ভারতে টিকার অনুমোদন, শ্রীলঙ্কায় ড্রোনের ব্যবহার
সেবিকা দেবনাথ
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ানো ডেঙ্গু জ্বর মূলত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ু অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। তবে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ার কারণে রোগবাহী এসব মশা এখন এশিয়া, ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলসহ নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে বিশ্বে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৪৪ লাখে। সংস্থাটির তথ্য মতে, গত ৫০ বছরে ডেঙ্গুর প্রকোপ ৩০ গুণ বেড়েছে। বৈশ্বিক স্বাস্থ্যের শীর্ষ ১০টি হুমকির তালিকায় রয়েছে ডেঙ্গু। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ এখন ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতি বছর আনুমানিক ১০ থেকে ৪০ কোটি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন।
এদিকে প্রায় ৩ দশক ধরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বর। চলতি বছরও দৈনিক ওঠা-নামার মধ্য দিয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে।
দেশে মশা নিয়ন্ত্রণে তেমন সফলতা না থাকায় টিকা হতে পারে সমাধান। কিন্তু এ বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। ডেঙ্গুর কোনো সার্বজনীন টিকা না থাকলেও আশা জাগিয়েছে জাপানের টাকেদার ‘কিউডেঙ্গা’। সম্প্রতি ভারতের স্বাস্থ্য বিভাগও এই টিকা ব্যবহারে অনুমোদন দিয়েছে। ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সী মানুষের এই টিকা পাবেন। ভারতের সেন্ট্রাল ড্রাগস স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন (সিডিএসসিও) টিকাটির গুণগত মান, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা পর্যালোচনার পর অনুমোদন দেয়। টিকাটি ৩ মাসের ব্যবধানে ২ ডোজে দেয়া হবে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, কিউডেঙ্গা ডেঙ্গু ভাইরাসের ৪টি সেরোটাইপের (ধরন) বিরুদ্ধেই সুরক্ষা দিতে সক্ষম। টিকাটি ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়াসহ ৪২টি দেশে অনুমোদন পেয়েছে। এছাড়া এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রি-কোয়ালিফিকেশনও অর্জন করেছে।
জানা যায়, ২০২২ সালে জাপানের টাকেদা ফার্মাসিউটিক্যাল ডেঙ্গুর টিকা ‘কিউডেঙ্গা’ আবিষ্কারের ঘোষণা দেয়। এটি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। কিউডেঙ্গা ডেঙ্গুর লক্ষণ প্রতিরোধ করে ৮০ দশমিক ২০ শতাংশ। এবং হাসপাতালে ভর্তি প্রতিরোধ করে ৯০ দশমিক ৪ শতাংশ। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউকে, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, আইসল্যান্ড, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়াসহ আরো কিছু দেশ কিউডেঙ্গা ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। ৪ বছর বয়স থেকে এই টিকা দেয়া যায়। ৩ মাসের ব্যবধানে ২টি ডোজ শরীরের ত্বকের নিচে দিতে হয়। ইন্দোনেশিয়ায় ২ ডোজ টিকার দাম ৮০ ইউএস ডলার। কিউডেঙ্গা জীবনব্যাপি প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। এছাড়া ইউএসএ-র সানোফি-পাস্তুর ইনকর্পোরেশন ‘ডেঙ্গভ্যাক্সিয়া’ নামের একটি টিকা এনেছে। একবার ডেঙ্গু হওয়ার পরই কেবল এই টিকা নেয়া যায়। প্রতিডোজের দাম ১১৩ দশমিক ৭৫ ডলার। সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশে এই টিকা অনুমোদিত।
২০২৩ সালেই ডেঙ্গুর টিকার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করে দেশের টিকাবিষয়ক জাতীয় কমিটি (ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি গ্রুপ/নাইট্যাগ)। কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ ভোরের কাগজকে জানান, ওই সময় নাইট্যাগের কয়েকটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। কমিটি টিকার বিষয়ে ইতিবাচক থাকলেও ওই সময় বিশ্বের কয়েকটি দেশে ডেঙ্গু টিকা প্রয়োগ শুরু হলেও এর কার্যকর ফলাফল এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) সুপারিশের অপেক্ষায় ছিল বাংলাদেশ। এশিয়ার ডেঙ্গু প্রবণ দেশ ইন্দোনেশিয়ায় কিউডেঙ্গার ব্যবহার শুরু হয়ে ২০২৩ সাল থেকেই। ভারতেও নিজস্ব ডেঙ্গু টিকা তৈরির পথে রয়েছে। দেশটির প্রতিষ্ঠান প্যানাসিয়া বায়োটেকের উদ্ভাবিত ডেঙ্গিঅল বর্তমানে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার শেষ ধাপে রয়েছে। অনুমোদন পেলে এটি বিশ্বের প্রথম এক ডোজের ডেঙ্গু টিকাগুলোর একটি হবে।
