অভিযোগ অনেক থাকলেও শাস্তির নজির নিতান্তই কম
সেবিকা দেবনাথ
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
অবহেলায় রোগী মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠছে। কখনো ভুল ইনজেকশনে রোগীর মৃত্যু, কখনো অস্ত্রোপচারের পর জটিলতা, কখনো চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, আবার কখনো হাসপাতালের পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জামের অভাব- বিভিন্ন ঘটনায় স্বজনেরা অভিযোগ করছেন, যথাযথ চিকিৎসা পেলে তাদের প্রিয়জন বেঁচে যেতে পারতেন। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, দেশে চিকিৎসা-অবহেলায় মোট কতজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে- এর নির্ভরযোগ্য ও জাতীয় পর্যায়ের সরকারি পরিসংখ্যান নেই। ফলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিচ্ছিন্ন ঘটনা, আদালতের নথি, তদন্ত প্রতিবেদন এবং পেশাজীবী নিয়ন্ত্রক সংস্থার শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করেই পরিস্থিতির আংশিক চিত্র পাওয়া যায়।
৩৮ শতাংশ রোগীর অভিযোগ : ৮ হাজার ২৫৬টি পরিবারের ওপর করা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) স্বাস্থ্য খাত সংস্কারবিষয়ক এক জনমত জরিপের তথ্য বলছে, দেশের প্রতি ৩ জনের মধ্যে ১ জন মানুষের সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে অবহেলা, অযতœ ও অপচিকিৎসার শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। গ্রামের চেয়ে শহরে এই হার বেশি। দেশের ৯১ শতাংশ মানুষ চান, সরকার যেন সব মানুষকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে আইনগতভাবে বাধ্য থাকে। জরিপে অংশ নেয়া ৩৮ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে তারা অবহেলা, অসতর্কতা বা দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন। গ্রাম ও শহরের মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৪৪ শতাংশ উত্তরদাতা চিকিৎসাসেবায় অবহেলা বা অনুপযুক্ত আচরণের অভিযোগ করেছেন। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, অভিযোগ করার পথ সম্পর্কেও অধিকাংশ মানুষ অজ্ঞ। জরিপে ৬৫ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, চিকিৎসাসংক্রান্ত অভিযোগ কোথায় করতে হয় তা তারা জানেন না। মাত্র ২৪ শতাংশ বলেছেন, তারা অভিযোগ জানানোর জায়গা সম্পর্কে জানেন। অর্থাৎ চিকিৎসায় সমস্যার অভিযোগ করার মতো ঘটনা ঘটলেও একটি বড় অংশের রোগী বা স্বজন জানেন না কোথায় গেলে প্রতিকার পাওয়া যাবে।
আরো পড়ুন: ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, রক্তাক্ত সেই বিকেল
অভিযোগ মানেই ভুল চিকিৎসা নয় : চিকিৎসা-অবহেলার বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। চিকিৎসা নেয়ার পর রোগীর মৃত্যু হয়েছে- এ তথ্য একা প্রমাণ করে না যে ভুল চিকিৎসার কারণে মৃত্যু হয়েছে। জটিল রোগ, রোগীর শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসার ঝুঁকি, দেরিতে হাসপাতালে আসা কিংবা চিকিৎসার অনিবার্য জটিলতায়ও মৃত্যু হতে পারে। চিকিৎসকের পেশাগত অবহেলা প্রমাণ করতে হলে সাধারণত দেখতে হয়- স্বাভাবিক চিকিৎসা-মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছিল কিনা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয়েছিল কিনা, সঠিক ওষুধ ও মাত্রা দেয়া হয়েছিল কিনা, চিকিৎসক বা নার্স যথাসময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন কিনা এবং এসব ব্যর্থতার সঙ্গে রোগীর ক্ষতি বা মৃত্যুর সরাসরি সম্পর্ক ছিল কিনা।
ভুল ও অবহেলায় মৃত্যুর কিছু ঘটনা : সাম্প্রতিক বছরগুলোর কয়েকটি ঘটনা দেখলে একই ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি চোখে পড়ে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের আগে দুই রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় ভুল ইনজেকশন দেয়ার অভিযোগ ওঠে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং সংশ্লিষ্ট নার্সকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়।
