×

সিলেট

অস্তিত্বসংকটে রামসার টাঙ্গুয়ার হাওর, অপরিকল্পিত পর্যটনে বাড়ছে মৃত্যু

Icon

মধ্যনগর (সুনামগঞ্জ) প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৮ পিএম

অস্তিত্বসংকটে রামসার টাঙ্গুয়ার হাওর, অপরিকল্পিত পর্যটনে বাড়ছে মৃত্যু

ছবি: ভোরের কাগজ

‘রামসার সাইট’ টাঙ্গুয়ার হাওরে এখন প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মানুষের উৎপাত। বর্ষায় বিস্তীর্ণ জলরাশি, মেঘালয়ের পাহাড়ের ছায়া, নীল আকাশ, হিজল-করচের বন আর পরিযায়ী পাখির বিচরণ দেখা যেতো। একসময় যে জলাভূমি ছিল প্রকৃতির এক অনন্য আশ্রয়, সেখানে এখন ইঞ্জিনচালিত নৌযানের বিকট শব্দ, উচ্চৈঃস্বরে গান, প্লাস্টিক ও মানববর্জ্য এবং পর্যটকের অনিয়ন্ত্রিত ভিড় ক্রমেই স্বাভাবিক দৃশ্য হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেক ভয়ংকর বাস্তবতা- পর্যটনকেন্দ্রিক দুর্ঘটনা ও মৃত্যু।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ট্যাকেরঘাট এলাকায় হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান পর্যটক আশিষ কুমার রায় (৫১)। সকালে ছয়জনের একটি দল নিয়ে 'হৈমন্তী' নামের হাউসবোটে টাঙ্গুয়ার হাওরে গিয়েছিলেন তিনি। দিনভর গোসল ও ঘোরাফেরার পর বিকেলে তারা ট্যাকেরঘাট ও শহীদ সিরাজ লেক এলাকায় যান। ফেরার পথে আশিষ অসুস্থ হয়ে পড়ে গেলে স্থানীয়রা তাঁকে প্রথমে পল্লী চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। পরে স্পিডবোটে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

আশিষের মৃত্যু পানিতে ডুবে বা নৌদুর্ঘটনায় হয়নি। কিন্তু একই সময়ে হাওরে পর্যটনকেন্দ্রিক অন্যান্য মৃত্যুর ধারাবাহিকতা টাঙ্গুয়ার নিরাপত্তাব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। তবে এর আগেও পর্যটনকেন্দ্রিক নানা দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে। 

অনুসন্ধান ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরেই হাওর ও আশপাশের জলপথে অগ্নিকাণ্ড, নৌযানের সংঘর্ষ, পানিতে ডুবে মৃত্যু এবং হাউসবোটের মেশিনে পড়ে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ৫ জুন আট বছরের সৌম্যতা সরকার নিঝুমের মৃত্যু, ১০ জুন হাউসবোট ও মালবাহী নৌযানের সংঘর্ষে নৌশ্রমিক আমিন মিয়ার মৃত্যু এবং ২১ আগস্ট চলন্ত হাউসবোট থেকে পড়ে ১০ বছরের রুকাইয়া নূর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিরাপত্তার ভঙ্গুরতা স্পষ্ট করেছে। ২৭ আগস্ট টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে এসে পাশ্ববর্তী মনাই নদীতে গোসল করতে নেমে প্রাণ হারায় আব্দু মাজেদ নামের এক পর্যটক। গত আটমাসে এনিয়ে পর্যটন কেন্দ্রীক মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ালো ১৩ -তে।


তবে এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব নয়। অনেক ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয় না, আবার স্বজনদের অনুরোধে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ হস্তান্তরের ঘটনাও রয়েছে। ফলে প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন।

স্থানীয় একটি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত আট মাসে টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটন কার্যক্রমসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দুর্ঘটনায় একাধিক শিশুসহ অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে এ সংখ্যার পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব নেই। কারণ পর্যটনসংশ্লিষ্ট অনেক মৃত্যুর ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের আবেদনের পর মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। ফলে পুলিশের কাছেও এ ধরনের মৃত্যুর নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই।

অর্থাৎ মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে, আবার মৃত্যুর পূর্ণ হিসাবও থাকছে না। এখানেই টাঙ্গুয়ার পর্যটনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে।

লাইফ জ্যাকেট আছে, ব্যবহার কতটা নিশ্চিত?

টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো বিশাল জলরাশিতে পর্যটকদের নিরাপত্তার প্রথম শর্তগুলোর একটি হলো লাইফ জ্যাকেটের পর্যাপ্ততা এবং বাধ্যতামূলক ব্যবহার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নৌযানে লাইফ জ্যাকেট রাখা আর পর্যটকের গায়ে তা পরানো এক বিষয় নয়।

সাম্প্রতিক প্রশাসনিক নির্দেশনায় পর্যটকবাহী নৌযানে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয় রিং ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ভ্রমণের আগে পর্যটকদের আচরণবিধি জানানো এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পর্যটক পরিবহন বন্ধ রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো- নির্দেশনা কতটা মানা হচ্ছে, তা দেখার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

নৌযান বাড়ছে, নজরদারি কি বাড়ছে?

পর্যটনের প্রসারের সঙ্গে টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়েছে হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযান। কিন্তু এসব নৌযানের নিবন্ধন, ফিটনেস, ধারণক্ষমতা, চালকের দক্ষতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।


গেল মাসে (আগস্ট) সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা- ইসিএ- সীমার মধ্যে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযানের প্রবেশ ও চলাচল নিষিদ্ধ করে। একই সঙ্গে নৌযান নিবন্ধনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

প্রশাসনের নির্দেশনায় নৌযানের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ১০০ ফুটের মধ্যে রাখা, পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট ও লাইফবয় রাখা, জরুরি যোগাযোগের নম্বর প্রদর্শন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পর্যটক পরিবহন বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নৌযান নিবন্ধনের জন্য ১০৭টি আবেদন জমা পড়েছে। নিবন্ধনের পর নৌযানগুলোকে নিরাপত্তা কার্যক্রম নিশ্চিত করা, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী না নেওয়া এবং বিরূপ আবহাওয়ায় ভ্রমণ বন্ধ রাখাসহ বিভিন্ন শর্ত মানতে হবে। প্রশ্ন হলো, নিবন্ধন শেষ হওয়ার পর নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত যাচাই করার সক্ষমতা প্রশাসনের আছে কি না।

দুর্ঘটনার পর উদ্ধার, নাকি আগেই প্রস্তুতি?

টাঙ্গুয়ার হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশিতে দুর্ঘটনার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ। আরও কঠিন নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান শনাক্ত করা এবং প্রশিক্ষিত ডুবুরি দিয়ে উদ্ধার অভিযান চালানো।

আবদুল মাজেদের ক্ষেত্রে স্থানীয়রা প্রায় তিন ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেন বলে জানা গেছে। এমন ঘটনায় প্রশ্ন ওঠে, পর্যটন মৌসুমে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে স্থায়ী বা দ্রুত মোতায়েনযোগ্য উদ্ধার দল থাকে কি না।

স্থানীয় সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যটন মৌসুমে গুরুত্বপূর্ণ স্পটগুলোতে প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড, দ্রুতগামী উদ্ধার নৌযান, ডুবুরি দল ও জরুরি চিকিৎসাসেবা থাকা প্রয়োজন।

কারণ দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকারী দল খোঁজা কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা নয়। নিরাপত্তাব্যবস্থা হলো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই উদ্ধার সক্ষমতা প্রস্তুত রাখা।

ঝুঁকি চিহ্নিত না করেই পর্যটন

টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত এখানেই- দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, কিন্তু ঝুঁকি আগে থেকে চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কতটা নেওয়া হচ্ছে, তার স্পষ্টতা কম।

