অবশেষে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ
হরলাল রায় সাগর
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
একটি ফেসবুক পোস্ট ও ফোনালাপের সংবাদ। অনেক জল্পনা-কল্পনা। আর তা-ই সত্যি হলো মাত্র দুই দিনের মাথায়। বদলে গেল বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দৃশ্যপট। বঙ্গভবনের অধিপতির পালাবদল হলো। মেয়াদ পূর্তির দুই বছর আগেই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন মো. সাহাবুদ্দিন। গতকাল শুক্রবার বিকাল ৪টার দিকে জাতীয় সংসদের স্পিকার পদত্যাগপত্রটি গ্রহণ করেন। পরে বিকাল ৫টায় জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র আমি গ্রহণ করেছি। পদত্যাগের পেছনে অসুস্থতাকে কারণ দেখানো হয়েছে। তিনি এখন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন।
দেশের ২২তম রাষ্ট্রপ্রধান মো. সাহাবুদ্দিন মেয়াদের পৌনে দুই বছর বাকি থাকতেই দায়িত্ব থেকে ইস্তফা নিলেন। চব্বিশের অস্বাভাবিক পটপরিবর্তনের পর নানা আলোচনায় ছিল রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়টি। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করায় সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি এখন রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের অধিপতি। সংবিধান অনুযায়ী, ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।
মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
বঙ্গভবনে ৩৯ মাসের দায়িত্বে মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৪ এর জানুয়ারি এবং ২০২৬ এর ফেব্রুয়ারি-দুটি জাতীয় নির্বাচন দেখেছেন। রুদ্ধশ্বাসের অন্তর্বর্তী সরকারসহ তিন আমলে তিনজন সরকারপ্রধানকে শপথ পড়িয়েছেন। নজিরবিহীন এক আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে একজন সরকারপ্রধানের দেশান্তরী হওয়ার সাক্ষী হয়েছেন। গত সাড়ে তিন দশকে আর কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে এতটা ঘটনাবহুল আর বন্ধুর পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করতে হয়নি।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ : সংসদ সচিবালয় জানায়, রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এএসএম বাহাউদ্দিন রাষ্ট্রপতির সই করা পদত্যাগপত্রটি গতকাল শুক্রবার বিকাল ৪টার দিকে জাতীয় সংসদে স্পিকারের দপ্তরে পৌঁছে দেন। এই পদত্যাগপত্রের একটি অনুলিপি সংবাদমাধ্যমে সরবরাহ করেছে বঙ্গভবন। সেখানে তিনি অসুস্থতাকেই ইস্তফা দেয়ার কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন।
সাহাবুদ্দিন দাবি করেছেন, চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর তার সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণেই সাংবিধানিক বিপর্যয় এড়াতে পেরেছিল বাংলাদেশ। তার পদত্যাগপত্রটি হুবহু তুলে ধরা হলো-
‘আমি মো. সাহাবুদ্দিন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ২০২৩ খ্রি. সনের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করি এবং অদ্যাবধি নিষ্ঠা, সততা ও সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ৫ই আগস্ট ২০২৪ সনে ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকারের পতনের পর দেশে শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংকটের সৃষ্টি হয়। সাংবিধানিক সংকট থেকে উত্তরণের অভিপ্রায়ে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে আমি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত কামনা করি। অতঃপর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পরামর্শক্রমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে পরামর্শক্রমে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে।
নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে বর্তমান সরকার গঠিত হয়ে সরকার পরিচালনা করছে। বর্তমানে সরকারি দল ও বিরোধী দল গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্যে দিয়ে জাতীয় সংসদে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে। আমার সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোন সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।