২০২৬ সালের শুরুতেও ঢাকার শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ভুল অ্যানেস্থেশিয়া দেয়ার অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটিকে গুরুতর অবহেলার অভিযোগ হিসেবে নিয়ে তদন্ত করা হয়। ২০২৬ সালে রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা চিকিৎসা-অবহেলার আলোচনাকে নতুন মাত্রা দেয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্তে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা, নার্সিং সেবা, চিকিৎসকের উপস্থিতি, রোগীর অতিরিক্ত চাপ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মতো একাধিক বিষয় উঠে আসে। অর্থাৎ ঘটনাটি শুধু কোনো একজন চিকিৎসকের ভুলের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং পুরো হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার ত্রæটি কীভাবে রোগীর জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, সেটিও সামনে আসে।
এ ধরনের ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়- রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু চিকিৎসকের নয়। হাসপাতালের মালিকপক্ষ, প্রশাসন, নার্স, টেকনিশিয়ান এবং ব্যবস্থাপনা- প্রত্যেক স্তরেই জবাবদিহি থাকতে হবে।
বিএমডিসি’র কাজ কী : চিকিৎসকদের পেশাগত আচরণ ও নৈতিকতার নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলো, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)। ১৯৮০ সালে গঠিত এই সংস্থার মূল দায়িত্বই হলো চিকিৎসকদের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার বিরুদ্ধে আসা অভিযোগগুলোর সুরাহা করা। কিন্তু চিকিৎসা-অবহেলার অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই এই সংস্থার বিরুদ্ধে ধীরগতির অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, এই সংস্থার কাছে কোনো অভিযোগ জমা পড়লে
অভিযুক্ত চিকিৎসকের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয় এবং এরপর মামলাটি শৃঙ্খলা কমিটির তালিকায় যুক্ত হয়। কমিটি উভয় পক্ষকে তলব করে, তাদের বক্তব্য শোনে। এরপর একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। কিন্তু সিংহভাগ মামলার ক্ষেত্রেই মূল অভিযোগের কোনো লিখিত বিবরণী থাকে না। শৃঙ্খলা কমিটি তাদের সুপারিশের পক্ষে কোনো কার্যবিবরণী সংরক্ষণ করে না কিংবা কোনো ব্যাখ্যাও দেয় না। তারা স্রেফ একটি কাগজের টুকরোতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি লিখে রাখে। অপেক্ষাকৃত জটিল মামলাগুলো পাঠানো হয় একটি তদন্ত কমিটির কাছে, যারা কাউন্সিলের সভাপতির কাছে সুপারিশ পেশ করে। সভাপতি তখন সিদ্ধান্ত নেন যে, অভিযুক্তের ওপর কোনো শাস্তি আরোপ করা হবে নাকি অভিযোগটি খারিজ করে দেয়া হবে। কাউন্সিলের এই ধীরগতির কারণ হিসেবে আনোয়ারুল্লাহ কর্মী সংকট এবং ঢাকার বাইরে আঞ্চলিক কার্যালয় না থাকাকে দায়ী করেন।
প্রতিকারের পথ দীর্ঘ : একজন স্বজনহারা মানুষের সামনে প্রতিকার পাওয়ার ৩টি পথ খোলা থাকে- লাইসেন্স বাতিলের আবেদন, ক্ষতিপূরণ দাবি ও ফৌজদারি মামলা। এর একেকটি পথ পাড়ি দিতেই বছরের পর বছর, এমনকি এক দশকেরও বেশি সময় লেগে যায়। থানায় দায়ের করা মামলা বিচারিক আদালতে যায়; সাধারণ ফল সাময়িক গ্রেপ্তার, তবে সাজার ঘটনা প্রায় কখনোই হয় না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তদন্ত করতে পারে, কিন্তু চিকিৎসকের লাইসেন্স বাতিল করতে পারে না, তারা কেবল বিষয়টি বিএমডিসিতে পাঠাতে পারে। বিএমডিসিই একমাত্র সংস্থা যা লাইসেন্স বাতিল করতে পারে। এটি বছরে হাতেগোনা কয়েকটি মামলা নিষ্পত্তি করে, আর সর্বোচ্চ যা করে তা হলো লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল কিংবা সামান্য ক্ষতিপূরণের নির্দেশ। প্রায়ই বছরের পর বছর পার হওয়ার পর। হাইকোর্টে রিট আবেদন থেকে ক্ষতিপূরণের আদেশ আসতে পারে, কিংবা তদন্তের আদেশ- যা আবার মন্ত্রণালয় হয়ে বিএমডিসিতেই ফিরে যায়। আর্থিক ক্ষতিপূরণ চেয়ে নি¤œ দেওয়ানি আদালতে আলাদা মানি স্যুট করা যায়, যদিও তাতে সফল রায় প্রায় নজিরবিহীন। অর্থাৎ ৩টি পথের দুটিই ঘুরে বিএমডিসিতেই এসে ঠেকে।
