গরমে পুড়ছে ইউরোপ-আমেরিকা
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ইউরোপ এবং আমেরিকার বিস্তৃত এলাকাজুড়ে একটি শক্তিশালী ‘হিট ডোম’ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নজিরবিহীন ও প্রাণঘাতী তাপদাহ চলছে। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে তীব্র রোদে গলে গেছে রাস্তার পিচ এবং বেঁকে গেছে রেললাইন। বনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে দাবানল। এ সব কারণে জারি করা হয়েছে জরুরি অবস্থা ও হিট-অ্যালার্ট।
মূলত গত জুন মাসের শেষের দিকে ইউরোপে নজিরবিহীন তাপপ্রবাহ শুরু হয়। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন এবং মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। এতে প্রায় ৪১ কোটি মানুষের বসবাস এলাকা আক্রান্ত হয়। যা ২০০৩ সালের ১ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত রেকর্ড তাপপ্রবাহে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৩২ কোটি।
এএফপির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুনের ১৫ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মুখোমুখি হন ইউরোপের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ। তবে মহাদেশটি এখনো তীব্র গরম মোকাবিলায় পর্যাপ্তভাবে প্রস্তুত নয়। একটু স্বস্তির জন্য তারা নদী ও জলাধারে ভিড় জমাচ্ছেন। পানিতে ডুবে ঘটছে মৃত্যুর ঘটনাও। কিছু কিছু এলাকায় স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দ জেফ্রে জানিয়েছেন, তীব্র গরমের কারণে দেশটির প্রায় ৬ হাজার স্কুল হয় সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে, না হয় পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের শত শত স্কুল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চালু করা হয়েছে ‘গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সময়সূচি’। যেখানে ক্লাস ও স্কুল ছুটির সময় অনেকটাই কমিয়ে আনা হয়েছে।
কোপার্নিকাস জলবায়ু সেবার তথ্যানুযায়ী, ইউরোপই বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ। এখানে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্বিগুণ গতিতে তাপমাত্রা বাড়ছে। বিবিসি জানিয়েছে, বর্তমানে আজোরেস অঞ্চল থেকে পর্তুগাল ও স্পেন অভিমুখে একটি শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয় তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাবে এই সপ্তাহান্ত নাগাদ ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলে তাপমাত্রা আরো বাড়ার পূর্বাভাস আছে।
ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, জুন মাসের শেষ সপ্তাহে মৃত্যুহার এর আগের সপ্তাহের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষ করে ৪৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে মৃত্যুর হার বেড়েছে। গত ২২ থেকে ২৮ জুনের মধ্যে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ২৫ জন বেড়েছে, যা প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। কেবল রাজধানী প্যারিসেই মৃত্যুর হার বেড়েছে ৬২ শতাংশ। ১৮ জুন থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত পানিতে ডুবে ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তীব্র গরমে ফ্রান্সে মোট মৃত্যুর প্রাথমিক এই পরিসংখ্যান প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কমও হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
গত ২৪ জুন ফ্রান্সে দেশজুড়ে গড় হিসাবে ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। ওইদিন রাজধানী প্যারিসে তাপমাত্রা প্রায় ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায় এবং দেশের অর্ধেক এলাকায় তাপপ্রবাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ‘লাল সতর্কতা’ জারি করা হয়।
এ ছাড়া জুন মাসে মারাত্মক তাপপ্রবাহে যুক্তরাজ্যের সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২৫ জনের মৃত্যুর খবর রেকর্ড করা হয়েছে। তবে বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী এ সংখ্যা প্রায় ৮৬২ জন। অরক্ষিত জলাশয়ে সাঁতার কাটতে নেমে বেশ কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছেন বলেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে।
তীব্র গরমে বেলজিয়ামে ১ হাজার ২২২ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যাদের অর্ধেকই ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সী। ডাচ কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, নেদারল্যান্ডসেও গত সপ্তাহে তীব্র গরমের কারণে প্রায় ৪৮০ জন অতিরিক্ত মানুষ মারা গেছে।