আমি গুরুতর অসুস্থ। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছি। আমার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানীং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটোনমিক নিউরোপ্যাথি নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে আমি মাঝে মাঝে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই। রোগ সমূহের প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন।
এমতাবস্থায়, সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির পদ হতে পদত্যাগ করছি।’
এর আগে গতকাল বিকাল ৪টার পর হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপতি বলেন, এটা তো সর্বজনবিদিত, আমার মুখ থেকে শুনে কী লাভ? আই অ্যাম সিক, সো ইট ইজ ডান। পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করা হয়ে গেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বলে দিছি, বুঝে নেন।
পরে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব সরওয়ার আলম জানান, গুরুতর অসুস্থতার কারণে রাষ্ট্রপ্রধান মো. সাহাবুদ্দিন স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দাখিল করেছেন।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হলেন স্পিকার : রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণ করার পর গতকাল বিকাল ৫টায় জাতীয় সংসদে সংবাদ সম্মেলনে করে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের কথা জানান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। স্পিকার বলেন, রাষ্ট্রপতি গুরুতর অসুস্থ। বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালনে অসমর্থ্য। তাঁর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন। এ কারণে তিনি পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগপত্রটি আমি গ্রহণ করেছি। ফলশ্রæতিতে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছি; এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের রেকর্ডের সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম গ্রহণের জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।
সাহাবুদ্দিন কেন পদত্যাগ করেছেন তার কারণ তুলে ধরতে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি লিখিতভাবে জানিয়েছেন যে, তিনি গুরুতর অসুস্থ; হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় তিনি ভুগছেন। তার হৃদযন্ত্রের বাইপাস সার্জারি হয়েছে, ইদানীং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে তিনি মাঝে মাঝে অচেতন হয়ে পড়েন। এসব রোগের প্রাদুর্ভাবে এবং শারীরিক ও মানসিক অসমর্থতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করেছেন এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে এই পদত্যাগপত্র আমি গ্রহণ করেছি। সংবিধানে ইতোমধ্যেই আপনারা জানেন, যেদিন আমি স্পিকার হিসেবে শপথ নিয়েছি, সেদিনই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবেও শপথ নিয়েছি যদি প্রয়োজন হয়। একইভাবে আমাদের ডেপুটি স্পিকার সাহেব, তিনিও যখন ডেপুটি স্পিকার হিসেবে শপথ নেন, শপথেরই অংশে বর্ণিত থাকে, যখন বলা হবে- কোনো কারণে যখন স্পিকারের চেয়ার শূন্য থাকবে, তখন ডেপুটি স্পিকার- স্পিকারের পদ পদের দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি বলেন, সুতরাং আজকে বাংলাদেশের নানা ধরনের কথাবার্তা আমি দুপুরে এসেই শুনছি। দেখা গেল যে এটি প্রকৃত-তিনি শারীরিক অসমর্থতার কারণে পদত্যাগ করেছেন। আমি তার মঙ্গল এবং সুস্বাস্থ্য কামনা করি। এবং আমার মনে হয়, তিনি মাফিয়া সরকারের আমলে নির্বাচিত হলেও বর্তমানে জনগণের ভোটে যে নতুন সরকার নির্বাচিত হয়েছে, তার প্রতি তিনি সমর্থন এবং শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন সব সময়ই। আমি তার মঙ্গল কামনা করি।
এক সাংবাদিক বলেন, রাষ্ট্রপতি যে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন, তার সাথে কি কোনো মেডিক্যালের সার্টিফিকেট বা কোনো কিছু সংযুক্ত রয়েছে? কারণ সাধারণ জনমনে একটা প্রশ্ন আছে যে এটি কি আসলে কাগজ-কলমে অসুস্থতা নাকি জেনুইন অসুস্থতা? তার অসুস্থতা আসলে কাগজ-কলমে নাকি জেনুইন?