অভিযোগ ও নিষ্পত্তির হার নগণ্য : ২০২৪ সালের একটি বিশ্লেষণে বিএমডিসি-তে ২০১০ সালের পর থেকে ৪৫৫টি অভিযোগের তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৪৩টি অভিযোগের আর তদন্ত এগোয়নি, ২৭৪টি খারিজ হয়েছে এবং ৩৮টি বিচারাধীন ছিল বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগের মাত্র প্রায় ২ শতাংশ কোনো ধরনের নিষ্পত্তি পেয়েছিল- এমন তথ্যও উঠে আসে। আর ২০০৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিএমডিসি-তে সারাদেশে চিকিৎসা-অবহেলার অভিযোগের সংখ্যা ২০০টিরও কম। ১৪০টিরও কম অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে মাত্র ৮টি। নিষ্পত্তির বেশিরভাগ ফলাফলই হলো, অভিযোগ থেকে অব্যাহতি কিংবা সতর্কতা। এই হিসাব কেবল বৈধ চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে। ২০২৪ সালে বিএমডিসি নিজেই স্বীকার করেছে যে, দেশে অন্তত ৩৬ হাজার নিবন্ধনহীন চিকিৎসক চিকিৎসা পেশা চালিয়ে যাচ্ছেন। এদের ব্যাপারে বিএমডিসিতে অভিযোগ দায়ের করার সুযোগই নেই। এখানে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে- দেশে যদি ৩৮ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নিতে গিয়ে কোনো না কোনো ধরনের অবহেলা বা অনুপযুক্ত আচরণের অভিজ্ঞতার কথা জানান, তাহলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে অভিযোগের সংখ্যা এত কম কেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর একটি কারণ হতে পারে অভিযোগ করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা, আরেকটি হলো দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতা।
সুপ্রিম কোর্টে গত ১৫ বছর ধরে চিকিৎসায় অবহেলাসংক্রান্ত ১০টি মামলা পরিচালনা করেছেন ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির পল্লব। তিনি জানান, এই সবগুলোই ছিল হাইকোর্টে দায়ের করা রিট পিটিশন। যেহেতু হাইকোর্ট বিচারিক আদালত নয়, তাই এখান থেকে বড়জোর দেওয়ানি ক্ষতিপূরণের আদেশ পাওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে বিএমডিসির সর্বোচ্চ শাস্তি হলো, লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করা কিংবা সামান্য ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেয়া। এই প্রক্রিয়াটুকু সম্পন্ন হতেই কেটে যায় বছরের পর বছর। মাঝেমাঝে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও এসব ঘটনার তদন্ত করে, বিশেষ করে উচ্চ আদালতের নির্দেশ পেলে। তবে চিকিৎসকের লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিত করার এখতিয়ার তাদের নেই। তারা কেবল বিএমডিসিকে এমন পদক্ষেপ নিতে বলতে পারে। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, জেলার সিভিল সার্জন বা জেলা প্রশাসক, এমনকি অন্যান্য ডাক্তারের কাছ থেকে অভিযোগ পেলেও ফলাফল জানাতে বছরের পর কেটে যায় বিএমডিসির।
হাইকোর্টের রিট পিটিশনের মাধ্যমে তদন্ত কমিটি গঠন ও কখনো কখনো ক্ষতিপূরণ পাওয়া সম্ভব হলেও, সাফল্যের হার বিরল। এছাড়া ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে সাময়িক কিছু গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে, তবে সাজা হওয়াটা একেবারেই নজিরবিহীন। কিছু মামলা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চললেও শেষ পর্যন্ত কোনো ফলাফল আসে না।
শাস্তির নজিরও তৈরি হচ্ছে : চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এখন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চে বিএমডিসি চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর ১০ চিকিৎসকের নিবন্ধন বিভিন্ন মেয়াদে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এসব অভিযোগের মধ্যে রোগীর মৃত্যু এবং শিশুর খৎনা-সংক্রান্ত চিকিৎসায় গুরুতর সমস্যার ঘটনাও ছিল। এর আগে ২০২৫ সালেও চিকিৎসায় অবহেলার ঘটনায় একাধিক চিকিৎসকের নিবন্ধন স্থগিতের খবর প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ ‘চিকিৎসক কখনো শাস্তি পান না’- এমন সরলীকৃত ধারণাও পুরোপুরি সঠিক নয়। তবে শাস্তির সংখ্যা এবং অভিযোগের পরিমাণের তুলনা করলে ব্যবস্থাটির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এছাড়া ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার প্রমাণ পাওয়ায় আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়। তবে সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর শর্তসাপেক্ষে ২৭ জুলাই হাসপাতালটির লাইসেন্স পুনর্বহাল করা হয় এবং ২৮ জুলাই পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা আবার চালু হয়। পুনরায় চালুর শর্তের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ এবং বিদ্যমান বিধিবিধান মেনে চলার বিষয়টি ছিল।
