‘মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি’
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৮ পিএম
মুক্তা ইসলাম মাওয়া ও সোহেল শিকদার। ছবি: সংগৃহীত
পঁচিশ বছর বয়সী মুক্তা ইসলাম মাওয়ার পায়ে শিকল। খাটের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে তাঁকে। কয়েক সেকেন্ড পরপর চামড়ার বেল্ট দিয়ে সজোরে পেটাচ্ছিলেন স্বামী সোহেল শিকদার (৩১)। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলেন মুক্তা। শরীরজুড়ে ছিল রক্তাক্ত জখমের চিহ্ন। পাশের কক্ষে তখন মায়ের ওপর নির্যাতন দেখে কাঁদছিল তাঁর দুই সন্তান সাফওয়ান (৫) ও তাসফিয়া (৪)।
তবু দুই সন্তানের কান্নায় মন গলেনি সোহেলের। সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে আসার সুযোগ চেয়ে মুক্তা বলেছিলেন, ‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি।’ কিন্তু নির্যাতন থামাননি সোহেল।
রাজধানীর খিলক্ষেতের ৫ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে স্ত্রীকে নির্যাতনের সেই ভিডিও নিজেই ধারণ করেন সোহেল। পরে ভিডিওটি মুক্তার ভাইয়ের মোবাইল ফোনে পাঠিয়ে লেখেন, ‘তোমার বোনকে নিয়ে যাও।’
এর তিন দিন পর খিলক্ষেতের বাসা থেকে মুক্তার লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনের পর মুক্তাকে হত্যা করে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন সোহেল। তাদের দাবি, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্দেহ ও যৌতুকের দাবিতে কয়েক মাস ধরে মুক্তার ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন তিনি।
নির্যাতনের ভিডিও
প্রায় তিন মিনিটের ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তাকে বেল্ট দিয়ে মারধর করছেন সোহেল। এ সময় তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘কথা ক, কথা ক, তোরে আজ পিটাইয়া মাইরা ফালামু। তোকে আমি ছাড়ব না। তোকে আজ ছাড়ব কি ছাড়ব না, এটা আমার বিবেচনা। একবার শুধু কথা ক।’
নির্যাতনের একপর্যায়ে মুক্তা বলেন, ‘আমি কিছু করিনি। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’ এরপরও তাঁকে মারধর করা হয়। তখন মুক্তা কাতর হয়ে বলেন, ‘আমাকে আর মাইরো না, ও আল্লাগো।’
আরও পড়ুন: ১০৪ বছর বয়সে কারাগারে, মাথায় ১০ বছরের সাজা
ভিডিওতে দেখা যায়, নির্যাতনের একপর্যায়ে মুক্তা চোখ বন্ধ করে অস্ফুট স্বরে কিছু বলছিলেন। তখনও তাঁর শরীরে বেল্ট দিয়ে আঘাত করা হচ্ছিল।
লাশ উদ্ধারের ঘটনায় মামলা
মুক্তার লাশ উদ্ধারের ঘটনায় গত শুক্রবার খিলক্ষেত থানায় মামলা করেন তাঁর ছোট ভাই তানভীর রহমান। এজাহারে বলা হয়, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্দেহে মুক্তার ওপর নিয়মিত নির্যাতন চালাতেন সোহেল।
মামলায় উল্লেখ করা হয়, সর্বশেষ ৩০ আগস্ট মুক্তাকে বেল্ট দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করে আহত করা হয়। এতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ওই দিনের নির্যাতনের ভিডিও সোহেল তাঁর এক স্বজনকে পাঠান এবং মুক্তাকে মেরে ফেলার হুমকিও দেন। পরে গত বৃহস্পতিবার মুক্তার লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় থাকার খবর পান স্বজনরা।
মুক্তার ভাই তানভীর রহমান বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই তাঁর বোনের লাশ সিলিং ফ্যান থেকে নামিয়ে ফেলা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘কয়েক মাস আগে আমার কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিলেন সোহেল। সেই টাকা দিতে দেরি হওয়ায় বোনকে মারধর করা হতো।’
মুক্তার দুই সন্তান মাকে হারিয়ে সারাক্ষণ কান্নাকাটি করছে জানিয়ে তানভীর বলেন, ‘বারবার বলছে, বাবা মাকে মেরে ঝুলিয়ে রেখেছে। এই ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
তানভীর বলেন, তাঁরা চার ভাই-বোন। বাবা ছোটবেলায় মারা যাওয়ার পর মা তাঁদের বড় করেছেন। বোনের ওপর নির্যাতনের কথা জানলেও মায়ের কষ্টের কথা চিন্তা করে মুক্তা অনেক কিছু পরিবারের কাছে গোপন করতেন।
আরও পড়ুন: অনুলিপি কারাগারে পৌঁছানোর পর মুক্ত হলেন বিদিশা সিদ্দিক
তিনি বলেন, ‘অনেক নির্যাতন সহ্য করার পরও মারা যাওয়ার আগে আমার বোন পুলিশের কাছে যায়নি।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, মুক্তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। একই এলাকার সোহেল শিকদারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে খিলক্ষেতে স্বামীর সঙ্গে বসবাস করছিলেন মুক্তা।
সোহেল প্রথমে খিলক্ষেত এলাকায় মুদি দোকান করতেন। পরে এমব্রয়ডারি ব্যবসায় যুক্ত হন। সেই ব্যবসাতেও সফল হতে না পেরে স্ত্রীর সঙ্গে অশান্তি শুরু করেন বলে পরিবারের অভিযোগ। একপর্যায়ে শ্বশুরবাড়ির কাছে যৌতুক দাবি করতে থাকেন বলেও জানান তাঁরা।
খিলক্ষেত থানার ওসি মুহাম্মাদ সোহরাব আল হোসাইন বলেন, মুক্তাকে পেটানোর ভিডিওটি তাঁর মৃত্যুর তিন দিন আগের।
তিনি বলেন, ‘ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে এটি হত্যা, না আত্মহত্যা। প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
