পতন সামলে ঘুরে দাঁড়ানোর কঠিন লড়াইয়ে পোশাক শিল্প
বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার নি¤œমুখী প্রবণতার জেরেই টানা প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পে। বছরের শুরু থেকেই অর্ডারের ঘাটতি ও রপ্তানি আয়ে ধসের যে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বছরের প্রথম অর্ধে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রথম ছয় মাসে দেশের তৈরি পোশাক খাত থেকে মোট আয় হয়েছে ১৯.৩৪ বিলিয়ন ডলার (১,৯৩৩ কোটি ৫৭ লাখ মার্কিন ডলার)। যা ২০২৫ সালের একই সময়ের (১৯.৪৬ বিলিয়ন ডলার) তুলনায় ০ দশমিক ৬৩ শতাংশ কম।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার ওঠানামা, মূল্যচাপ এবং ক্রেতাদের সতর্ক ক্রয়নীতির মধ্যেও বাংলাদেশের পোশাক শিল্প স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে ওভেন খাতের প্রবৃদ্ধি এবং মোট রপ্তানিতে খুব সামান্য পতন শিল্পের অভিযোজন সক্ষমতারই প্রমাণ।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী মাসগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ভোক্তা চাহিদা, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ক্রয়াদেশের প্রবণতার ওপর বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির গতি অনেকটাই নির্ভর করবে। আপাতদৃষ্টিতে এই হ্রাসের হার সামান্য মনে হলেও, বছরের প্রথমার্ধ-জুড়ে বিশ্ববাজারের চরম অস্থিরতা, নিট পণ্যের রপ্তানি ধস এবং প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার ফলে তৈরি পোশাক খাত যে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে- এ তথ্য তারই একটি অশনিসংকেত।
প্রথম প্রান্তিকজুড়ে টানা ধস : বছরের শুরু থেকেই ধাক্কা খেতে শুরু করে দেশের প্রধান এ রপ্তানি খাত। জানুয়ারি মাসে মোট রপ্তানি ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৩,৬১৪.৭৭ মিলিয়ন ডলারে। দ্বিতীয় মাস ফেব্রুয়ারিতে বড় ধাক্কা আসে; রপ্তানি আয় ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ কমে হয় ২,৮১৫.৯৩ মিলিয়ন ডলার। মন্দার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে মার্চে, এ মাসে রপ্তানি আয় একলাফে ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ কমে নেমে আসে ২,৭৮২.২৭ মিলিয়ন ডলারে। মাঝপথে এপ্রিলে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও মে মাসে আবারো ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখে খাতটি।
ওভেন ও নিটওয়্যারের ভিন্নচিত্র : পোশাক শিল্পের প্রধান দুটি উপ-খাতের মধ্যে ওভেন বা তৈরি পোশাকে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলেও নিটওয়্যারে কিছুটা পতন দেখা গেছে-
ওভেন খাত : ২০২৬ সালের প্রথম অর্ধে ওভেন পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৯,১৯৯.৯৫ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালের প্রথম অর্ধে ছিল ৯,১৩৭.৫৬ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, এই খাতে ০.৬৮% ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বিশেষ করে এপ্রিল (৩২.৬৫%) এবং জুনে (২৪.০২%) ওভেন খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল লক্ষণীয়।
নিটওয়্যার খাত : অন্যদিকে নিটওয়্যার বা গেঞ্জি জাতীয় পোশাকে প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমেছে। এ সময়ে নিট পোশাক থেকে আয় হয়েছে ১০,১৩৫ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের ১০,৩২১ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ডলারের চেয়ে ১ দশমিক ৮০% কম। মার্চ মাসে এই খাতে সর্বোচ্চ ২১ দশমিক ২০% পতন হলেও জুন মাসে ১৯.৪৯% প্রবৃদ্ধি দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা দৃশ্যমান হয়।
ভবিষ্যৎ ভাবনা ও আশার আলো : বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মহিউদ্দিন রুবেল এই বিষয়ে জানান, বৈশ্বিক বাজারের নানা রূপান্তর ও অস্থিরতার মাঝেও সামগ্রিক রপ্তানি প্রায় আগের বছরের কাছাকাছি ধরে রাখা প্রমাণ করে আমাদের পোশাক খাত কতটা অভিযোজনক্ষম।
তিনি বলেন, প্রথম প্রান্তিকের নেতিবাচক ধাক্কা সামলে এপ্রিল ও জুনের মতো মাসে যে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, তা নির্দেশ করে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের চাহিদা ও আস্থা এখনো অটুট রয়েছে। তবে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সামনের দিনগুলোতে সচেতন পদক্ষেপ ও বাজারের বৈচিত্র্যকরণ অব্যাহত রাখতে হবে। বিশ্ববাজারের এই টানা অনিশ্চয়তা ও ওঠানামা কাটিয়ে ওঠা এখন দেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পণ্যের বৈচিত্র্য, নতুন বাজার সম্প্রসারণ এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে বলেও জানান তিনি।
