আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট
ভাড়াটে খুনি হিসেবে কাজ করে কিশোররা, নেটওয়ার্ক ইউরোপে
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অর্থের বিনিময়ে তরুণ ও কিশোরদের ভাড়াটে খুনি (হিটম্যান) হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে একটি ভয়ংকর অপরাধী নেটওয়ার্ক। এদের (কিশোরদের) প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে খুঁজে বের করা হচ্ছে। এরপর ভিডিও গেমের মতো ধাপে ধাপে নির্দেশনা দিয়ে পাঠানো হচ্ছে চুক্তিভিত্তিক হত্যার মিশনে। গত কয়েক বছরে বহু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এই অপরাধী গোষ্ঠী জড়িত বলে জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অপরাধ দমন সংস্থা ‘ইউরোপোল’। তাদের ভাষায়, এটি ‘ভায়োলেন্স অ্যাজ আ সার্ভিস’ বা অর্থের বিনিময়ে সহিংসতা পরিচালনার এক নতুন ও ভয়ংকর ধারা। যা উত্তর ইউরোপ থেকে যুক্তরাজ্য পর্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
বিবিসি জানিয়েছে, বর্তমানে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আইসল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন, সুইডেন এবং যুক্তরাজ্য এই টাস্কফোর্সে যুক্ত রয়েছে।
ভয়ংকর ওই অপরাধী নেটওয়ার্কের মধ্যে সুইডেনভিত্তিক ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক অন্যতম। গত কয়েক বছরে এই সংঘবদ্ধ অপরাধী গোষ্ঠী প্রায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। এছাড়া একাধিক বিস্ফোরক ও গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে তারা। এই গ্যাংয়ের প্রধান রাওয়া মাজিদ। বর্তমানে তিনি ইরানে অবস্থান করে এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্টকহোমের একটি উপশহরে কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন ২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মুরাদ আবদেলকাদের। তবে পথে অতর্কিত একাধিক গুলি লাগে তার শরীরে। শেষ গুলিটি করা হয় তার মাথায়। ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি।
তদন্তে জানা যায়, হামলাকারী ছিলেন ১৮ বছর বয়সী আতিলা আজিমভ। তবে তিনি ভুল ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন। অর্থের বিনিময়ে ফক্সট্রট নেটওয়ার্কের হয়ে এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিলেন তিনি।
সুইডিশ সম্প্রচারমাধ্যম এসভিটির অনুসন্ধানী সাংবাদিক ডায়াম্যান্ট সালিহু তিন বছর ধরে ফক্সট্রট ও ইরানের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে অনুসন্ধান করছেন। তার দাবি, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর মাজিদ তেহরানে আশ্রয় নেয়ার বিনিময়ে ইরানি সরকারের হয়ে কাজ করতে সম্মত হন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর ইরান সরকার ফক্সট্রট নেটওয়ার্ককে নিজেদের বিরোধী ব্যক্তি, ভিন্নমতাবলম্বী, সাংবাদিক এবং ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার নির্দেশ দেয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক ও এর নেতা রাওয়া মাজিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাজ্য।
সম্প্রতি কিশোরদের ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড পরিচালনার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে নরওয়ের কিশোর জোহানেস ন্যাটল্যান্ডের মামলায়। ১৮ বছর বয়সে ন্যাটল্যান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি হত্যাকাণ্ড চালানোর প্রস্তাব পান। ইংল্যান্ডে একজনকে হত্যা করতে পারলে তাকে ২ লাখ ৭০ হাজার নরওয়েজিয়ান ক্রোনার (প্রায় ৩৫ লাখ টাকা) পারিশ্রমিক দেয়ার কথা বলা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ন্যাটল্যান্ডকে নিয়োগ করে অনলাইনে ‘এবহবৎধষবহ’ নামে পরিচিত ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর।
