×

প্রথম পাতা

সবচেয়ে অনিরাপদ শহর ঢাকা, অপরাধের হারে শীর্ষে অবস্থান

Icon

সেবিকা দেবনাথ

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সবচেয়ে অনিরাপদ শহর ঢাকা, অপরাধের হারে শীর্ষে অবস্থান

রাত নয় দিনের আলোয় প্রকাশ্যে তাড়া করে করা হচ্ছে হত্যা, চাঁদাবাজি আর ছিনতাই। অপরাধ বাড়ছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অপরাধে জড়াচ্ছেন অনেকেই। এর মধ্যে শিশু, তরুণ ও কিশোরও রয়েছে। এমনকি অপরাধীদের হামলায় মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যরাও মারাত্মক জখম হচ্ছেন। পত্রিকায় পাতায় প্রায়ই এমন প্রতিবেদন চোখে পড়ে। এই ঘটনাগুলো জানান দেয় কতটা অনিরাপদ রাজধানী ঢাকা। দেশীয়, আন্তর্জাতিক এবং পুলিশ প্রশাসন থেকে অপরাধ বাড়ার চিত্র উঠে এলেও সরকারের পক্ষ থেকে বারবারই দাবি করা হয় পরিস্থিতি ‘অতটাও খারাপ নয়’। কিন্তু এবার আন্তর্জাতিক সংস্থার সূচকেও অপরাধের হারের দিক থেকে শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। বৈশ্বিক পরিসংখ্যানভিত্তিক সংস্থা ‘নাম্বিও’ প্রকাশিত ২০২৬ সালের অপরাধ ও নিরাপত্তা সূচকে এ চিত্র উঠে এসেছে।

নাম্বিওর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার অপরাধ সূচক বর্তমানে ৬২ দশমিক ২, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য সব শহরের তুলনায় সর্বোচ্চ। বিপরীতে নিরাপত্তার দিক থেকে ঢাকা তলানিতে অবস্থান করছে; শহরটির নিরাপত্তা সূচক মাত্র ৩৭ দশমিক ৮। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের বড় শহরগুলোর পরিস্থিতিও ঢাকার চেয়ে ভালো।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ শহর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি। শহরটির অপরাধ সূচক মাত্র ১১ দশমিক ১ এবং নিরাপত্তা সূচক ৮৮ দশমিক ৯। এর তুলনায় ঢাকার নিরাপত্তার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। সূচক বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, ঢাকার বাসিন্দারা রাতে বাইরে চলাফেরায় অনিরাপদ বোধ করেন এবং বেশিরভাগ সময় অপরাধের আতঙ্কে থাকেন।

নাম্বিওর বৈশ্বিক তালিকায় অপরাধপ্রবণতার দিক থেকে বিশ্বের বড় শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান ৫৯তম। অর্থাৎ অপরাধ ও নিরাপত্তার অভাবের দিক দিয়ে ঢাকা বিশ্বের শীর্ষ ১৫ শতাংশ শহরের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপদ শহরগুলোর মধ্যে ভারতের ম্যাঙ্গালোর (নিরাপত্তা ৭৪ দশমিক ৪) ও পাকিস্তানের ইসলামাবাদ (নিরাপত্তা ৬৮ দশমিক ৬) উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে। এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত বা রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল হিসেবে পরিচিত করাচি বা লাহোরও নিরাপত্তার সূচকে ঢাকার চেয়ে এগিয়ে আছে।

নাম্বিও মূলত বিশ্বজুড়ে শহর ও দেশগুলোর জীবনযাত্রার মান, আবাসন, অপরাধের হার, স্বাস্থ্যসেবা ও ট্রাফিকসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে নিয়মিত সূচক প্রকাশ করে থাকে। তাদের ২০২৬ সালের এই সূচকটি ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান শহরগুলোর মধ্যে অপরাধের হারের দিক থেকে শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। একই সঙ্গে এই শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও অত্যন্ত নাজুক বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় নিরাপদ শহরগুলোর মধ্যে ভারতের ম্যাঙ্গালোর ও পাকিস্তানের ইসলামাবাদ উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে। এমনকি করাচি বা লাহোরের মতো শহরও নিরাপত্তা সূচকে ঢাকার চেয়ে এগিয়ে আছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে জীবনযাত্রার মান, আবাসন, অপরাধ, স্বাস্থ্যসেবা ও যানজটসহ নানা সূচকের ওপর ভিত্তি করে নাম্বিও নিয়মিত এই ধরনের তথ্য প্রকাশ করে থাকে। ২০২৬ সালের সর্বশেষ সূচক ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগের বার্তা দিচ্ছে।

