ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
গত এক সপ্তাহ ধরে চলা গ্যাস সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে। সিলিন্ডার গ্যাস ও ইনডাকশন কিনে বাসাবাড়ির রান্না সামাল দেয়া সম্ভব হলেও যানবাহনের গ্যাস সরবরাহ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সিএনজি স্টেশনগুলোর সামনে দীর্ঘ লাইন পড়েছে। গ্যাসের চাপ না থাকায় গত কয়েকদিনে অনেক সিএনজি স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। চালকদের দিনের ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ফিলিং স্টেশনের সামনেই লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এদিকে যে কারণে দেশে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে, সেই মহেশখালির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটি গতকাল শনিবার পর্যন্ত মেরামত করা সম্ভব হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে চলতি সপ্তাহ জুড়েই গ্যাস সংকট থাকবে।
গ্যাস না পেয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সিএনজি অটোরিকশার চালকরা। গত কয়েকদিনে তাদের আয় ব্যাপকহারে হ্রাস পেয়েছে। আয় বন্ধ থাকলেও ব্যয় থামছে না। গ্যাস না পেয়ে সারাদিন গাড়ি বন্ধ রেখে পাম্পে বসে থাকছেন তারা। গাড়ি চালাতে না পেরে দিনশেষে মালিকের জমার টাকা দেয়াই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ কারণে তারা যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া আদায় করছে। রাজধানীর মেরুল বাড্ডার জামান সিএনজি স্টেশনটি গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ। পাম্প বন্ধ থাকলেও পাম্পের উভয় পাশে চালকরা সিএনজি, অটোরিকশা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। তাদের ভিড়ের কারণে পাশের রাস্তায় যানজট তৈরি হয়েছে।
বিক্রয়কর্মী আবু সাঈদ বলেন, গ্যাস কখন আসবে বা চাপ স্বাভাবিক হবে, তা আমরা বলতে পারব না। যখন আসবে, তখন থেকেই পুনরায় গ্যাস বিতরণ শুরু করা হবে।
রাজধানীর অন্য ফিলিং স্টেশনগুলোতেও একই অবস্থা। আবার কোথাও কোথাও গ্যাস দেয়া হচ্ছে। তবে গ্যাসের চাপ কম থাকায় তা ব্যাহত হচ্ছে। প্রাইভেট কারে ৬০ লিটারের সিলিন্ডারে ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকার গ্যাস ঢোকার কথা, প্রেশার না থাকায় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকার বেশি ঢুকছে না। ফলে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহন মারাত্মক সংকটে পড়েছে। নিকুঞ্জ এলাকার সিটি ওভারসিজ স্টেশনে দুই-তিন লাইনে সিএনজি ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ লাইন। এই লাইন কুর্মিটোলা হাসপাতাল ছাড়িয়ে গেছে। ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে চালকদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ চরমে পৌঁছেছে।
চালকদের অভিযোগ, একটি কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর একটি অপচেষ্টা। প্রাইভেট কার চালক শরিফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা ৭-৮ ঘণ্টা ধরে প্রেশারের আশায় বসে আছি। যেখানে এই গ্যাস আমদানি করতে হয় না, সেখানে দেশীয় গ্যাসের জন্য কেন আমাদের এই হাহাকার দেখতে হবে?
অটোরিকশা চালক আতাউর, শামীম ও রনিসহ অন্যরা দুঃখের কথা জানিয়ে বলেন, প্রতিদিন গাড়ি গ্যারেজ থেকে বের করলেই ১২০০ টাকা মহাজনকে জমা দিতে হয়। পাম্পে বসে সারাদিন পার হয়ে গেলে কীভাবে জমা দেব। গ্যাসের দাম বাড়ানো যদি সরকারের লক্ষ্য হয়, তবে বাড়াইয়া দিলেও ভালো। কিন্তু গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখে কষ্ট দেয়ার দরকার কী?
এছাড়া ঢাকার বিভিন্ন এলাকার গৃহিণীরা জানান, সারাদিনেও চুলায় গ্যাস আসছে না। রান্না করতে না পারায় জীবনযাপন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
মিরপুরের গৃহিণী আসমা পারভীন বলেন, সকাল থেকে চুলায় গ্যাসের চাপ নেই। অনেক চেষ্টা এবং অপেক্ষা করেও রান্না করতে পারিনি। প্রতিদিনই এই অবস্থা চলছে। বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। এতে বাড়তি খরচ হচ্ছে। অথচ প্রতিমাসে তিতাস ঠিকই বিল নিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে যে কারণে দেশে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে, সেই মহেশখালির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটি এখনো মেরামত করা সম্ভব হয়নি। তবে গত বুধবার এফএসআরইউ’র সমস্যা দ্রুত সমাধানে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে বলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট এফএসআরইউ থেকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশনসহ অন্যান্য গ্রাহক গ্যাসের স্বল্পচাপের প্রভাব অনুভব করছেন। কোথাও কোথাও সিএনজি স্টেশনগুলো প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস গ্রহণ করতে না পারায় দীর্ঘ সারি ও সাময়িক ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে। এফএসআরইউটির কারিগরি ত্রুটি দ্রুত নিরসনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাসহ কারিগরি বিশেষজ্ঞরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্থলভাগ ও সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারে অনশোর-অফশোর মডেল পিএসসির আওতায় দরপত্র আহ্বানসহ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে গ্যাস অনুসন্ধান, কূপ খনন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করতে সময় লাগে। তাই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সংকটের স্থায়ী সমাধান তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব না হলেও সরকার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এফএসআরইউটির কারিগরি সমস্যা সমাধানের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