ন্যাটল্যান্ডকে নিয়োগের পর তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখত ‘অমবহঃ ৪৭’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তি। জনপ্রিয় ‘ঐরঃসধহ’ ভিডিও গেমের মূল চরিত্রের নাম অনুসারে এই ছদ্মনামটি ব্যবহার করা হয়। সুইডিশ পুলিশ মনে করে, এই ব্যক্তি হলেন আলি শাহেদ আহমেদ, যিনি ফক্সট্রট নেটওয়ার্কের নেতা রাওয়া মাজিদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত।
মিশন সফল করার জন্য ন্যাটল্যান্ডকে যুক্তরাজ্যের বিমানের টিকেট, জরুরি পাসপোর্ট এবং যাত্রাপথের নির্দেশনা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে শাহেদের বিরুদ্ধে। ‘সিগন্যাল’ মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে ন্যাটল্যান্ডকে পুরো যাত্রাপথে নির্দেশনা দেয়া হয়। পরে তাকে আরেক সহযোগীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এই ব্যক্তি ন্যাটল্যান্ডকে হাডার্সফিল্ডের জঙ্গলে লুকিয়ে রাখা অস্ত্রের অবস্থান দেখাতে মানচিত্র ও ভিডিও পাঠায়। তদন্তকারীদের মতে, পুরো প্রক্রিয়াটি এমনভাবে পরিচালিত হচ্ছিল যেন একজন কিশোরকে কোনো কম্পিউটার গেমের চরিত্র হিসেবে একটি ‘মিশন’ সম্পন্ন করতে পাঠানো হচ্ছে।
আলি শাহেদ আহমেদকে ২০২৫ সালে ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের সুলাইমানিয়াহ শহর থেকে আটক করা হয়। তাকে শিগগিরই সুইডেনে প্রত্যর্পণ করা হতে পারে।
ইউরোপোল জানিয়েছে, ইউরোপীয় পুলিশের অভিযানে গত ১৫ মাসে ২৮০ জনের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। ফক্সট্রটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের কয়েকজনও ধরা পড়েছেন। এর মধ্যে সুইডেন, যুক্তরাজ্য ও নরওয়ের একাধিক তরুণ এজেন্ট এবং মূল সমন্বয়কদের ইরাক ও তিউনিসিয়া থেকে গ্রেপ্তার করে ফেরত আনার প্রক্রিয়া চলছে। তবে মাজিদ এখনো ইরানে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইউরোপোলের বিশেষ টাস্কফোর্স ওটিএফ গ্রিম জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের চিহ্নিত করা হয়। এরপর ভিডিও গেমের মতো ধাপে ধাপে নির্দেশনা দিয়ে তাদের হত্যাকাণ্ড পরিচালনার জন্য প্রস্তুত করা হয়।
তদন্তকারীদের মতে, অধিকাংশ সময় মাদকাসক্ত ও সামাজিক পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকা তরুণ কিংবা কিশোরদের টার্গেট করে এই অপরাধী নেটওয়ার্ক। এরপর তাদের অর্থের প্রলোভন দেখানো হয়। আর অর্থের ফাঁদে পড়ে এসব কিশোররা সহজেই রাজি হয়ে যায়। বয়স কম হওয়ার কারণে এরা অপরাধের পরিণতি কি হতে পারে তা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করতে পারে না এবং আবেগের বসে সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়া কোনোভাবে গ্রেপ্তার হয়ে গেলে চুক্তি অনুযায়ী প্রতিশ্রæত অর্থ দিতে হয় না অপরাধী চক্রের।
উল্লেখ্য, একই কৌশলে কিশোরদের এই অপরাধ জগতে নিয়োগ শুরু করেছে ফক্সট্রটের প্রতিদ্ব›দ্বী ডালেন নেটওয়ার্কসহ অন্য অপরাধী গোষ্ঠীও। এ কারণে ইউরোপে ‘ভাড়াটে কিশোর খুনি’ ব্যবস্থার বিস্তার বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এই অপরাধ নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরো ব্যাপক অভিযান প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