এর আগে গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান ‘জর্জটাউন ইনস্টিটিউট ফর উইমেন-এর করা এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নারীর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ দেশের তালিকায় বিশ্বের ১৮১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৫তম। বাংলাদেশের স্কোর শূন্য দশমিক ৫২৬। নিচের দিকে থাকা বাকি দেশগুলোর অধিকাংশই আফ্রিকা অঞ্চলের। একটি দেশের পরিবেশ নারীদের বসবাস, কাজ ও মেধা বিকাশের জন্য কতটা সহায়ক সেটি তুলে ধরেছে এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এজন্য তারা নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, আইনি অধিকার এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মতো ক্ষেত্রগুলোর সমন্বিত সূচক ব্যবহার করেছে।

অপরাধবিজ্ঞান বিষয়ক গবেষকদের মতে, ঢাকা শহরে সংঘটিত অপরাধের একটি বিশাল অংশই মূলত ঠিকানাবিহীন ভাসমান মানুষদের দ্বারা ঘটে। যারা কোনো এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে, সমাজ ও প্রতিবেশীর কাছে জবাবদিহিতার ভয়ে তাদের মধ্যে অপরাধের প্রবণতা অনেক কম থাকে; কিন্তু ভাসমান মানুষদের ক্ষেত্রে এই সামাজিক দায়বদ্ধতা বা পরিচয় প্রকাশের ভয় না থাকায় তারা সহজেই অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। মূলত ছিনতাই, ডাকাতি, চুরি এবং ধর্ষণের মতো মারাত্মক অপরাধগুলো এই ভাসমান অপরাধীদের দ্বারাই বেশি সংঘটিত হয়, অথবা তাদের ব্যবহার করা হয়।

বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টের তথ্যমতে, এখানে বসবাস করছে প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যের সংখ্যা মাত্র ৩৩ হাজারের মতো। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় টহল ব্যবস্থার মাত্র ১৫ শতাংশ নিশ্চিত করতে পারছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রাজধানীর সবচেয়ে অপরাধপ্রবণ এলাকা মোহাম্মদপুর আর আদাবর থানায় বাস করে ২০ লাখ বাসিন্দা। আর এই এলাকায় কাজ করছে আড়াইশ পুলিশ। অর্থাৎ প্রতি ৮ হাজার বাসিন্দার বিপরীতে রয়েছে মাত্র ১ জন পুলিশ।

জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য কমপক্ষে ২২২ জন পুলিশ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকার বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। এখানে প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য পুলিশ সংখ্যা অনেক ক্ষেত্রে ১০০-এর নিচে। এর মধ্যে আবার বড় একটি অংশ নিয়োজিত থাকে ভিআইপি প্রোটোকল, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক দায়িত্বে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক মনে করেন, জনসংখ্যার ঘনত্বের সঙ্গে অপরাধের সংযোজ রয়েছে। নাম্বিওর প্রতিবেদনের তথ্য পুরোপুরি সঠিক নয় বলেও মনে করেন তিনি। ভোরের কাগজকে তিনি বলেন, জনসংখ্যা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এই দুয়ের দিক থেকে বিবেচনা করলে, ঢাকার অবস্থান প্রথম হবার কারণ নেই। দ্বিতীয় হতে পারে। তবে অপরাধ বাড়ছে এই বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

