কাঁচামরিচ তিনশ’ টাকা ছুঁই ছুঁই শতকের কাছাকছি সবজির দাম
সেবিকা দেবনাথ
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
‘বাজারে যে কোনো সবজিতে হাত দিলেই এখন কেজিতে ১০০ টাকা গুনতে হচ্ছে। প্রতি সপ্তাহেই বাজার করতে এসে আগের সপ্তাহের তুলনায় কয়েকশ টাকা কখনো কখনো হাজার টাকার বেশিও গুনতে হচ্ছে। এভাবে সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বিলাসিতা তো দূরের কথা দরকারি অনেক ক্ষেত্রেই এখন কাটছাঁট করতে হচ্ছে। অনেকটা খেয়েপরে বেঁচে থাকা যাকে বলে।’ গোপীবাগ বাজারে বাজার করতে এসে এভাবেই নিজের অসহায়ত্বের কথা জানান দেবব্রত রায়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এই কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে বলেন, সরকার কত রকমের কার্ড দিচ্ছে, দেশের উন্নয়নে উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু সীমিত আয়ের মানুষগুলো খেয়েপরে একটু ভালো থাকার জন্য যে উদ্যোগটা নেয়া দরকার সেটিই নিচ্ছে না। জিনিসপত্রের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ তো আজকের নয়। সব সরকারই দেশের কথা বলে, দেশের জনগণের কথা বলে, কিন্তু সাধারণ মানুষ কিসে ভালো থাকবে সেই জরুরি উদ্যোগটা নিতে দেখা যায় না কোনো সরকারকেই। মাসখানেক আগেও সবজি, মুরগি ও ডিমের দাম কম ছিল। কিন্তু বন্যা ও বৃষ্টির দোহাই দিয়ে যে ইচ্ছামাফিক সব জিনিসের দাম ব্যবসায়ীরা বাড়িয়ে দিয়েছে এই বিষয়টি কি সরকারের পক্ষ থেকে কেউ এসে তদারকি করেছে? এভাবে কতদিন চলবে?
রাজধানীর মানিকনগর, শান্তিনগর, হাতিরপুল কাঁচাবাজারের কয়েকজন ক্রেতার অভিযোগও অনেকটা একই রকম।
শান্তিনগর বাজারে বাজার করতে আসা গৃহিণী মেহের নিগার বলেন, মাছ-মাংসের দাম আগেই বেশি ছিল। এখন সবজির দামও নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও বাজারে এলে পরিবারের জন্য অন্তত কয়েক রকম সবজি কিনেছি। এখন দুই-তিন রকম কিনেই চলে যেতে হচ্ছে। আবার ভালোমানের সবজিও পাওয়া যাচ্ছে না। কাঁচামরিচের কেজি ৩শ ছুঁয়েছে। সামনে নিশ্চই দাম আরো বাড়বে।
হাতিরপুলে বাজারে বাজার করতে আসা জয়নাল আবেদীন পেশায় সরকারি স্কুলের একজন শিক্ষক। তিনি বলেন, আগে টাকার ব্যাগ ছোট আর বাজারের ব্যাগ ছিল বড়। এখন অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, টাকার ব্যাগ ভারি না হলে বাজারে আসা সম্ভব নয়। তিনি নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ করেন।
গতকাল শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, নিত্যপণ্যের বাজারে আবারো অস্বস্তি বাড়ছে। সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে পেঁয়াজ, ডিম, মুরগি, মাছ ও কাঁচামরিচসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির দাম। বিভিন্ন সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অধিকাংশ সবজির দাম ১শ টাকার আশপাশে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রেতারা।
অধিকাংশ সবজির দাম ১০০ টাকার আশপাশে; কাঁচামরিচ ৩শ ছুঁই ছুঁই
সবজির বাজারে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে। প্রতি কেজি পেঁপে ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা পেঁপে ছাড়া আর কোনো সবজিই ৮০ টাকা কেজির নিচে নেই। বেশিরভাগ সবজির দাম ১০০ টাকার আশপাশে। সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কাঁচামরিচ। কাঁচামরিচের দাম বেড়ে কেজিপ্রতি ২৬০ থেকে ৩০০ টাকায় পৌঁছেছে। দুদিন আগে যা ছিল ২০০ টাকা। আর বন্যা-বৃষ্টির আগে ছিল ১০০ থেকে ১২০ টাকা। অর্থাৎ দাম কেজিপ্রতি প্রায় ২০০ টাকা বেড়েছে। লম্বা বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা, গোল বেগুন ১৫০ টাকা, করলা ১০০ থেকে ১২০ টাকা, পটোল ও ঢেঁড়স ৮০ থেকে ৯০ টাকা, ঝিঙা ৯০ থেকে ১২০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং শসা ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি, প্রতি কেজি কচুর লতি বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়, বরবটি প্রতি কেজি ১২০ টাকা। কয়েক দিন আগের তুলনায় এসব সবজির দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। লাউ বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়। গাজরের কেজি ১৬০ টাকা এবং টমেটো ১২০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি। সব ধরনের শাকের দামও বেড়েছে। লাল শাকের আঁটি ২০ থেকে ২৫ টাকা, লাউ শাক ৫০ টাকা, কলমি শাক দুই আঁটি ৪০ টাকা, পুঁই শাক ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজি ব্যবসায়ী ও বিক্রেতারা বলছেন, টানা বৃষ্টি ও বন্যার প্রভাবে চাষিদের সবজি নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকের ক্ষেতে পানি জমে আছে। ফলে সরবরাহ কমে গেছে, তাই দামও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
এদিকে পেঁয়াজের দামও বেড়েছে। কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা দাম বেড়েছে। প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫৫ টাকায়। রাজধানীর কোনো কোনো বাজারে পেঁয়াজের কেজি ৬০ টাকা। সপ্তাহখানেক আগেও খুচরা পর্যায়ে ৩৫ থেকে ৪৫ টাকায় এক কেজি পেঁয়াজ কেনা যেত।
বন্যা-বৃষ্টির দোহাই মাছ, মুরগি-ডিমের বাজারেও
বাজারে মাছের দাম বেশ চড়া দেখা গেছে। মানভেদে চিংড়ির কেজি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০, পাবদা ৩৫০ থেকে ৭০০, বড় আকারের রুই ৪০০ থেকে ৫৫০ ও ট্যাংরা ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ভেটকি ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা, তেলাপিয়া প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা, পাঙ্গাশ ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা, দেশি কৈ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, চাষের কৈ ২৮০ থেকে ৩২০ টাকা, পোয়া ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা এবং শোল ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তবে কিছুটা বেড়েছে চাষের কৈ, তেলাপিয়া, পাঙ্গাশ ও মাঝারি আকারের রুই মাছের দাম। আকারভেদে চাষের শিং মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে। মাঝারি আকারের রুই কেনা যাচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা দরে। এ ছাড়া, রূপচাঁদা, শোল ও নদীর বেলে মাছ কিনতে গেলে হাজারের বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে।
মাছ বিক্রেতারা বলছেন, আড়তে সরবরাহ কম, জলাবদ্ধতার কারণে মাছ ধরা সম্ভব হচ্ছে না। আড়ত থেকে আগের চেয়ে বেশি দামে মাছ কিনতে হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়েই বেশি দামে বিক্রি করছি। সরবরাহ বাড়লে দামও কমবে।
বাজারে ফার্মের মুরগির ডিম ১৪০ টাকা ডজন বিক্রি হচ্ছে, পাড়া-মহল্লার দোকানে আরো বেশি দাম রাখা হচ্ছে। কয়েকদিন আগেও ডিমের ডজন ছিল ১৩০ টাকা। আর দেড় থেকে দুই সপ্তাহ আগে ১২০ টাকাতে পাওয়া যেত। এ ছাড়া ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে ১৯০ থেকে ২২০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। সোনালি মুরগির কেজি ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা। প্রতি কেজি গরুর মাংসের কেজি ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। খাসির মাংস কিনতে গেলে কেজিতে খরচ করতে হবে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা।
মুরগি ও ডিম বিক্রেতার জানান, বন্যায় অনেক মুরগির খামার নষ্ট হয়েছে। এতে করে চাহিদা অনুযায়ী মুরগি ও ডিমের সরবরাহ কম। ফলে দামটাও বেশি। বাজারে মূলত বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মুরগি আসছে, যার দাম তুলনামূলক বেশি।
