চাপের মুখে পদত্যাগ করলেন ধর্মেন্দ্র, ঘরে ফিরল ‘ককরোচ’
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ভারত সরকার সব দাবি মেনে নেয়ায় আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের অবিলম্বে আন্দোলনস্থল দিল্লির যন্তর মন্তর খালি করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল শনিবার কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেন সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাশ। দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
এর আগে সিজেপি ও বিরোধী দলগুলোর তীব্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। গতকাল দুপুরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান তিনি। এরপরও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। তখন তিনি বলেছিলেন, বাকি দুই দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত দিল্লির যন্তর মন্তরে চলমান অবস্থান কর্মসূচি থেকে সরে যাবেন না তারা। আন্দোলন চলবে।
এরপর তীব্র চাপের মুখে সিজেপির সঙ্গে ফের বৈঠক করে কেন্দ্রীয় সরকার। আলোচনায় সরকারের পক্ষে ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে. পি. নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিং। অন্যদিকে সিজেপির প্রতিনিধিদলে ছিলেন প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস, অশুতোষ রাঙ্কাসহ অন্য নেতারা।
বৈঠকে শেষ পর্যন্ত সিজেপির সব দাবি মেনে নেয় মোদি সরকার। যার মধ্যে ছিল- প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকের পরিবারকে ১ কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সব মামলা প্রত্যাহার, আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতনের জন্য দিল্লি পুলিশের প্রকাশ্যে ক্ষমাপ্রার্থনা এবং ৫ দফা সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়ন।
এ বিষয়ে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সৌরভ দাস বলেন, ‘সারাদেশে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব এফআইআর প্রত্যাহার করা হবে। সরকারের কাছে এই আশ্বাস চাওয়া হয়েছে- ভবিষ্যতেও বিক্ষোভকারীদের বা আয়োজকদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়ের করা হবে না। সরকার জানিয়েছে, তারা মঙ্গলবার এ বিষয়ে লিখিতভাবে জানাবে। যেসব শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, তাদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতেও সম্মত হয়েছে সরকার।’
অশুতোষ রাঙ্কা বলেন, ‘সরকার আমাদের সব দাবি মেনে নিয়েছে। আমরা সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনের কর্মসূচি প্রত্যাহারের আহ্বান জানাচ্ছি।’
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা বলেন, ‘সিজেপির দেয়া সংস্কার প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করবে সরকার।’ সিজেপির উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘শিক্ষা সংস্কার নিয়ে আপনারা যে দাবিগুলো তুলেছেন, সেটি আমরা পর্যালোচনা করব। এ বিষয়ে আপনাদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আরো আলোচনা হবে।’
এদিকে পদত্যাগপত্রে দেশের তরুণ ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কিছু বার্তা দিয়ে গেছেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) হিন্দিতে লেখা এ চিঠি (পদত্যাগপত্র) পোস্ট করেছেন তিনি। যেখানে ধর্মেন্দ্র প্রধান লেখেন, ‘নিট-ইউজি মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা নিয়ে চলমান বিতর্কে দিল্লির যন্তর মন্তরসহ সারাদেশে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে এবং দেশবিরোধী কোনো শক্তি যেন এর সুবিধা নিতে না পারে, দেশের ঐক্য যেন অক্ষুণ্ন থাকে, একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎও যাতে আইনি জটিলতায় আটকে না যায় এবং আমাদের সন্তানেরা যেন পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার গড়ায় মনোযোগ দিতে পারে, সেসব নিশ্চিত করতেই আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।’
ধর্মেন্দ্র প্রধান লেখেন, ‘প্রথম দিন থেকেই আমি এর দায়ভার গ্রহণ করেছিলাম। পরিস্থিতি থেকে আমি কখনোই মুখ ফিরিয়ে নেইনি। আমার সংকল্প ছিল, পরীক্ষা মাফিয়াদের কারণে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে দেব না, কিংবা কোনো শিক্ষার্থীর ওপর অন্যায় হতে দেব না।’
