মধ্যপ্রাচ্য
সৌদি জাহাজে ফের হামলা, বিশ্বের নজর পাল্টা জবাবে
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
লোহিত সাগরের বাব এল-মান্দেব প্রণালি পার হওয়ার সময় আবারো সৌদি আরবের একটি জাহাজে মিসাইল হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে জাহাজে থাকা দুই পাকিস্তানি ও এক ইন্দোনেশীয় নিহত হয়েছেন। হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছে জাহাজ চলাচল সংস্থা ও ইয়েমেনি সরকারি সূত্র। এ ঘটনায় ওই অঞ্চলের জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বেড়েছে।
মূলত ইরিত্রিয়া, জিবুতি ও ইয়েমেনের মধ্যে বাব আল-মানদেব প্রণালি অবস্থিত। সামুদ্রিক এই সংকীর্ণ জলপথের পাশের ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশটি ইরান সমর্থিত হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এটি লোহিত সাগরে প্রবেশ ও বের হওয়ার মাত্র দুটি জলপথের একটি। অন্যটি হচ্ছে সুয়েজ খাল। এ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেলসহ বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক বাণিজ্যের ১০ থেকে ১২ শতাংশ সরবরাহ হয়ে থাকে। এই অবস্থান সশস্ত্র হুতি গোষ্ঠীটিকে লোহিত সাগরে জাহাজগুলোকে নিশানা করার কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে।
প্রায় দুই সপ্তাহ আগে লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি আরবের পণ্যবাহী কোনো জাহাজ পার হতে দেবে না বলে হুমকি দিয়েছিল হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি সৌদি আরবের বেশ কয়েকটি স্থানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তারা। গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী লোহিত সাগরের বন্দর জিজানে অবস্থিত সৌদি আরামকোর তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালায় হুতিরা, যার ফলে সেখানে আগুন ধরে যায়। গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের নাজরান প্রদেশে হুতিদের হামলায় এক শিশুসহ ১১ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হন। ৪ আগস্ট সৌদির দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান বিমানবন্দরে হামলা চালানো হয় বলে হুতিদের সামরিক মুখপাত্র দাবি করেন। এ ছাড়া ২৫ জুলাই লোহিত তীরবর্তী সৌদি শহরের ইয়ানবু ও জিজানে অবস্থিত আরামকোর তেল ও জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়। সর্বশেষ বাব এল-মান্দেব প্রণালি পার হওয়ার সময় সৌদি আরবের ওই জাহাজে মিসাইল হামলার ঘটনা ঘটে। তবে জাহাজটির নাম এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনায় সমুদ্রবিষয়ক গোয়েন্দা সংস্থা মারিস্ক বলেছে, ‘প্রাথমিক তথ্যে তিনজন ক্রু নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। যার মধ্যে দুজন পাকিস্তানি। অপরজন ইন্দোনেশীয়।’ এসব ঘটনার জবাবে ইয়েমেনে হুথিদের বিভিন্ন অবস্থান লক্ষ্য করে স্বল্প মাত্রার হামলা চালিয়েছে সৌদি।
আরও পড়ুন: প্রবল ঢেউয়ে ফেরি ডুবে নিহত ১৫, নিখোঁজ ২৭
এমন পরিস্থিতিতে একটি প্রশ্ন সামনে আসছে, আর তা হলো হুতিরা কেন সৌদি আরবকে টার্গেট করছে। এর উত্তর জানতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০১৫ সালে। ওই সময় থেকেই ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন আরব সামরিক জোট হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা ও সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে। এর জবাবে সৌদি আরবের সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে হুতিরা। হুতিদের অভিযোগ, সৌদি আরব ও তাদের মিত্ররা ইয়েমেনের বন্দর, বিমানবন্দর এবং স্থল সীমান্তে দীর্ঘ সময় ধরে এক প্রকার অন্যায় ও কঠোর অবরোধ বা অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। এই অবরোধ ভাঙা হুতিদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
হুতিদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সৌদি ড্রোন ও যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের বিভিন্ন প্রদেশে (যেমন- সাদা ও হুদাইদা) তাদের (হুতি) নিয়ন্ত্রিত আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় তারা সৌদিতে হামলা চালাচ্ছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক যুদ্ধ ও উত্তেজনার (যেমন- ইসরায়েল-গাজা সংঘাত বা ইরান ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা) রেশ ধরে হুতিরা ইরান-সমর্থিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর অংশ হিসেবে সৌদি আরব ও লোহিত সাগরে পশ্চিমা বা সৌদি-ঘনিষ্ঠ স্বার্থের ওপর আক্রমণ জোরদার করেছে। সম্প্রতি লোহিত সাগরে নিয়ন্ত্রণ নিতে হুতিদের উসকে দিয়েছে ইরান। তেহরানের লক্ষ্য- হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর বন্ধ করে দিয়ে বৈশ্বিক তেলের বাজারে চাপ সৃষ্টি করা।
এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরো জোরদার করার চেষ্টা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার ওই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক। চুক্তিতে সইকারী তিন দেশই সুন্নি-প্রধান এবং তিন দেশই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র। উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর ওপর চলমান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিয়ে উদ্বিগ্ন তারা।
