চাপে মোদি, ঝড় তুলেছে ককরোচ
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার (নিট) প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা বাতিল ও চরম অনিয়মের দায়ে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। এ বিষয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকারকে ‘২৪ ঘণ্টা’র কড়া আলটিমেটাম দিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে স্পষ্ট ভাষায় তারা জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি না মানলে আন্দোলন আরো বিস্তৃত হবে।
নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপির আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত ছিল গতকাল শুক্রবারও। শুধুমাত্র যন্তর মন্তর নয়; ভারতজুড়ে এই ছাত্র-আন্দোলন ও বিক্ষোভ পালিত হয়েছে। এদিন দুপুরে দ্বিতীয় দফায় দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাব অব ইন্ডিয়াতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সিজেপির হাই-ভোল্টেজ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে ওই ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয় তারা।
বৈঠকে মোদি সরকারের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সংগঠন সিজেপির পক্ষে ছিলেন দলটির জাতীয় মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। এর আগে গত সোমবার দুই পক্ষের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে একটি বৈঠক হয়েছিল।
শুক্রবার দুপুরে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, ‘আমরা আশা করছি, সরকার দ্রুত ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদ থেকে সরিয়ে দেবেন অথবা তিনি নিজেই পদত্যাগ করবেন। তাহলে এ সংকটের একটি সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এ বিষয়ে (শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ) আমাদের কাছে আজ শনিবার বিকাল পর্যন্ত সময় চেয়েছে সরকার।’
অন্যদিকে জে পি নাড্ডা বলেন, ‘সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা হয়েছে। তাদের তিনটি প্রধান দাবি রয়েছে। আমরা তাদের বলেছি, শনিবার (আজ) বিকালে আবার বসব এবং দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা করব।’ এই তিন দাবির মধ্যে মূল দাবি হলো- শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অপসারণ। বাকি দুই দাবির মধ্যে রয়েছে- নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যাকারীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়া এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে এফআইআর বা মামলা প্রত্যাহার। হিন্দুস্থান টাইমস সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে ভারতের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বড় ধরনের প্রশাসনিক রদবদল করেছে মোদি সরকার। শিক্ষা সচিব বিনীত যোশিকে সরিয়ে তার স্থলে নরেশ গাঙ্গওয়ারকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে জারি করা সরকারি প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বিনীত যোশিকে পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হয়েছে। তার পরিবর্তে নরেশ গাঙ্গওয়ার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেবেন।
এই রদবদল ছিল সরকারের বড় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং বিরোধী দলগুলোর প্রতিবাদের মধ্যেই এ সিদ্ধান্ত এলো। তবে আন্দোলনকারীদের মূল দাবি শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য নিশিকান্ত দুবে দাবি করেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় উদাসীনতা দেখানোর কারণেই শিক্ষা সচিবকে সরানো হয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দায়ীদের পাশাপাশি অবহেলা বা উদাসীনতা দেখানো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
এ অবস্থায় ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি নিশ্চিত করেছে যে, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপি অনড় থাকলেও বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নাকচ করে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট সরকার। তারাও স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি মানা হবে না।
সরকারের শীর্ষ সূত্রের বরাতে এনডিটিভি বলেছে, ৫৭ বছর বয়সী এই ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের কোনো সম্ভাবনাই নেই। তার পাশে শক্তভাবে দাঁড়িয়েছে সরকার। সরকারের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার করে উক্ত শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘দেশের জনগণ আমাদের ওপর আস্থা রেখে ম্যান্ডেট দিয়েছে ও আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করে দেখাব। পদত্যাগ নেয়া হলো সবচেয়ে সহজ সিদ্ধান্ত।’
এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভিডিও বার্তায় মোদি বলেন, ‘বন্ধুরা, আমি ভালোভাবেই জানি যে প্রশ্নপত্র ফাঁস কোনো ছোটখাটো বিষয় নয়। এতে লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকেরা চরম মানসিক কষ্টে পড়েন। এ কারণে এসব ঘটনার পর গত আড়াই মাসে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা বর্তমানে কারাগারে।’
বৃহস্পতিবার মোদি জানান, নিরলসভাবে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো ইতোমধ্যে তার কাছে একটি খসড়া প্রস্তাব জমা দিয়েছে। এ খসড়ায় দ্রুত বিচার আদালত গঠনসহ কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে খসড়াটি নিয়ে আলোচনা হবে। মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের পরামর্শ যুক্ত করে খসড়াটি চূড়ান্ত করা হবে। যত দ্রুত সম্ভব বিলটি পার্লামেন্টে পাস করার চেষ্টা করা হবে।
