পারস্য উপসাগর ছাপিয়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে নতুন ‘অঞ্চলে’
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতায় আপাতত পাল্টাপাল্টি হামলা স্থগিত রেখেছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র। তবে এর পরেও স্বাভাবিক হয়নি মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি। ইতোমধ্যে পারস্য উপসাগর ছাপিয়ে ইরান যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে নতুন নতুন অঞ্চলে। বিশেষ করে এখন তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে লোহিত সাগর উপকূলে। সেখানে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি আরবের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া কাস্পিয়ান সাগরে ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা এখন আরো বহুমুখী ও জটিল রূপ নিয়েছে।
এর আগে শুক্রবার রাত পর্যন্ত টানা ১৩ রাত ইরানে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পাল্টা জবাব হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হামলা চালিয়েছে ইরানও। এখন দুই দেশই আপাতত সংঘাতে না জড়িয়ে চুপ রয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে হামলা আপাতত বন্ধ থাকলেও তাদের নৌ অবরোধ কার্যকর রয়েছে। তবে কেন হঠাৎ হামলা বন্ধ রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি মার্কিন সামরিক বাহিনী।
সিএনএন জানিয়েছে, গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে যখন ইরানে যুদ্ধ আরো জোরদার করার সম্ভাবনাটি বিবেচনা করছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তখন এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন।
সিএনএনকে বিষয়টি সম্পর্কে জানে এমন একটি সূত্র এবং এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, শুক্রবারের বৈঠকে বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক গোলাবারুদের মজুত এবং অন্যান্য সম্ভাব্য নেতিবাচক পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরেন কেইন। তখন তিনি ট্রাম্পকে জানান, প্রেসিডেন্টের দেয়া প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন এবং সফল করতে সক্ষম মার্কিন সামরিক বাহিনী। আবার এর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কেও সতর্ক করেন কেইন।
সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের সময় যেসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল, তার মধ্যে গোলাবারুদের ঘাটতির বিষয়টি ছিল অন্যতম। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার বড় ধরনের অভিযান শুরু করলে অসংখ্য ইরানির মৃত্যু হতে পারে এবং আরো অনেক মানুষ বিদ্যুৎ বা খাবার ছাড়া চরম কষ্টে ভুগবে।
আলোচনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্রের মতে, শুক্রবারের বৈঠকে উঠে আসা অন্যান্য বিস্তৃত উদ্বেগের মধ্যে ছিল- সম্ভাব্য শরণার্থী সংকট, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোতে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা এবং আঞ্চলিকভাবে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা।
কক্ষে উপস্থিত বেশিরভাগ উপদেষ্টা বলেছিলেন, ট্রাম্প যদি বড় ধরনের কোনো হামলা চালাতে চান, তবে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত ধ্বংসাত্মকভাবে তা করতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট যেন এর সম্ভাব্য দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের পরিণতিগুলো বিবেচনা করেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়, আপাতত ইরানে হামলা আরো বৃদ্ধির পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন ট্রাম্প। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুজনের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, সংঘাত আরো ছড়িয়ে পড়া, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর চাপ, উপসাগরীয় মিত্রদের অসন্তোষ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন হোয়াইট হাউস।
এক বিবৃতিতে এরপরই হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেং বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব সময়ই বলে আসছেন, তিনি কূটনৈতিক সমাধান পছন্দ করেন। তবে ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে বা আমাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়, তাহলে তিনি সব ধরনের পদক্ষেপের পথ খোলা রাখবেন। তাই ইরানের জন্য বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে সমঝোতামূলক চুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া। তা না হলে কী হতে পারে, তা তাদের জানাই আছে।’
এমন আবহে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণায় সাড়া দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাল্টা আক্রমণ ও সামরিক অভিযান স্থগিত রেখেছে তেহরানও। টানা ১৩ রাত পাল্টাপাল্টি হামলার পর গত শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত দুই পক্ষই হামলা বন্ধ রাখে। এর পরেও যুদ্ধের উত্তেজনা নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। গত শনিবার লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলা চালায় ইয়েমেনের হুতিরা।