জবাবে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ একটি গুরুতর ঘটনা। এর সঙ্গে দেশের ভালো-মন্দও জড়িত। রাষ্ট্রপতি একজন মানুষ, তিনি অসুস্থ হতেই পারেন এবং তিনি রোগেরও নাম প্রকাশ করেছেন। লিখিতভাবে জানিয়েছেন তিনি কী কী রোগে ভুগছেন এবং মাঝে মাঝে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। এর জন্য ডাক্তারের সার্টিফিকেটের কোনো প্রয়োজন নাই, যিনি যেখানে নিজেই এটি দাবি করেছেন। সুতরাং আমরা আশা করি এই পদত্যাগের ফলে সকল ধোঁয়াশা পরিষ্কার হলো। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা কোনো ধরনের বিরূপ মনোভাব কিংবা কনফিউশন যাতে এসব ব্যাপারে না ঘটে।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, এর আগেও রাষ্ট্রপতিরা পদত্যাগ করেছেন বিভিন্ন কারণে। রাষ্ট্রপতি দেশের একজন সম্মানিত মাননীয় রাষ্ট্রপতি। তিনি পদত্যাগ করতেই পারেন এবং এই চেয়ারটা কখনো শূন্য থাকে না। এবং আমি জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে এই পদ পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছি, এটিই হলো বাস্তবতা। আশা করি সকল ধরনের কনফিউশন এখন থেকে দূর হয়ে যাবে।
চিকিৎসার জন্য গত ১৯ জুলাই ব্যাংককে যান হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সফরসূচি অনুযায়ী আগামী ২৬ জুলাই তার ফেরার কথা ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যেই থাইল্যান্ডে সফর সংক্ষিপ্ত করে গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে দেশে ফেরেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
তিনি তার ব্যক্তিগত সফর সংক্ষিপ্ত করে শুক্রবার দুপুরে দেশে ফিরলেও দাবি করেন, গত এক সপ্তাহ বিদেশে থাকায় রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। সাংবাদিকরা যেমন শুনেছেন, তিনিও তেমনই শুনেছেন।
তার কয়েক ঘণ্টা পর মো. সাহাবুদ্দিন ইস্তফা দেয়াই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব এখন হাফিজ উদ্দিন আহমেদেরই কাঁধে পড়েছে।
সংবিধানে যা আছে : সংবিধানের ৫০ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন। আর ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধানের ১২৩ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সংবিধানের ৪৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে দলটির মনোনীত ব্যক্তিরই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মো. সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে কাকে মনোনয়ন দেয়া হবে, তা নিয়ে বিএনপির শীর্ষপর্যায়ে কয়েক দিন ধরে আলোচনা চলছে। এই তালিকায় আছেন- বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লিউন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ড. আব্দুল মঈন খান। তবে প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের আলোচিত ফেসবুক পোস্টে দাবি করা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির কোনো শীর্ষ নেতার পরিবর্তে পছন্দের তালিকায় রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
ঘটনাক্রম : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কোটাবিরোধী আন্দোলন থেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও পরে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এতে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর সংসদ ভেঙে দেয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ রাজনৈতিক পালাবদলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপতির অপসারণ চেয়েছিলেন ছাত্রনেতারা। তার পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছিল জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক বিভিন্ন সংগঠন। তবে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাকে সরানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। এর ফলে রাষ্ট্রপতি ও সরকারের রাজনৈতিক পটভূমিতে ভিন্নতা তৈরি হয়। মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলটির মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও সরকার গঠনের পর বিএনপি তাকে সঙ্গে সঙ্গে সরানোর পথে যায়নি। সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ছিল। তবে সরকার বা বিএনপি প্রকাশ্যে কখনো তার পদত্যাগ দাবি করেনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। দায়িত্ব নেয়ার পর এটাই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। দেশে ফিরে ২৭ জুন তিনি জাতীয় সংসদে সফরের অর্জন নিয়ে কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর থেকে ফেরার পর রাষ্ট্রপতিকে তার সফরের বিষয়ে অবহিত করার রেওয়াজ রয়েছে। তবে তারেক রহমান রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বা অন্য কোনোভাবে সফরের ফল তাকে অবহিত করেছেন, এমন কোনো তথ্য বঙ্গভবন কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রকাশ করেনি।
এ কারণে অনেকেই ধারণা করেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের নেপথ্যে স্বাস্থ্যগত কারণের পাশাপাশি তার সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের দূরত্বও কাজ করেছে। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, লন্ডনে চিকিৎসা নেয়ার সময় রাষ্ট্রপতি ফোনে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সেই ঘটনায় তার সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের দূরত্ব তৈরি হয়।
পদত্যাগের গুঞ্জন ও ফেসবুক পোস্ট : স¤প্রতি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত মে মাসে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। এরপর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আলোচনা শুরু হয়।