এরপরই সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। সেখানে তিনি লেখেন, ‘মাননীয় মোদিজি, আমাদের ছাত্ররা ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা দাবি করছেন। আপনি মধ্যরাতে করুণ ভিডিও দিয়ে তাদের বুদ্ধিমত্তাকে অপমান করবেন না।’ এ সময় মোদিকে তিন দাবির কথা স্মরণ করিয়ে দেন রাহুল। মোদিকে নিশানা করেন কংগ্রেস সভাপতি তথা রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গেও। তার কটাক্ষ, একপাক্ষিকভাবে ‘মনের কথা’ না বলে লোকসভার অধিবেশনে যোগ দিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরুন প্রধানমন্ত্রী।
নিট-কাণ্ড নিয়ে শুক্রবারও সরগরম ছিল সংসদ। দফায় দফায় অধিবেশন মুলতুবি হয়ে যায় সংসদের দুই কক্ষেই। পরে সারাদিনের জন্য লোকসভা এবং রাজ্যসভার অধিবেশন মুলতুবি করে দেয়া হয়। সংসদ চত্বরে ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে বিক্ষোভ দেখান বিরোধী সাংসদেরা। লোকসভার ভিতরেও ধর্মেন্দ্রর ইস্তফার দাবিতে স্লোগান দেন তারা। তবে এদিন একটি খসড়া বিল অনুমোদন করেছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা। এর মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে অভিযুক্তদের ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে! সেই সঙ্গে হতে পারে ১০ কোটি টাকা জরিমানা! আগামী সপ্তাহে সংসদে পেশ করা হতে পারে এই বিল। সূত্র বলছে, বিলটি পাস হলে ফাস্ট ট্র্যাক আদালতে এই সংক্রান্ত ঘটনার দ্রুত বিচার ও আরো কড়া শাস্তি দেয়া যাবে।
অপরদিকে দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলন যখন তীব্র হচ্ছে, তখন এর থেকে পিছু হটেছেন লাদাখের অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তিনিই মূলত এই আন্দোলনকে তীব্র করতে টানা ২৬ দিন অনশন করেছেন। তবে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে গুরগাঁওয়ের মেদান্ত হাসপাতালে অনশন ভাঙেন তিনি। একই সঙ্গে কোথাও যেন কোনো ধরনের সহিংসতা না ছড়ায়, সে বিষয়ে সবাইকে অত্যন্ত সতর্ক থাকার আহ্বান জানান এই অধিকারকর্মী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেয়া এক পোস্টে সোনম ওয়াংচুক বলেন, ‘কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং এবং লেহ লাদাখ অ্যাপেক্স বডির শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে অবশেষে আমি অনশন ভেঙেছি। এর আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৬৫ জন সংসদ সদস্য ব্যক্তিগতভাবে এসে কিংবা চিঠির মাধ্যমে আমাকে অনশন ভাঙার অনুরোধ জানান। বিভিন্ন শর্ত নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা এবং দেশে সম্ভাব্য সহিংসতার কথা বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত। শর্তগুলোর বিস্তারিত শিগগিরই একটি আলাদা ভিডিওর মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে।’
ওয়াংচুক বলেন, ‘হাসপাতালে আসা দুই মন্ত্রী তাকে দুটি বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। প্রথমত, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে যেসব শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, সরকার তাদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টি বিবেচনা করাসহ সামগ্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংসদে একটি ‘অর্থপূর্ণ আলোচনা’র আয়োজন করা হবে।’
সোনম ওয়াংচুক অনশন ভাঙার পরপরই এক্সে একটি পোস্ট করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমি সোনমজিকে চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চলার এবং দ্রুত আগের ওজন ফিরে পাওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। সোনমজির সুস্থতার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি।’
মূলত ককরোচদের এই আন্দোলনের সূত্রপাত গত মে মাসে। ওই সময় এক শুনানিতে ভারতীয় বেকার তরুণদের ‘ককরোচ (তেলাপোকা)’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেন দেশটির প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত। তিনি বলেছিলেন, ‘কিছু তরুণ তেলাপোকার মতো, যারা কোনো চাকরি পান না কিংবা পেশাগতভাবে কোথাও দাঁড়াতে পারেন না। তাদের কেউ কেউ গণমাধ্যমকর্মী বনে যান, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী হন, আবার কেউ তথ্য অধিকারকর্মী বা অন্য কোনো ধরনের অ্যাকটিভিস্ট হয়ে সবাইকে আক্রমণ করা শুরু করেন।’ যদিও পরে প্রধান বিচারপতি দাবি করেন, তিনি ভুয়া ডিগ্রিধারীদের উদ্দেশে এমন মন্তব্য দিয়েছিলেন। তবে ততক্ষণে জল গড়িয়েছে বহুদূর।
প্রধান বিচারপতির এমন বক্তব্যে বেশ অপমানিত বোধসহ আঘাত পান তরুণরা। তারা ক্ষোভ উগড়ে দেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের ডাক দেয় সিজেপি। তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চান। ওই সময় আন্দোলন কিছুদিন চলমান ছিল। এরপরই নতুন করে গত সোমবার থেকে আবারো শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়ে যন্তর মন্তরে আন্দোলন চলছে।
নিট (এনইইটি), সিবিএসই, সিইউইটি ও এসএসসিসহ বিভিন্ন প্রবেশিকা ও নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ঠাট্টা-বিদ্রূপ আর ব্যঙ্গের মধ্য দিয়ে জন্ম হয় অপ্রথাগত রাজনৈতিক দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামকে ব্যঙ্গ করে এই নামকরণ করা হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দীপকে।
উল্লেখ্য, নরেন্দ্র মোদি সরকারের বৈশিষ্ট্যগুলোর অন্যতম হলো কোনো রকম চাপের কাছে মাথা না নোয়ানো। এখন ককরোচদের আন্দোলনের মুখে সেই ধারা তিনি ধরে রাখবেন নাকি মাথা নোয়াবেন তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