চুক্তি সইয়ের পর যৌথ বিবৃতিতে তিন দেশ বলেছে, যেকোনো ধরনের আগ্রাসন প্রতিহত করতে সম্মিলিত প্রতিরোধের সক্ষমতা জোরদার করাই এই চুক্তির উদ্দেশ্য। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। নতুন জোটের আওতায় রাজনৈতিক ও সামরিক কমিটিও গঠিত হবে। এসব কমিটিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক বাহিনীর প্রধানরা থাকবেন। সৌদি আরবে থাকবে একটি সচিবালয়। তিন দেশ যৌথ প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, রসদ সরবরাহ, হুমকি মূল্যায়ন ও সামরিক সক্ষমতার পারস্পরিক সমন্বয় নিয়ে কাজ করবে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ‘সম্মিলিত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং অঞ্চল ও এর বাইরে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। তবে এই মুহূর্তে চুক্তির বাস্তব প্রয়োগের অনেক বিষয়ই চূড়ান্ত নয়। সংকটকালে তিন দেশের সামরিক বাহিনী কীভাবে সমন্বয় করবে, সেটি এই চুক্তির মধ্যে রয়েছে।’
এর আগে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতকে কেন্দ্র করে লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও এডেন উপসাগরের নৌপথ সুরক্ষায় বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশ নিয়ে একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করে সৌদি আরব। এই বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটের স্বাক্ষরকারী দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও কমোরোস। এই জোটের প্রধান কার্যালয় হচ্ছে সৌদি ভূখণ্ডেই।
এ বিষয়ে এক বিবৃতিতে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সম্মিলিত সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ গড়ে তোলা হয়েছে। জোটভুক্ত দেশগুলো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ভারত মহাসাগরের সঙ্গে ভূমধ্যসাগরকে যুক্ত করা এই অতি গুরুত্বপূর্ণ তিনটি জলপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের রুট পুরোপুরি নিরাপদ রাখতে চায় তারা।
তবে কোন দেশ ঠিক কতগুলো যুদ্ধজাহাজ বা বিমান পাঠাবে, সে তথ্য এখনই প্রকাশ করা হয়নি। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ সামরিক মহড়া এবং একযোগে নৌ অভিযান পরিচালনার বিষয়টি এই জোটের মূল কার্যপরিধির মধ্যে থাকছে। এই উদ্যোগ পুরোটাই আত্মরক্ষামূলক এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে গঠিত হয়নি বলে জোটের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরো জানানো হয়, প্রয়োজনীয় জাতীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অন্য দেশগুলোর জন্যও এই জোটের সনদে যুক্ত হওয়ার পথ খোলা রাখা হয়েছে। সদস্য দেশগুলোর দৃঢ় বিশ্বাস- সামুদ্রিক নিরাপত্তা কোনো একক দেশের বিষয় নয়, এটা যৌথ দায়িত্ব। আন্তসীমান্ত নৌ হুমকি মোকাবিলায় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ই প্রধান মূলধন।
এখন প্রশ্ন উঠছে- সৌদি আসলে সামরিক শক্তিতে কতোটুকু শক্তিশালী। একাধিক জোট করা সত্ত্বেও সৌদি আরব থেকে হুতিরা কেন পিছু হটছে না? এর উত্তরে ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কিংবা বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের সঙ্গেও শক্তিশালী জোট রয়েছে সৌদি আরবের। এর পরেও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা পিছু হটছে না মূলত শক্তিশালী আঞ্চলিক মিত্রের সহায়তা, নিজস্ব কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কারণে। ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল এবং ঘনবসতিপূর্ণ উত্তর-পশ্চিম ও রাজধানী সানার ওপর তাদের শক্ত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, যা সহজে দখল করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপে রাখে হুতিরা।
বিশ্লেষকরা আরো বলছেন, গত মার্চ মাসে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাব এল-মান্দেব প্রণালিকে এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি সরবরাহের ‘লাইফলাইন’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। তবে সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবার সংঘাত শুরু হওয়ায় শিগগিরই জলপথটি স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ নেই।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৭০ শতাংশ লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে রপ্তানি করে সৌদি আরব। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার পর সৌদি আরব তাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ব্যবহার করে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি বহুগুণ বাড়িয়েছিল। কিন্তু বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে হুথিদের অবরোধের ফলে সেই বিকল্প পথটি এখন পুরোপুরি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এতে সৌদি আরবের অর্থনীতি ধসে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে চলমান আঞ্চলিক সংঘাত থেকে নিজেদের দূরে রাখতে গত পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে ‘সংযত’ ছিল সৌদি আরব। তবে লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা অব্যাহত থাকায় এখন সৌদি আরব সরাসরি বড় ধরনের সর্বাত্মক যুদ্ধ বা হুতিদের ওপর এককভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বে নাকি কৌশলগত ও প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপের দিকে বেশি ঝুঁকবে, সে উত্তর সময়ই বলে দেবে- এমনটি মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে আন্তর্জাতিক বাজরে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। গতকাল বিবিসি জানিয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা কমে যাওয়া এবং সৌদি ও হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যা গত সপ্তাহের চেয়ে ১০ শতাংশ বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ নয়, শান্তি চায় বিশ্ববাসী।