ইতালিতে বেশ কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চরম তাপমাত্রার কারণে দেশটিতে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে অন্তত ৫ জন মারা যাওয়ার রেকর্ড করা হয়েছে। এ ছাড়া স্পেন ও পর্তুগালসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোতেও তীব্র গরমে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে তীব্র গরমে প্রাণহানীর পাশাপাশি ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলে একের পর এক দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে। ফরাসি সরকার জানিয়েছে, চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে এখন পর্যন্ত ৭ হাজারের বেশি দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। এতে ৮ হাজার ৭০০ হেক্টরের বেশি বনভূমি পুড়ে গেছে। সাধারণত জুলাইয়ের শেষ দিকে দাবানলের মৌসুম তীব্র হলেও এবার তা আগেই শুরু হয়ে দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলঘেঁষা অঞ্চলগুলো। দক্ষিণ ফ্রান্সের আউদ, পিরেনে-ওরিয়ঁতাল, বুশ-দ্যু-রোন এবং আশপাশের এলাকায় একাধিক বড় অগ্নিকাণ্ড এখনো সক্রিয় রয়েছে। শুধু আউদ এলাকাতেই প্রায় ৯০০ হেক্টরের বেশি বনভূমি ইতোমধ্যে পুড়ে গেছে। কিছু এলাকায় ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার বেগে বাতাস বইতে থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে কাজ করছেন প্রায় ২ হাজার দমকলকর্মী। তাদের সঙ্গে রয়েছে অগ্নিনির্বাপক বিমান, কানাডেয়ার উড়োজাহাজ ও হেলিকপ্টার। আগুনের ঝুঁকি থাকা এলাকা থেকে হাজারো মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। কয়েকটি জায়গায় আবাসিক এলাকা, গুদামঘর, শিল্পাঞ্চল ও পর্যটন ক্যাম্পসাইট আগুনের হুমকির মুখে পড়েছে। কিছু অঞ্চলে পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় সাময়িকভাবে সড়ক ও বিমান চলাচল সীমিত করা হয়েছে।
শুধু ফ্রান্সই নয়, তীব্র তাপদাহে ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও দাবানল ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, বসন্তের পর বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় বনাঞ্চল অত্যন্ত শুষ্ক হয়ে পড়েছে, যা আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইউরোপে তাপপ্রবাহ এখন আরো ঘন ঘন, দীর্ঘস্থায়ী এবং তীব্র হয়ে উঠছে। এর ফলে দাবানলের ঝুঁকিও বাড়ছে। একই সঙ্গে কৃষি, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাতে এর প্রভাব আরো গভীর হচ্ছে।
আবহাওয়া দপ্তর সতর্ক করেছে, আগামী দিনগুলোতেও তাপমাত্রা উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে। ফলে দাবানলের ঝুঁকি অব্যাহত থাকবে। তাই নাগরিকদের অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং দাবানলপ্রবণ এলাকায় আগুন ব্যবহার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের বড় অংশজুড়ে ‘বিপজ্জনক’ দাবদাহ বয়ে যাচ্ছে। এ কারণে গত শুক্রবার দেশটিতে ২৫০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের অংশ হিসেবে আয়োজিত কয়েক ডজন প্যারেড, কনসার্ট এবং আতশবাজি প্রদর্শনী বাতিল বা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অন্তত সাতটি রাজ্যে বড় বড় অনুষ্ঠান বাতিলের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মেরিল্যান্ডের টাকোমা পার্ক, ফিলাডেলফিয়ায় স্বাধীনতা দিবসের প্যারেড এবং ভার্জিনিয়ার লাউডন কাউন্টির বিভিন্ন মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান রয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
তীব্র গরমের কারণে ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মলে আয়োজিত ‘দ্য গ্রেট আমেরিকান স্টেট ফেয়ার’ও বিঘিœত হয়েছে। শুক্রবার বিকালে ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রার কারণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আয়োজনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়।
এ ব্যাপারে আয়োজকরা জানিয়েছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কুলিং টেন্ট (শীতলীকরণ তাবু) এবং পানি ছিটানোর বিশেষ মিস্ট স্টেশন বসানোর মতো কিছু বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে তা ফের চালু করা হবে।
ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে রেকর্ড ভাঙা তাপমাত্রা মধ্য-পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে শুক্রবার ১৮৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ তাপ সতর্কতার (হিট অ্যালার্ট) আওতায় ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অংশে সর্বোচ্চ ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা চড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, তাপপ্রবাহের কারণে ইউরোপ এবং আমেরিকার হাসপাতালগুলোতে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে বয়স্ক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব মোকাবিলায় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবে ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোকে ‘হিট হেলথ অ্যাকশন প্ল্যান’ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
