রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
প্রার্থী ঘোষণায় বিএনপির রাখঢাক, কৌতূহল তুঙ্গে
হরলাল রায় সাগর
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
মির্জা ফখরুল
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন আগামীকাল বৃহস্পতিবার। এখন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট প্রার্থী ঘোষণা করেছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন বিএনপির তরফ থেকে এখন পর্যন্ত প্রার্থী ঘোষণা দেয়া হয়নি। প্রার্থী হিসেবে দুই শীর্ষ নেতার নাম আলোচনায় থাকলেও এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি দলটি। তবে নেতারা জানিয়েছেন, মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার দিনই প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন। এ কারণে প্রার্থী ঘোষণা করতে রাখঢাক করছে বিএনপি। আগেই প্রকাশ করতে চাইছে না। একটু রহস্য বা গোপনীয়তা রাখা হয়েছে। আর এতে দেশবাসীর মনে কৌতূহল যেন আরো বেড়েছে বিএনপির প্রার্থীর নাম জানতে। জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। তবে সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিএনপির প্রার্থীই যে রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই।
নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ঘোষণা দেয়ায় বিগত দিনের মতো একক প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ থাকছে না। এখন পর্যন্ত প্রার্থী চূড়ান্ত ঘোষণা না হলেও ভোটাভুটির দিকেই এগুচ্ছে নির্বাচন। এদিকে ভোটদানের জন্য দলীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিএনপি। এক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সামনে ঝুলানো হয়েছে। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে সংসদ সদস্যরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। কেউ দলের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিলে তার এমপি পদ থাকবে না। ইতোমধ্যে গতকাল মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়ে প্রস্তুতিমূলক সভা করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্যরা। সভায় নির্বাচনে করণীয় বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার আলোচনা উঠেছিল রাজনৈতিক মহলে। এ বিষয়ে গণমাধ্যমেও খবর বেরিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত সংসদের বিশেষ অধিবেশন থেকে সরে এসেছে সরকার। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য বিশেষ অধিবেশন ডাকা হচ্ছে না বলে গতকাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তবে গতকালই সংসদের তৃতীয় অধিবেশন ডাকা হয়েছে নির্বাচনের পর ২৭ আগস্ট থেকে।
আলোচনায় দুজন: দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির নীতি-নির্ধারণী ফোরামের দুই শীর্ষ নেতা বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং স্থানীয় সরকার, পল্লিউন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম চূড়ান্ত পর্যায়ে বিবেচনায় রয়েছে। হাফিজ উদ্দিন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আর মির্জা ফখরুল মহাসচিবের দায়িত্বে রয়েছেন। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে এই দুই নেতাসহ আরো কয়েকজন দলীয় নেতার নাম আলোচনায় উঠে আসে। এরমধ্যে রয়েছেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান। দলের বাইরে আরো কয়েকজনের নাম চাউর হয়েছিল বিভিন্ন মাধ্যমে। তবে নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসায় শেষ পর্যন্ত হাফিজ উদ্দিন ও মির্জা ফখরুলের নাম আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। দলের নীতি-নির্ধারণী ফোরাম থেকেও প্রার্থী হিসেবে এই দুজনের নামের আভাস মিলেছে। তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে বঙ্গভবনের অধিপতি হিসেবে কে মনোনীত হবেন, তা এখন শুধু সময়ের ওপর নির্ভর করছে। শুধু আজকের বুধবার দিনটি বাকি থাকলেও প্রার্থীর নাম প্রকাশ করছে না দলটি; আগামীকাল বৃহস্পতিবারের জন্যই রেখে দেয়া হয়েছে। কারণ এই দিনটিই মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন।
আরও পড়ুন: মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের হাল ধরবেন যারা
অবশ্য ১০ আগস্ট দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে বিএনপি। দুজনের জন্য দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেয়া হতে পারে। আবার একজনের জন্যও দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ একটিতে কোনো ত্রæটি থাকলেও আরেকটি বৈধ হিসেবে চূড়ান্ত করা হবে।
বিএনপির দলীয় প্রার্থীর বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, প্রার্থী প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করবেন। দল প্রার্থী চূড়ান্ত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দায়িত্ব দিয়েছে। যেদিন আমাদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়া হবে, দাখিলের সময় আমরা সবাই জানব।
তিনি বলেন, বিরোধী দল থেকে প্রার্থী দেয়া হয়েছে। সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠায় এ নির্বাচনও হচ্ছে।
এমপিদের সমানে ৭০ অনুচ্ছেদ : গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১টায় জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল। সভায় সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং হুইপদের মধ্যে মো. জি কে গউছ, রকিবুল ইসলাম বকুল, মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ, মো. আখতারুজ্জামান মিয়া ও এ. বি. এম আশরাফ উদ্দিন নিজান অংশগ্রহণ করেন। সভা শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে প্রেস ব্রিফিং করেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।
