চাটমোহরে লোকজ ঐতিহ্য পুঁথি পাঠের আসর
কে এম রাসেল রহমান, চাটমোহর (পাবনা)
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৫:০২ পিএম
ছবি: ভোরের কাগজ
শরতের রাত, আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ, একটি গ্রাম্য উঠান, মাদুরের উপরে শত শত মানুষ। অসংখ্য কৌতুহলী চোখের দৃষ্টি কয়েকটি কুপি বাতির দিকে। কুপি বাতির পাশে গদিঘরের ক্যাশ বাক্সের মত একটি টুল।
৭০ বছর বয়সী জলিল নামে এক ব্যক্তি এসেছেন পুঁথি পাঠ শুনতে। বাঙালির হারানো লোকজ ঐতিহ্যের অংশ পুথি। এ আইয়ের যুগ থেকে ৩'শ বছরের পেছনের গল্প। যেখানে উঠানে মাদুর পেতে মানুষ শুনতো কালু গাজী চম্পাবতী,সোনাভান, নিজাম ডাকাতের পুথি। বিভিন্ন এলাকা থেকে এই অজপাড়াগাঁয়ে এসেছেন আবাল বৃদ্ধ বনিতা। শিশু নারী-পুরুষ সকলেই কিতাব প্রামানিকের উদোম উঠোনে জোসনায় মাদুরে লেপটে বসেছে। অনেকের চোখে মুখে উৎসুখের ছাপ।
আরও পড়ুন: জামায়াতের তুলনায় আওয়ামী লীগের অপরাধ লঘুই বলা যায়: রাশেদ খান
পাবনার চাটমোহরে হারিয়ে যাওয়া লোকজ সাহিত্য ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পুঁথি পাঠের আসর বসেছিল বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাতে উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের সোনাহার পাড়ায় কিতাব প্রামাণিকের বাড়ির উঠানে।
পূর্ণিমার চাঁদ, কুপি আর হারিকেনের নিভু নিভু আলোয় নাট্যজন আসাদুজ্জামান দুলাল তার মায়াবি সুরের জাদুতে সোনাভান পুথি পাঠ করেন। প্রতিটি মানুষ শৃঙ্খলিত হয়ে শ্রবণ করেন পুঁথি পাঠ। এছাড়া লইমুদ্দিন প্রামানিক এবং ওসমান সরদার
পুথি পাঠ করেন। পুথি পাঠ শুনতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত শব্দ প্রকৌশলী রিপন নাথ, চলচ্চিত্রকার নিয়ামুল মুক্তা শুধু ঢাকা থেকে নয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছিলেন সাহিত্য প্রেমি, সংস্কৃতি সেবীসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ।
আয়োজকদের অন্যতম ডা. আতিকুর রহমান আতিক জানান, আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের হারিয়ে যাওয়া লোকজ সাহিত্য ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এই পুঁথি পাঠের আসরের আয়োজন করা হয়েছে। এই আয়োজন সমৃদ্ধ করেছেন সজল বিশ্বাস,বিপ্লব আচার্য্য, প্রভাষক আব্দুল মান্নান, অম্লান ভট্টাচার্য, সৌরভ কুন্ডু, শুভ কর্মকারসহ মুক্তচিন্তার স্থানীয় মানুষ।
উল্লেখ্য, উপমহাদেশে পুঁথি সাহিত্য শুরু হয়েছিল প্রায় আঠারো শতকে। আনুমানিক ১৬৮০-১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে হুগলির বালিয়া- হাফেজপুরের কবি ফকির গরীবুল্লাহ এই পুঁথি কাব্যধারার সূত্রপাত করেন আমীর হামজা রচনার মধ্য দিয়ে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে পুঁথির বত্রিশ শতাংশ শব্দ ছিল বিদেশী। মধ্যযুগে প্রায় পাঁচশ বছর ধরে বাংলা ভাষার যে সাহিত্যরীতি চলে আসছিল, তার থেকে এটা সম্পূর্ণ আলাদা। ধারণা করা হয় পুঁথি সাহিত্যের উৎস ছিল কলকাতা, হাওড়া, হুগলি ও চব্বিশ পরগনা অঞ্চলের মানুষের কথ্যভাষা।
গ্রাম বাংলার খানকা ঘর, খোলা উঠোনে নতুন ধান উঠার পর কিংবা শীতের রাতে পুঁথি পাঠের আসরে পাঠ করা হতো, আমীর হামজা, শাহনামা, আলেফ লায়লা, হাতেম তাই, কমলা সুন্দরীর পুঁথি, দেলদার কুমার ও শাহজাদী দিল পিঞ্জির কিচ্ছা, জঙ্গনামা, আমি সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরীর পুঁথি, গাজিকালু ও চম্পাবতী কন্যার পুঁথি, তাজকিরাতুল আউলিয়া, কাসাসুল আম্বিয়া, বিবি সোনাভান, ফকির বিলাস, লাইলী মজনু প্রভৃতি। হানিফা, হামজা, হাতেম তাই, সোহরাব-রুস্তম, জৈগুন বিবি প্রমুখ বীর চরিত্র নিয়ে রচিত কাব্যগুলি বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল। কালের বিবর্তনে এবং আকাশ সংস্কৃতির ভয়াল গ্রাসে, আধুনিকতার জাঁতাকলে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য পুঁথি পাঠের আসর আজ বিলুপ্তির পথে।