ড. ওমর ফারুকে কথার সত্যতা পাওয়া যায় ২০২৪ সালের এক দেশীয় জরিপে। দেশের নগরাঞ্চলে পুলিশের সেবার ওপর নাগরিকদের আস্থা নিয়ে এক গবেষণা পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগ এবং ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের ৩ শিক্ষক। এ ছাড়া দেশের নগরাঞ্চলে লোকসংখ্যার বিপরীতে সংঘটিত অপরাধের হার বিবেচনায় নেন তারা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য ব্যবহার করে নগরভিত্তিক অপরাধ ও বাহিনীর সদস্য সংখ্যার মধ্যকার সংযোগ দেখানো হয়। গবেষণায় পুলিশের তথ্য থেকে পাওয়া সব ধরনের অপরাধকে বিশ্লেষণ করা হয়। এ ছাড়া পুলিশ তাদের নিয়ম অনুযায়ী অপরাধের যেসব ধরন নির্ধারণ করে সেই অপরাধের নানা বিভাগ-উপবিভাগ খতিয়ে দেখা হয়। গবেষণা ফলাফলে দেখা যায়, সার্বিক অপরাধ বিবেচনায় ঢাকার অবস্থান সবার নিচে। সবার ওপরে রয়েছে খুলনা শহর। সেখানে সার্বিক অপরাধের আনুপাতিক হার ৩৩ দশমিক ৩৭। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রংপুরে ২৮ দশমিক ৪৭, সিলেটে ১৫ দশমিক ৪০ আর সবচেয়ে কম ঢাকায় সার্বিক অপরাধের আনুপাতিক হার ৯ দশমিক ৫৮।

এদিকে সম্প্রতি অপরাধ দমনে পুলিশের উপস্থিতি ও নজরদারির পরিসর বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এর অংশ হিসেবে রাজধানীতে ৩টি থানা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। আরো একটি থানা ও দুটি ফাঁড়ির প্রস্তাব তৈরি হচ্ছে।

ডিএমপি কর্মকর্তারা বলছেন, দ্রুত বদলে যাওয়া ঢাকার জনসংখ্যা, নতুন আবাসন এলাকা, মহানগরের সীমান্তঘেঁষা অপরাধপ্রবণ অঞ্চল এবং পুলিশের বর্তমান জনবল-চাপ বিবেচনায় এসব উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। নতুন থানা ও ফাঁড়ি হলে টহল বাড়ানো, তল্লাশিচৌকি বসানো, অপরাধপ্রবণ এলাকায় দ্রুত পুলিশ পাঠানো এবং নাগরিক সেবা দেয়া সহজ হবে। এছাড়া ১১ হাজার সিসি ক্যামেরাও বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

এদিকে গতকাল রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাকাডেমিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশে বর্তমানে অপরাধের পরিমাণ তুলনামূলক কম এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছেন। গত পাঁচ-ছয় মাসের অপরাধপ্রবণতার পরিসংখ্যান টেনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আনুপাতিক হারে ও তুলনামূলক বিচারে দেশে বর্তমানে অপরাধ বা নাশকতার পরিমাণ অনেকটাই কম। পরিস্থিতি কোনোভাবেই উদ্বেগজনক নয়। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বোমা ডিসপোজাল ইউনিট ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নাশকতার যেকোনো পরিকল্পনা নস্যাৎ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সজাগ।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

অবশেষে জনসম্মুখে আসছেন শেখ হাসিনা

অবশেষে জনসম্মুখে আসছেন শেখ হাসিনা

ইরানে হামলায় প্রস্তুত ও সক্রিয় মার্কিন বাহিনী

পিট হেগসেথ ইরানে হামলায় প্রস্তুত ও সক্রিয় মার্কিন বাহিনী

এনআইডি সংশোধন: সেবা সহজ করতে ইসির নতুন পদক্ষেপ

এনআইডি সংশোধন: সেবা সহজ করতে ইসির নতুন পদক্ষেপ

ট্রাম্পের ঘোষণার পর ২৪ ঘণ্টায় গাজায় সর্বোচ্চ নিহত

ট্রাম্পের ঘোষণার পর ২৪ ঘণ্টায় গাজায় সর্বোচ্চ নিহত

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App