তিনি বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ যেহেতু সংশোধিত হয়নি, সুতরাং এটা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কার্যকর হবে। ৭০ অনুচ্ছেদ তুলে ধরে তিনি বলেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে এমপিরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। কেউ দলের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে। বিএনপির প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর দলের সব সংসদ সদস্য একসঙ্গে সেই প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেবেন।
বর্তমান ভোটপদ্ধতি নিয়ে চিফ হুইপ বলেন, সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থীর সামনে তার নাম লিখবেন। ভোটটি প্রকাশ্য বা গোপন- যেটিই হোক, ভোটদাতাকে নিজের নাম ও আসন নম্বর লিখতে হবে। ফলে কে কাকে ভোট দিয়েছেন, তা শনাক্ত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, বর্তমানে ভোটে কোনো গোপনীয়তা নেই। ভবিষ্যতে যেভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, সেভাবেই ভোটের ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি, সংসদ নেতা-প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও স্পিকার ভোট দেবেন। ভোট দেয়ার সময় গণমাধ্যমের উপস্থিতি থাকবে এবং ভোটগ্রহণ সরাসরি দেখানো হবে। পরে সংসদ সদস্যরা নির্ধারিত সময় ভোট দেবেন। সবাই ভোট দেয়ার পর গণনা করা হবে। ভোট শেষ হওয়ার পর ফলাফল প্রস্তুতের সময়ও গণমাধ্যমকে জানানো হবে।
চিফ হুইপ বলেন, প্রায় ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গণতন্ত্রের স্বার্থে নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক করার লক্ষ্যেই বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রার্থী দেয়া হয়েছে। এ নির্বাচন সামনে রেখে কোনো বিশেষ অধিবেশন ডাকা হচ্ছে না বলেও জানান চিফ হুইপ।
১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অলি : অন্যদিকে সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে শরিক দল এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তার জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে জোট।
অলি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য: গতকাল নির্বাচনী প্রস্তুতি সভা শেষে নির্বাচনে প্রার্থী দেয়ার বিষয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, গণতন্ত্রের জন্য একটা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রয়োজন এবং আমরা দেশবাসীকে রাজনৈতিক অবস্থানটাও জানান দিতে চাই। আমাদের যিনি প্রার্থী, তাকে আমরা মনে করছি, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অভিভাবকত্ব হিসেবে তিনি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হবেন। জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উচিত ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, যেহেতু গণভোটের রায়ও সংস্কারের পক্ষে এসেছে, তাই ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা যেত। তাহলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আরো বেশি সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য হত। তারপরেও যেহেতু নির্বাচন হচ্ছে, এটাকে বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় দিতে চাই না। আমরা সে কারণে বিরোধী দলের জায়গা থেকে প্রার্থী দিয়েছি।
তবে সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম দাবি করেন, জুলাই সনদ অনুযায়ীও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে। ৭০ অনুচ্ছেদে অর্থবিল ও আস্থাভোট ছাড়া অন্য যেকোনো ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে মত দিতে পারবেন।
ভোটের তফসিল ও ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়া : তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমা দেয়া যাবে ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকালে ৪টা পর্যন্ত। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে ১৬ আগস্ট। আর ১৮ আগস্ট বিকাল ৪টা পর্যন্ত প্রার্থী প্রত্যাহারের শেষ সময়। ২০ আগস্ট ভোটগ্রহণ হবে দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। জাতীয় সংসদ কক্ষে এই ভোট হবে। এ কারণে ভোটকেন্দ্র ও বুথ স্থাপন করা হবে। বিকাল ৫টার আগেই সব ভোটগ্রহণ শেষ হয়ে গেলে ভোট গণনার পর ফলাফল প্রস্তুতের কাজ শুরু করা যাবে। তবে কোনো ভোট বাকি থাকলে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। এরপর ফলাফল ঘোষণা করা হবে। নির্বাচন কমিশন এই ভোটগ্রহণের আয়োজন করছে। নির্বাচন কর্তা হলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। এর আগে ভোটের দিন সংসদ কক্ষে বৈঠক ডাকবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। এই বৈঠকে যার যার আসনে সংসদ সদস্যরা বসবেন। নির্বাচনী কর্তা হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন। সংরক্ষিত আসনের ৫০ জন নারী এমপিসহ মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য এ নির্বাচনের ভোটার।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনায় নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা থাকবে বলে জানান চিফ হুইপ। তিনি বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা ভোটগ্রহণের সময় উপস্থিত থাকবেন। কমিশনের কোনো কমিশনার এলে তিনিও সেখানে থাকবেন। এ ছাড়া অন্য কর্মকর্তারাও দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি আরো বলেন, সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় সাচিবিক সহায়তা দেবেন।
মেয়াদের ২১ মাস বাকি থাকতেই ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন মো. শাহাবুদ্দিন। আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল তাকে মনোনয়ন দিয়ে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ-আন্দোলন করেছিল জুলাই আন্দোলনকারী বিভিন্ন সংগঠন।
