফসল নষ্ট হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুর শিক্ষা ব্যাহত হওয়া, চিকিৎসা না পাওয়া, নিরাপদ পানির সংকট, মানসিক চাপ এবং জীবিকা হারানোর মতো ক্ষতিও মানুষের জীবনমানকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করে।
তাই রংপুরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় নদীভাঙন মোকাবিলা, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি বিমা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থান
কোনো অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না। মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রংপুর বিভাগে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও সেগুলোর সক্ষমতা, শিক্ষকসংকট, গবেষণা, চিকিৎসাসেবা এবং কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ নিয়ে পরিকল্পিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
কৃষি প্রযুক্তি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি, যন্ত্র প্রকৌশল, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি এবং কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা গেলে স্থানীয় শিল্প ও সেবা খাত উপকৃত হবে। একইভাবে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করা গেলে জটিল চিকিৎসার জন্য ঢাকামুখী হওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে।
স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কাজের সুযোগ না থাকলে তরুণদের অন্য বিভাগে কিংবা বিদেশে পাড়ি জমাতে হয়। তাই স্থানীয় শিল্পে চাকরি, কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা, ডিজিটাল সেবা, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং দক্ষতাভিত্তিক পেশার সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা: সম্ভাবনা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
রংপুর বিভাগের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন আলোচনায় তিস্তা নদী ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ, কৃষি উৎপাদন, নদীভাঙন মোকাবিলা এবং স্থানীয় জীবিকার সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের স্বার্থ জড়িত।
তবে তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় মানুষের পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পরিবেশগত মূল্যায়ন, অর্থায়নের নিশ্চয়তা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত জনসমক্ষে তথ্য প্রকাশ করতে হবে, যাতে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
রংপুরের উন্নয়নে কী করা প্রয়োজন?
রংপুরের উন্নয়নবৈষম্য কমাতে কয়েকটি বিষয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
প্রথমত, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও জলবায়ু ঝুঁকির হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করে বিভাগভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর জন্য প্রয়োজনভিত্তিক বাজেট বণ্টনের নীতি গ্রহণ করতে হবে। বরাদ্দের পাশাপাশি অর্থ ছাড়, বাস্তব ব্যয় এবং প্রকল্পের সুফল যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
চতুর্থত, সড়ক ও রেল যোগাযোগের উন্নয়নকে শিল্প, কৃষি ও বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। প্রকল্পের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে অর্থনৈতিক কার্যকারিতা ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে।
পঞ্চমত, নদীভাঙন, বন্যা, খরা ও শৈত্যপ্রবাহ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও পুনর্বাসনকে উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
ষষ্ঠত, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে স্থানীয় শ্রমবাজারের উপযোগী জনশক্তি তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি নিরাপদ বিদেশগমন ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে সহায়তা বাড়াতে হবে।
সপ্তমত, সরকারি প্রকল্পের অবস্থান নির্ধারণে রাজনৈতিক প্রভাবের পরিবর্তে জনসংখ্যা, ভৌগোলিক সুবিধা, সেবাগ্রহীতার সংখ্যা, যোগাযোগব্যবস্থা ও ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণকে গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো প্রকল্পের স্থান পরিবর্তন করা হলে তার যৌক্তিকতা ও মূল্যায়নের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।
অষ্টমত, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও গণমাধ্যমকে যুক্ত করতে হবে। প্রকল্পের ব্যয়, সময়সীমা এবং অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করলে জবাবদিহি বাড়বে।
সমান উন্নয়ন নয়, প্রয়োজন ন্যায্য উন্নয়ন
রংপুর বিভাগ কেন অবহেলিত- এই প্রশ্নের উত্তর শুধু অতীতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে খুঁজলে চলবে না। বর্তমানের উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেট বণ্টন, শিল্পায়নের কৌশল এবং প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের মধ্যেও এর উত্তর খুঁজতে হবে।
কোনো অঞ্চল দীর্ঘদিন পিছিয়ে থাকলে তাকে অন্য অঞ্চলের সঙ্গে সমপর্যায়ে আনতে তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ ও বিশেষ কর্মসূচির প্রয়োজন হতে পারে। এটিকে বাড়তি সুবিধা নয়, বরং উন্নয়নের ব্যবধান কমানোর ন্যায্য উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
রংপুরের মানুষের দাবি কেবল নতুন সড়ক, সেতু, রেললাইন, বিশ্ববিদ্যালয় বা শিল্পকারখানা নয়। তাঁদের দাবি কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, উন্নত চিকিৎসা, নিরাপদ পানি, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ।
বিভাগীয় শহরের জন্য অনুমোদিত মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের অবস্থান নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটিও বৃহত্তর উন্নয়নবৈষম্যের আলোচনার অংশ। এ বিতর্কের সমাধান হওয়া উচিত তথ্য, যৌক্তিকতা ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে- রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা অঞ্চলভিত্তিক প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে নয়।
লালমনিরহাটের মানুষ যেমন উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন, তেমনি রংপুর বিভাগের সব জেলার মানুষের জন্য কার্যকর ও সহজলভ্য সেবা নিশ্চিত করাও জরুরি। একটি অঞ্চলের উন্নয়ন অন্য অঞ্চলের অধিকার সংকুচিত করে নয়; বরং পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও সুষম সম্পদ বণ্টনের মাধ্যমে হওয়া উচিত।
দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সুফল রাজধানী ও বড় শহরের গণ্ডি পেরিয়ে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর মানুষের জীবনেও দৃশ্যমান হবে। রংপুরের উন্নয়ন তাই কেবল উত্তরাঞ্চলের দাবি নয়; এটি বাংলাদেশের সুষম অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রশ্ন।
প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান কাজ। আর সেই কাজের ভিত্তি হতে হবে নির্ভরযোগ্য তথ্য, ন্যায্য বরাদ্দ, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি।
লেখক: মো. নাজমুল হাসান, সাংবাদিক