প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের গত বুধবার রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে একটি পোস্ট দেন। এতে তিনি লেখেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন। শারীরিক অসুস্থতাকে পদত্যাগের কারণ হিসাবে উল্লেখ করার সম্ভাবনা আছে। এই পোস্ট রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জন যেন ঘি ঢালে। দুই দিন ধরে টক অব দ্য কান্ট্রেিত পরিণত হয়-পদত্যাগের বিষয়টি।
আলোচনার মধ্যে গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এক বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। শারীরিক অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি চাইলে পদত্যাগ করতে পারবেন। সংবিধানে সেই সুযোগ রয়েছে। তিনি চাইলে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দিতে পারবেন। এর বেশি কিছু জানা নেই। কথিত ফোনালাপের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, এ বিষয়ে তাদের কিছু জানা নেই। এ ছাড়া পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও রাষ্ট্রপতির কথিত ফোনালাপের প্রসঙ্গে বলেছিলেন, এরকম ফোনালাপের তথ্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতিও ফোনালাপের প্রসঙ্গটি প্রত্যাখ্যান করে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, এটি কল্পনারও বাইরে।
গুলশানের বাসায় উঠতে পারেন সাহাবুদ্দিন : বঙ্গভবন ছাড়ার পর মো. সাহাবুদ্দিন গুলশানের বাসায় উঠতে পারেন। বাসাটি এখনো সুনসান। তবে, গতকাল বিকালে সেখানে টেলিফোনের সংযোগ দিয়েছেন বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্সের কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) দুই জন কর্মচারী।
শুক্রবার বিকালে গুলশানের ১২৩ নম্বর রোডের ‘গ্রিন ভিলা’ নামে ওই বাসার সামনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একদমই ফাঁকা। ভেতরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন সদস্য থাকলেও, বাইরে তেমন কোনো ব্যস্ততা চোখে পড়েনি।
পদত্যাগ করার পর এই বাসার পঞ্চম তলায় রাষ্ট্রপতির ওঠার কথা হয়েছে বলে তথ্য দিয়েছেন বাসার নিরাপত্তা প্রহরী মো. মাছুম। তিনি বলেন, তিন-চারদিন আগে স্যার এসেছিলেন এই বাসায়। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ প্রায় শতাধিক লোকজন এসেছিল। বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে উনি এসেছিলেন, এরপর রাত পৌনে ৯টা নাগাদ উনি এখান থেকে চলে গেছেন। ইতোমধ্যে তার বাসায় টুকিটাকি বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। এখানে এসবির (স্পেশাল ব্রাঞ্চ) কয়েকজন লোক রয়েছেন।
বাসায় টেলিফোন সংযোগ দিতে আসা বিটিসিএলের টিসিএম (টেলিকমিউনিকেশন্স মেকানিক) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মূলত সরকারিভাবে আমরা এখানে নতুন টেলিফোন লাইন লাগাতে এসেছি, আমাদের অফিসের বসের নির্দেশে। আজকে যদিও বন্ধ, তবু বলা হয়েছে, উনি পদত্যাগ করলে এ বাসাতেই উঠবেন। এর আগের যে লাইন ছিল, সেটি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বাদ দেয়া হয়েছে। তাই এখন নতুন লাইন লাগাতে এসেছি।
সাহাবুদ্দিনের দিনগুলো : এক সময় তিনি ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার, তখন দেশের মানুষ তাকে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু নামে চিনত।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এর বাইরে পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক। দেশের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে। দায়িত্ব নেয়ার ১৬ মাসের মাথায় অভাবনীয় এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন তিনি। ছাত্র আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, দেশ ত্যাগ করে শেখ হাসিনা ভারতের দিল্লিতে আশ্রয় নেন।
আওয়ামী লীগ আমলের কোনো কিছু অবশিষ্ট না থাকলেও অনিবার্য পরিণতির মতো বঙ্গভবনে থেকে যান মো. সাহাবুদ্দিন। তাকেই সংসদ বিলুপ্ত করার আদেশ দিতে হয়েছে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়াতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নেয়া সিদ্ধান্তগুলোকে অধ্যাদেশে পরিণত করতে তাকেই সই দেয়ার আনুষ্ঠানিকতা সারতে হয়েছে।
সব মিলিয়ে দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটছিল রাষ্ট্রপ্রধানের চেয়ারে থাকা সাহাবুদ্দিনের। নির্বাচনের আগে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর সরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, আমি বিদায় নিতে আগ্রহী। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাকে কোণঠাসা করে রাখা, বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলো থেকে তার ছবি সরিয়ে ফেলা এবং বঙ্গভবনের প্রেস উইং সংকুচিত করায় অপমানবোধ’ করার কথাও পরে বলেছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন।
নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নতুন সরকার রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছ থেকে শপথ নেয়। গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে একটি দৈনিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপ্রধান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কঠিন সময় পার করার কথা জানিয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ওই কঠিন সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন। তারা তখনো সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতূহল জমা ছিল। কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।