ওয়াচ টাওয়ার, হাউসবোট নোঙরের স্থান ও জনপ্রিয় গোসলের জায়গাগুলোতে পানির গভীরতা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান, সাঁতার নিষেধাজ্ঞা এবং লাইফগার্ডের উপস্থিতি সম্পর্কে দৃশ্যমান নির্দেশনা থাকা জরুরি।

বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং সাঁতার না জানা পর্যটকদের পানিতে নামার ক্ষেত্রে নৌযান কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নির্ধারণ করা দরকার।

শুধু ‘সাবধানে চলুন’ লেখা বোর্ড ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয়কে নিরাপদ করে না।


স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিক আহমেদ কবির বলেন, 'টাঙ্গুয়ার হাওরের পর্যটনকে নিরাপদ করতে হলে শুধু নৌযান নিবন্ধন করলেই হবে না। প্রয়োজন পর্যটন মৌসুমের আগে প্রতিটি নৌযানের ফিটনেস যাচাই, চালক ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ, ধারণক্ষমতা নির্ধারণ, বাধ্যতামূলক লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গোসল নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বক্ষণিক উদ্ধারব্যবস্থা।'

তিনি বলেন, 'হাওরের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পটগুলোতে প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড নিয়োগ, দ্রুতগামী উদ্ধার নৌযান ও ডুবুরি দল প্রস্তুত রাখা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা দরকার। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর নতুন করে নির্দেশনা জারি করার চেয়ে দুর্ঘটনার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া বেশি জরুরি।'

আমরা হাওরবাসী সংগঠনের গবেষণা ও প্রকাশণা  সমন্বয়ক ফেরদৌস আলমের মতে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের টহল জোরদারের পাশাপাশি লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। হাউসবোটের ছাদ ও জানালায় রেলিং স্থাপন এবং পর্যটক ও হাউসবোট মালিক -উভয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা থাকা দরকার। 

পর্যটনের চাপেই বদলে যাচ্ছে রামসার টাঙ্গুয়া

নিরাপত্তার সংকট টাঙ্গুয়ার একটি দিক। অন্যদিকে চলছে আরও গভীর সংকট- প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয়।

স্থানীয়ভাবে 'নয় কুড়ি কান্দা, ছয় কুড়ি বিল' নামে পরিচিত টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জের মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলায় বিস্তৃত। প্রায় ১২ হাজার ৬৬৫ হেক্টর আয়তনের এ জলাভূমিতে ১৮টি মৌজা, ৫১টি জলমহাল ও ৫৪টি ছোট-বড় বিল রয়েছে বলে বিভিন্ন তথ্য ও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। হাওরের তীর ও অভ্যন্তরের বহু গ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকা মাছ, ধান ও জলাভূমির সম্পদের ওপর নির্ভরশীল।

১৯৯৯ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সালের ২০ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন জলাভূমি হিসেবে রামসার সাইটের স্বীকৃতি পায় এটি।

কিন্তু স্বীকৃতির সঙ্গে যে সংরক্ষণ দায় এসেছে, বাস্তবে তার সঙ্গে হাওরের বর্তমান চিত্রের বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।


ইঞ্জিনচালিত নৌকার বিকট শব্দ, উচ্চৈঃস্বরে গান-বাজনা, নৌযানের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, প্লাস্টিক, পলিথিন, ককসিটের প্যাকেট ও অন্যান্য বর্জ্য হাওরের জলজ প্রতিবেশের ওপর চাপ তৈরি করছে।

সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ টাওয়ারসংলগ্ন এলাকায় বিভিন্ন আকৃতির ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও হাউসবোটের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। নৌযানের শব্দ, সাইরেন ও মানুষের কোলাহলে হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে।