হুতি নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম জানিয়েছে, লোহিত সাগর তীরবর্তী সৌদি শহর জিজানকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জিজান এবং উত্তরের ইয়ানবু এলাকায় সতর্কতা জারি করে। টেলিগ্রামে আনসারুল্লাহ মিডিয়ার এক পোস্টে বলা হয়, হামলায় জিজানে আগুন লেগেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং এএফপি যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, শহরটিতে সৌদি তেল কোম্পানি আরামকোর একটি শোধনাগারের ওপর কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে।
এর আগে শুক্রবার সৌদি আরব হুতি স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানোর পর ইরান সমর্থিত এই গোষ্ঠী রিয়াদের বিরুদ্ধে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা সৃষ্টির’ অভিযোগ তোলে। ইয়েমেনের একটি নিরাপত্তা সূত্র এএফপিকে জানায়, সৌদি হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল হোদেইদা বন্দরনগরের একটি নৌঘাঁটি এবং কামারান দ্বীপের একটি সামরিক শিবির।
এদিকে হামলার কারণে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী এবং সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘ চার বছর ধরে বজায় থাকা অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির অবসান ঘটেছে। স¤প্রতি উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনায় এই অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। হামলার পর হুতিরা জানিয়েছেন, সৌদি আরব যদি ইয়েমেনে হামলা অব্যাহত রাখে, তবে তারাও সৌদির তেল স্থাপনা এবং বিমানবন্দরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাবে। অন্যদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ও সংহতি পুনর্ব্যক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে, তারা সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য সম্পূর্ণ প্রতিশ্রæতিবদ্ধ। ইরানের মদদপুষ্ট হুতিদের যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে রিয়াদের পাশে আছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর রয়েছে। পাশাপাশি হাজারো পাকিস্তানি সেনাসদস্য এবং একটি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন বর্তমানে সৌদি আরবে মোতায়েন রয়েছে। এ কারণেই সৌদি আরবের ওপর হামলাকে ইসলামাবাদ নিজেদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করবে। তাদের ভাষায়, এটি পাকিস্তানের জন্য একটি ‘রেড লাইন’।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৭০ শতাংশ লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে রপ্তানি করে সৌদি আরব। এখন লোহিত সাগরে সৌদি আরবের জন্য অবরোধ ঘোষণা করেছে হুতিরা। এতে সৌদির অর্থনীতি ও রাজস্ব আয়ে বড় বিপর্যয় নেমে আসার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জেরে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। এখন সৌদির জন্য লোহিত সাগর বন্ধ হওয়ায় বৈশ্বিক তেল বাজারে আরো ধস নামবে।
ভূরাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে এটি নতুন একটি ফ্রন্ট হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মিত্রদের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া এই গোলাগুলি সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এতে শুধু হরমুজ প্রণালিই নয়, বিশ্বের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেবও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে আবার জোরালো হতে পারে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ।
অন্যদিকে কাস্পিয়ান সাগরে ইরানের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এর মধ্য দিয়েও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। শনিবার ইরান অভিযোগ করেছে, কাস্পিয়ান সাগরে তাদের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এতে একজন নাবিক নিহত এবং আরেকজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় তেহরানে নিযুক্ত ইউক্রেনের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা এ হামলাকে ‘বৈরী ও অপরাধমূলক’ বলে আখ্যা দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার খবরে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
ইরানের জাহাজে হামলা চালানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে নজরদারির জন্য সংগ্রহ করা স্যাটেলাইট তথ্য ইরানের কাছে সরবরাহ করছে রাশিয়া, যাতে অঞ্চলটিতে তেহরানের হামলা চালাতে সুবিধা হয়।
এমন পরিস্থিতিতে ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, পারস্য উপসাগর ছাপিয়ে ইরান যুদ্ধ নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ায় চরম আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা, তেল স্থাপনায় হামলা এবং বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক সংকটের ঝুঁকি বেড়েছে। ফলে যেকোনো ফ্রন্টেই যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার বিকল্প নেই।