চিঠিতে ধর্মেন্দ্র প্রধান জানান, গত ১০ দিনের ঘটনাপ্রবাহ তাকে ভীষণভাবে মর্মাহত করেছে। তবে তিনি জোর দিয়ে দাবি করেন- পুরো বিষয়টি তার ‘ব্যক্তিগত মর্যাদার লড়াই’ নয়; বরং শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা এবং দেশের ঐক্য বজায় রাখার তাগিদ থেকেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তরুণসমাজ যেন কোনোভাবেই ‘ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তির ফাঁদে’ পা না দেয়, সে আহ্বানও জানান সদ্য পদত্যাগ করা এই মন্ত্রী।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে এর একদিন আগে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ভারতের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বড় ধরনের প্রশাসনিক রদবদল করে মোদি সরকার। শিক্ষা সচিব বিনীত যোশিকে সরিয়ে তার স্থলে নরেশ গাঙ্গওয়ারকে নিয়োগ দেয়া হয়। সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করে এ তথ্য জানানো হয়।
এমন অবস্থায় আন্দোলন দমে যাওয়ার পরিবর্তে আরো তীব্র হয়। ককরোচদের মূল দাবি ছিল ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। এমন আবহে বিশেষ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক পোস্ট করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গত শুক্রবার মধ্যরাতে একটি ভিডিওবার্তা পোস্ট করে তরুণদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত ওই ভিডিওটির ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘গতকালের ভিডিওটি দেখে মূল্যবান পরামর্শ পাঠানো সব তরুণকে ধন্যবাদ।’ এতে তিনি বলেন, ‘বন্ধুরা, ধন্যবাদ। গত রাতে আপনাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। আপনারা আমার ভিডিওটি দেখে যেভাবে ইতিবাচক মতামত ও পরামর্শ দিয়েছেন, তার জন্য সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আপনাদের ভালোবাসা ও সমর্থন যেন এভাবেই থাকে, আর আমাদের এই সম্পর্ক আরো দৃঢ় ও সক্রিয় হয়ে উঠুক।’
এর একদিন আগে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে আরো কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। তখন মোদি বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অপরাধে জড়িতদের দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ আদালত গঠন এবং কঠোর শাস্তির বিধান রেখে একটি খসড়া বিল মন্ত্রিসভায় তোলা হবে। এরপর আগামী সপ্তাহেই বিলটি সংসদে পাসের চেষ্টা করা হবে।’ এর মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে অভিযুক্তদের ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে! সেই সঙ্গে হতে পারে ১০ কোটি টাকা জরিমানা! বিলটি পাস হলে ফাস্ট ট্র্যাক আদালতে এই সংক্রান্ত ঘটনার দ্রুত বিচার ও আরো কড়া শাস্তি দেয়া যাবে।
ওই একই দিন প্রকাশিত আরেক ভিডিও বার্তায় মোদি বলেন, ‘বন্ধুরা, আমি জানি প্রশ্নপত্র ফাঁস কোনো সাধারণ বিষয় নয়। লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের জন্য এটি অত্যন্ত কষ্টের।’
মোদি জানান, গত আড়াই মাসে এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ২২ লাখ শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে এবং ১৯ জুলাই তাদের ফল প্রকাশ করা হয়েছে।
মূলত ককরোচদের এই আন্দোলন এতটা তীব্র হওয়ার পেছনে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জোড়ালো সমর্থন ছিল। বিশেষ করে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর ভূমিকা। ককরোচদের এই আন্দোলনের সূত্রপাত গত মে মাসে। ওই সময় এক শুনানিতে ভারতীয় বেকার তরুণদের ‘ককরোচ (তেলাপোকা)’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেন দেশটির প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত। তিনি বলেছিলেন, ‘কিছু তরুণ তেলাপোকার মতো, যারা কোনো চাকরি পান না কিংবা পেশাগতভাবে কোথাও দাঁড়াতে পারেন না। তাদের কেউ কেউ গণমাধ্যমকর্মী বনে যান, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী হন, আবার কেউ তথ্য অধিকারকর্মী বা অন্য কোনো ধরনের অ্যাকটিভিস্ট হয়ে সবাইকে আক্রমণ করা শুরু করেন।’ যদিও পরে প্রধান বিচারপতি দাবি করেন, তিনি ভুয়া ডিগ্রিধারীদের উদ্দেশে এমন মন্তব্য দিয়েছিলেন। তবে ততক্ষণে জল গড়িয়েছে বহুদূর।
প্রধান বিচারপতির এমন বক্তব্যে বেশ অপমান বোধসহ আঘাত পান তরুণরা। তারা ক্ষোভ উগড়ে দেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের ডাক দেয় সিজেপি। তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চান। ওই সময় আন্দোলন কিছুদিন চলমান ছিল। এরপরই নতুন করে গত সোমবার থেকে শুরু হয়ে গতকাল পর্যন্ত যন্তর মন্তরে আন্দোলন চলে।
উল্লেখ্য, নিট (এনইইটি), সিবিএসই, সিইউইটি ও এসএসসিসহ বিভিন্ন প্রবেশিকা ও নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ আর ব্যঙ্গের মধ্য দিয়ে জন্ম হয় অপ্রথাগত রাজনৈতিক দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামকে ব্যঙ্গ করে এই নামকরণ করা হয়।