গত ৩০ মে পর্যটকবাহী একটি হাউসবোটে আগুন লাগলে ১২ পর্যটক অল্পের জন্য রক্ষা পান।

স্থানীয়দের হিসাবে, পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন প্রায় দুই শতাধিক হাউসবোট ও অর্ধসহস্রাধিক ছোট-বড় নৌযান হাওরে চলাচল করে। এই বিপুল নৌযান চলাচলের চাপ কেবল পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য নয়, হাওরের জীববৈচিত্র্যের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

দুই লাখ পাখি থেকে ২৩ হাজার

টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশগত অবক্ষয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান সূচক সম্ভবত পাখির সংখ্যা কমে যাওয়া।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রায় ২০৮ প্রজাতির দুইলাখের বেশী পাখির উপস্থিতি দেখা গেলেও ২০২৪ সালে মাত্র তা কমে মাত্র ৪৯ প্রজাতির ৪৩ হাজার ৫১৬টি পাখি গণনা করা হয়েছিল এবং ২০২৬ সালের শুমারিতে সেই পরিমান কমে প্রায় ২৩ হাজারে নেমে আসে। গবেষকদের মতে, দুই দশকের মধ্যে এ বছর সেখানে সবচেয়ে কমসংখ্যক পরিযায়ী পাখি এসেছে।


বার্ডস ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ সীমান্ত দীপু এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপে জানান, এই পতনের পেছনে একাধিক কারণ থাকলেও আবাসস্থলে মানুষের চাপ, পর্যটকবাহী নৌযান চলাচল, স্থানীয় চোরাশিকারীদের দৌড়াত্ব ও অন্যান্য পরিবেশগত সংকটকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

২০১২ সালের একটি গবেষণায় এ হাওরে প্রায় ২৫০ প্রজাতির পাখি, ১৪০ প্রজাতির মাছ, ১২টির বেশি প্রজাতির ব্যাঙ, ১৫০টির বেশি প্রজাতির সরীসৃপ এবং এক হাজারের বেশি প্রজাতির অমেরুদণ্ডী প্রাণীর উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

হিজল, করচ, বরুণ, বনতুলসী, নলখাগড়া, শালুক ও শাপলাসহ নানা উদ্ভিদও এ জলাভূমির প্রতিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু আবাসস্থল ধ্বংস, গাছপালা উজাড়, অবৈধ মাছ শিকার এবং মানুষের নানা কর্মকাণ্ডে এসব সম্পদও হুমকিতে পড়েছে। একসময় যে জলাভূমির আকাশে পাখির ঝাঁক দেখা যেত, স্থানীয়দের বর্ণনায় এখন সেখানে পর্যটকবাহী নৌযানের আধিপত্যই বেশি দৃশ্যমান।

মাছের ভাণ্ডারেও শূন্যতা

টাঙ্গুয়ার হাওর একসময় দেশীয় মাছের গুরুত্বপূর্ণ ভান্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোণাজাল, কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি জালসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর উপায়ে মাছ ধরার কারণে মাছের প্রজনন ও জলজ প্রাণীর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কোথাও কোথাও বৈদ্যুতিক শক ব্যবহার করে মাছ ধরার অভিযোগও রয়েছে।

হাওর তীরের গ্রাম সানুয়া জালোহটির বাসিন্দা জেলে শিবু চরণ বর্মনের স্মৃতিতে টাঙ্গুয়া ছিল অন্য রকম। তাঁর ভাষায়, আগে হাতে বাওয়া নৌকা নিয়ে বিলে গেলে পাখিরা ভয় পেত না। এখন ইঞ্জিনচালিত নৌকার উৎপাত হাওরকে 'ফানাফানা' করে দিচ্ছে। মাছ ও পাখি থাকার নিরাপদ জায়গা নাই। আলংডোয়ার একটা জায়গা, যেডা চিতল মাছের খনি আছিল। ওই চিতল মাছ এখন আর নাই। বন-ঝোপঝাড় সব শেষ হইয়া গেছে। হাওরের উপর যে অত্যাচার হইতাছে, দুইদিন আগপিছ কিচ্ছুই থাকতো না।