তবে বাংলাদেশে এখনই টিকা প্রয়োগে রাজি নয় সরকার। সরকার তাকিয়ে আছে দেশে চলমান টিকার ট্রায়ালের দিকে। গত ২ জুন সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানান, এখনই ডেঙ্গুর টিকা দেয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, আমরা টিকা দিচ্ছি না। এই টিকা বিশ্বের কিছু কিছু দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ডসহ অল্প কয়েকটি দেশে দিচ্ছে। কিন্তু অল-ওভার দ্য ওয়ার্ল্ড, এটা এখনো সর্বজনীন টিকা হয়নি। কাজে আমরা একটা এলডিসি কান্ট্রি হিসেবে হঠাৎ করে টিকাটা দেয়া শুরু করতে পারি না। আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করব। ইউনিসেফের সঙ্গেও কথা বলব। আমরা আন্তর্জাতিক মহলে কথা বলে যদি তাদের অনুমতি পাই এবং তারা যদি এটাকে ভায়াবল মনে করেন, হেলদি মনে করেন, হার্মফুল মনে না করেন, ইন দ্যাট কেস আমরা এটাকে কালেক্ট করার চেষ্টা করব। কিন্তু এট দিজ মোমেন্ট উই আর নট গোইং টু ডু ভ্যাক্সিনেশন। কারণ এটা সর্বজনীন টিকা না, এটা আমরা পরিষ্কার ভাষায় বলে দিলাম।
এরপর আরেক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচির বিষয়টি বিবেচনায় থাকলেও এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং বাস্তবায়নও কঠিন। যদি ব্যাপক টিকাদান কার্যক্রমে যেতে হয়, তাহলে বিপুল বাজেটের প্রয়োজন হবে। চার মাস পরপর টিকা দেয়ার প্রয়োজন হলে দেশের স্বাস্থ্য বাজেটের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী চিকিৎসার চেয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। তিনি বলেন, ডেঙ্গু এখন আর সাধারণ কোনো রোগ নয়, এটি পুরো জাতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এ সংকট মোকাবিলা কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা হাসপাতালের দায়িত্ব নয়; বরং দেশের প্রত্যেক নাগরিককে এতে সম্পৃক্ত হতে হবে। সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসকদের ওপর চাপ দিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালালেও শতভাগ মশা বা লার্ভা ধ্বংস করা সম্ভব কিনা, তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। মশা ২০০ মিটার পর্যন্ত উড়তে পারে, যেকোনো ফাঁকফোকর দিয়ে ঘরে ঢুকে যেতে পারে। তাই এটি অত্যন্ত কঠিন একটি লড়াই।
এদিকে প্রায় এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে লড়তে সামরিক ড্রোন ব্যবহার করছে শ্রীলঙ্কা। এসব ড্রোন ভবনের ছাদের ওপর জমে থাকা পানি ও মশা প্রজননের অন্যান্য স্থান খুঁজছে। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতে চলতি বছর ডেঙ্গুতে ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছেন ৭৭ হাজারের বেশি মানুষ। এর মধ্যে কেবল জুলাই মাসেই এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন।
আগামী ২ মাস ডেঙ্গুর জন্য বিপদজনক হবার আশঙ্কার কথা বারবারই বলছেন কীটতত্ত্ব ও রোগতত্ত্ববিদরা। অথচ মশা নিয়ন্ত্রণে তোড়জোড় খুব একটা একটা দেখা যায় না। বাংলাদেশ এখনো মূলত ফগার মেশিননির্ভর পদ্ধতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
সম্প্রতি মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে ‘মস্কিউটো লার্ভা কন্ট্রোল টেকনোলজি’র উদ্ভাবন করেছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বাংলাদেশি উদ্ভাবক এম এ হামিদ খান। ২০ জুলাই এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লিউন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মশা নিয়ন্ত্রণে বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উদ্ভাবনকে অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে মশা নিধনে ব্যবহৃত বিভিন্ন পদ্ধতিতে কাঙ্ক্ষতি ফল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই দেশীয় উদ্ভাবনের মাধ্যমে মশা নিধক প্রযুক্তি ও উপকরণ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। মশা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো লার্ভা ধ্বংস করা। মশার লার্ভা ধ্বংসে দেশীয়ভাবে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কার্যকর প্রমাণিত হলে তা সিটি করপোরেশনগুলোর কাজে লাগানো উচিত।
