হামলার মধ্যেই সমঝোতার আলোচনা
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। পাল্টাপাল্টি হামলার পাশাপাশি চলছে তীব্র কথার লড়াই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত বাবা ও পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নেয়া ‘অনিবার্য’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। অপরদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান সরকার যদি তাকে হত্যা বা হত্যার কোনো চেষ্টা চালায়, তাহলে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ইরানে ব্যাপক হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এছাড়া ইরানে হামলা চালাতে মুখিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েল। ফের হামলা শুরু হলে ‘আরো বেশি শক্তি’ প্রয়োগ করবে বলে হুংকার দিয়েছে তেল আবিব। এমন যুদ্ধংদেহী আবহে হরমুজ প্রণালি ও মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক ও যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়েছে।
যদিও তীব্র উত্তেজনার মধ্যে গতকাল শনিবার ওমানে আলোচনায় অংশ নেয় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র। এ সময় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ইরানের কাছ থেকে নিশ্চয়তা চান যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানকে প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে- গুরুত্বপূর্ণ এই হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং তারা আর কোনো বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি বা হামলা চালাবে না। উপসাগরীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক সংঘাত ও উত্তেজনার পর এই প্রতিশ্রæতি চেয়েছে ট্রাম্পের দেশ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তাদের বরাতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম লিখেছে, তেহরান অনানুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের কাছে স্বীকার করেছে- জাহাজে গুলি চালানো একটি ভুল ছিল। হামলার জন্য ইরানিরা নিজেদের একটি দলছুট গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে বিবিসি। সংবাদ মাধ্যমটিকে এক মার্কিন কর্মকর্তার জানিয়েছেন, তারা (ইরানি প্রতিনিধি দল) আলোচনার টেবিলে ফিরে এসে বলেছে, ‘আমাদের বড় ভুল হয়ে গেছে। আমরা ভুল করেছি। আসুন আলোচনা চালিয়ে যাই’।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান আমাদের আলোচনা চালিয়ে যেতে বলেছে। আমরা তাতে রাজি হয়েছি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তাদের দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধবিরতি শেষ!’ হোয়াইট হাউস মনে করে, হরমুজে সংঘটিত ওই ঘটনা যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন।
অন্যদিকে ট্রাম্পের এ বক্তব্যের বিরোধিতা করেছে ইরান। দেশটি বলেছে, আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো ধরনের অনুরোধ করেনি তেহরান। বরং কাতারের এক মধ্যস্থতাকারীকে আতিথ্য দিতেই তারা এই আলোচনায় সম্মত হয়েছে।
এক্সে দেয়া এক পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেন, যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে ইরান। বরং যুক্তরাষ্ট্রই যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গ করেছে।
এমন বিপরীতমুখী বক্তব্যের পর পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, উত্তেজনা প্রশমন এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনার জন্য গত শুক্রবার
ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা। এরপর গতকাল শনিবার কাতারে ওই আলোচনা শুরু হয়। তবে কাতারে এই আলোচনা ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি নাকি পরোক্ষভাবে হয়েছে, সে ব্যাপারে কিছুই জানায়নি আয়োজকরা। এমনকি আলোচনা কতো সময় চলমান ছিল নাকি চলছে সে ব্যাপারেও কিছু জানা যায়নি।
মূলত গত সোমবার ওমান উপকূলের অদূরে হরমুজ প্রণালিতে অন্তত তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। ইরান এই হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানজুড়ে কয়েক দফা বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। এ ঘটনার পাল্টা জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে একাধিকবার হামলা চালায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। গত কয়েকদিনে এমন পাল্টাপাল্টি হামলায় অস্থির হয়ে ওঠে হরমুজ প্রণালি ও মধ্যপ্রাচ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা হরমুজ প্রণালির আশপাশসহ ইরানের ৯০টি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, মার্কিন হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন। হামলার ওই সময়টাতে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা ও শোক-মিছিল চলমান ছিল। সাত দিনের শোক অনুষ্ঠান শেষে গত বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে আলী খামেনিকে দাফন করা হয়। লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে শেষ শ্রদ্ধা জানান। এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম দিকেই নিহত হন খামেনি।
এদিকে বাবা (খামেনি) হত্যার প্রতিশোধ নেয়া ‘অনিবার্য’ জানিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, ‘এই প্রতিশোধ আমাদের জাতির আকাক্সক্ষা এবং তা অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। এই বিষয়টি আমার ব্যক্তিগত অস্তিত্ব কিংবা অন্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল নয়। আমরা থাকি বা না থাকি, এটি ঘটবেই।’
বাবার দাফনের পর প্রথমবারের মতো গতকাল শনিবার দেয়া এক লিখিত বার্তায় এসব কথা বলেন মোজতবা খামেনি। বার্তাসংস্থা এএফপি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। একই দিন সংবাদ মাধ্যমটি আরো জানিয়েছে, হত্যার বিষয়ে ট্রাম্প জানিয়েছেন- ইরান সরকার যদি তাকে হত্যা বা হত্যার কোনো চেষ্টা চালায়, তাহলে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ইরানে ব্যাপক হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানকে লক্ষ্য করে এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইরানের সব এলাকা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়ার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রস্তুত, ইচ্ছুক ও সক্ষম। এ-সংক্রান্ত নির্দেশ ইতোমধ্যে দেয়া হয়েছে এবং তা এক বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। প্রয়োজনে এর মেয়াদ বাড়ানো হবে।’
এদিকে প্রয়োজন হলে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল আবারো সামরিক অভিযান চালাতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ। সে ক্ষেত্রে ‘আরো বেশি শক্তি’ প্রয়োগ করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আকাশসীমায় আধিপত্য পুনরুদ্ধার এবং হুমকি নির্মূলে ইরানে আবার হামলা চালানোর লক্ষ্যে যুদ্ধ পুনরায় শুরুর জন্য সেনাবাহিনী প্রস্তুত ও সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। প্রয়োজনে তৃতীয়বারও হামলা চালানো হবে। যদি আমাদের আবার ফিরতে হয়, আমরা ফিরব এবং আরো বেশি শক্তি নিয়ে ফিরব।’
উল্লেখ্য, হরমুজকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে আলোচনার বিকল্প নেই। ওমানে যে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে, সেখানে উভয় পক্ষই সম্ভবত একটি নতুন সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবে বলে আশা ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকদের। এতে দীর্ঘমেয়াদি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তি ফিরবে মধ্যপ্রাচ্যে।