জয়পুর গ্রামের পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিক আহমেদ কবির বলেন, "একসময় পাখির কলরবে ঘুম ভাঙত। এখন বন-পাখপাখালি অনেকটাই কমে গেছে। পরিচিত অনেক মাছও আর দেখা যায় না।" তাঁর মতে, টাঙ্গুয়ার হাওরকে নিরাপদ রাখতে ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার এবং পর্যটনের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব হস্তচালিত নৌকার সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে।

২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টাঙ্গুয়ার হাওরে সিএনআরএসের হয়ে কাজ করা এবং বর্তমানে আইইউসিএন-এর কর্মকর্তা এহিয়া সাজ্জাদ বলেন, "হাওরের পরিবেশ সুরক্ষায় প্রায় দুই লাখ গাছ লাগানো হয়েছিল। তাঁর মতে, গাছপালা, বন, মাছ ও পাখির ওপর স্থানীয় নানা চাপের পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। প্লাস্টিক ও মানববর্জ্যে জলজ প্রতিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।"


পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক লেখক আলম শাইন বলেন, "পর্যটকবাহী ইঞ্জিনচালিত নৌকার উচ্চশব্দ টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রতিবেশগত নিয়ম-কানুনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে পর্যটন পুরোপুরি বন্ধ না করে পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনার ওপর তিনি জোর দেন। তাঁর মতে, এর জন্য মনিটরিং জোরদার করতে হবে।"

কাগজে পরিকল্পনা, মাঠে কতটা বাস্তবায়ন?

টাঙ্গুয়ার হাওরের সংকট নিয়ে নতুন করে উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের সাম্প্রতিক ১৩ দফা নির্দেশনায় উচ্চৈঃস্বরে গান-বাজনা ও পার্টি নিষিদ্ধ, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পানি, সেপটিক ট্যাংক, লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয় ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, নির্দেশনা জারি হওয়ার পর মাঠে পরিবর্তন কতটা এসেছে?

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউস মিলনায়তনে ‘কমিউনিটি বেসড ম্যানেজমেন্ট অব টাঙ্গুয়ার হাওর ওয়েটল্যান্ড ইকোসিস্টেম’ প্রকল্পের আওতায় নীতিনির্ধারণী পরামর্শ সভায়ও এই সংকট গুরুত্ব পায়। পরিবেশ অধিদপ্তর ও টাঙ্গুয়ার হাওর জলাভূমি পরিবেশ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের যৌথ আয়োজনে সভায় জিইএফ ও ইউএনডিপি সহযোগিতা করে।

সভায় টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রতিবেশ অবক্ষয়ের পেছনে অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ, অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ আহরণ, অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার এবং পলি জমে বিলে পানিধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়গুলো চিহ্নিত করা হয়।

আলোচনায় প্রজনন মৌসুমে অবৈধ মাছ ধরা বন্ধে নজরদারি, ‘কমিউনিটি গার্ড’ ব্যবস্থা কার্যকর করা এবং হাউসবোট চালকদের পরিবেশবান্ধব আচরণে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের আহ্বান জানানো হয়।

সভায় প্রধান অতিথি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম এবং সভাপতি জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান আশ্বাস দেন, হাওরের ভারসাম্য বজায় রেখে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও প্রতিবেশ সুরক্ষায় প্রাপ্ত মতামতগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হবে।

স্থানীয় মানুষ কোথায়?

টাঙ্গুয়ার সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো- যে জলাভূমির ওপর স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল, সেই জলাভূমির ব্যবস্থাপনায় তাদের ভূমিকা কতটা?

হাওর রক্ষায় স্থানীয় জেলে, কৃষক, নৌকার শ্রমিক, তীরবর্তী গ্রামের বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁরা জানেন কোথায় মাছের প্রজননক্ষেত্র, কোথায় পাখির আবাস, কোন পথে নৌযান চলাচলে সমস্যা হয় এবং কোথায় পর্যটকের ঝুঁকি বেশি।

শুক্রবারের পরামর্শ সভায়ও স্থানীয় অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু মতামত নেওয়ার পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার বাস্তব সিদ্ধান্তে তাঁদের ভূমিকা কতটা থাকবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু পর্যটনের স্থান নয়। এটি একটি জীবন্ত জলাভূমি, একটি মৎস্যভান্ডার, পাখির আবাস এবং হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার ভিত্তি।

রামসার স্বীকৃতি কি শুধু নামেই?

২০০০ সালে রামসার সাইটের স্বীকৃতি পাওয়ার মধ্য দিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর আন্তর্জাতিক গুরুত্বের জলাভূমির মর্যাদা পেয়েছে। কিন্তু স্বীকৃতির দুই দশকের বেশি সময় পর যদি পাখির সংখ্যা কমে, মাছের আবাস সংকুচিত হয়, গাছপালা হারায়, বর্জ্যে পানি দূষিত হয় এবং পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়- তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, সংরক্ষণের দায়টি কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে?

টাঙ্গুয়ার হাওরের সংকট তাই শুধু পর্যটকের মৃত্যুর হিসাব নয়। এটি একটি বৃহৎ জলাভূমির ধীরে ধীরে প্রাণ হারানোর সংকেতও হতে পারে।

পর্যটন অবশ্যই স্থানীয় অর্থনীতির সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই পর্যটন যদি হাওরের প্রতিবেশ ধ্বংস করে, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা সংকটে ফেলে এবং পর্যটকের জীবনকেও ঝুঁকিতে ঠেলে দেয়, তাহলে তাকে টেকসই পর্যটন বলা যায় না।

টাঙ্গুয়ার জন্য এখন প্রয়োজন শুধু আরও নির্দেশনা নয়- নির্দেশনার কঠোর বাস্তবায়ন; শুধু নৌযান নিবন্ধন নয়- নিরাপত্তা ও পরিবেশগত শর্তের নিয়মিত তদারকি; শুধু দুর্ঘটনার পর উদ্ধার নয়- দুর্ঘটনার আগেই প্রতিরোধ; শুধু পর্যটক বাড়ানো নয়- হাওরের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী পর্যটন নিয়ন্ত্রণ; এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, স্থানীয় মানুষকে ব্যবস্থাপনার অংশীদার করা।

কারণ টাঙ্গুয়ার হাওরকে বাঁচানো মানে শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্রকে বাঁচানো নয়। বাঁচানো মানে মাছ, পাখি, বন, পানি, জীববৈচিত্র্য এবং হাওরপাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষা করা।

সুন্দরবনের পরেই বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওরের সামনে এখন মূল প্রশ্ন একটাই- আমরা কি তার সৌন্দর্য দেখতে চাই, নাকি তার অস্তিত্বও বাঁচিয়ে রাখতে চাই?

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ময়মনসিংহ মেডিকেলে অগ্নিকাণ্ড, পদদলিত হয়ে নিহত ৬

ময়মনসিংহ মেডিকেলে অগ্নিকাণ্ড, পদদলিত হয়ে নিহত ৬

১১তলা থেকে পড়ে গুরুতর আহত সেই শিক্ষার্থী অমিতের মৃত্যু

১১তলা থেকে পড়ে গুরুতর আহত সেই শিক্ষার্থী অমিতের মৃত্যু

পে-স্কেলের গেজেট কবে, আলোচনায় যেসব তারিখ

পে-স্কেলের গেজেট কবে, আলোচনায় যেসব তারিখ

অস্তিত্বসংকটে রামসার টাঙ্গুয়ার হাওর, অপরিকল্পিত পর্যটনে বাড়ছে মৃত্যু

অস্তিত্বসংকটে রামসার টাঙ্গুয়ার হাওর, অপরিকল্পিত পর্যটনে বাড়ছে মৃত্যু

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App