এদিকে গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা সহ্য করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, চিকিৎসা অবহেলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ফরিদপুরের বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের পর কনিকা মণ্ডল নামের এক নারীর পেটে গজ রেখেই সেলাই করার অভিযোগ উঠে। প্রায় দেড় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর তার মৃত্যু হয়। গতকাল সকালে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে কনিকার বাড়িতে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি কনিকার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। এই ঘটনার তদন্তে গত বৃহস্পতিবার রাতে ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন।
মন্ত্রী আরো বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাঙের ছাতার মতো ক্লিনিক হাসপাতাল তৈরি হয়েছে। এগুলো এখন সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছরে গড়ে ওঠা সমস্যা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব নয়।
অভিযোগ কেন বাড়ছে? : চিকিৎসা-অবহেলার পেছনে শুধু চিকিৎসকের ব্যক্তিগত ভুলকে দায়ী করলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে প্রতি ১ হাজার মানুষের বিপরীতে চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র শূন্য দশমিক ৬৭ জন। অর্থাৎ ১০ হাজার মানুষের জন্য মাত্র ৬ থেকে ৭ জন চিকিৎসক। এই অনুপাত এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বনি¤œ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের চেয়ে অনেক কম। ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে চিকিৎসক সংখ্যার তীব্র ঘাটতির মানে হলো, কাজের চাপে জর্জরিত চিকিৎসক। একই চিকিৎসককে অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক রোগী দেখতে হয়। এতে রোগীর ইতিহাস নেয়া, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সময় কমে যেতে পারে।
চিকিৎসক ছাড়াও নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটও রয়েছে। শুধু দক্ষ জনবল থাকলেই নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত হবে না। ওষুধ সংরক্ষণ, রোগ শনাক্তকরণ, ইনজেকশন দেয়ার প্রটোকল, অস্ত্রোপচারের আগে যাচাই এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেয়ার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া অনেক সময় রোগীর পূর্ববর্তী রোগ, ওষুধে অ্যালার্জি কিংবা চলমান চিকিৎসার পূর্ণ তথ্য চিকিৎসক বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে থাকে না। এতে ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন : চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথের (ডিপিপিএইচ) আহ্বায়ক এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক রশিদ-ই-মাহবুব ভোরের কাগজকে বলেন, চিকিৎসাসেবা দেয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের ভুল হওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক কিংবা অসম্ভব কিছু নয়। তবে দেখতে হবে ভুল করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের কোনো অবহেলা ছিল কিনা। যদি অবহেলার কারণে কোনো রোগী ভুক্তভোগী হয়, সেটা খুবই অনাকাক্সিক্ষত। এ বিষয়ে আরো বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের জাতীয় কমিটির সিনিয়র এই নেতা বলেন, বিএমডিসি আসলে শাস্তি নিশ্চিতের কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি চিকিৎসক নিবন্ধন বাতিল। এর বাইরে জেল জরিমানা করতে পারে না। নিজ সক্ষমতায় বিএমডিসি অনেক কিছু করে ফেলবে- এটি অপ্রত্যাশিত। ভুক্তভোগী দ্রুত ক্ষতিপূরণ বা প্রতিকার পেতে টর্ট আইনে (ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবিধান দাবি করে) মামলা করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে এ আইনে কেউ মামলা করতে চান না। এমন মামলা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়। বিএমডিসির সক্ষমতা বাড়ানো এবং অভিযোগগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করার পরামর্শ এই বিশেষজ্ঞের।
গাফিলতি সবসময়ই ইচ্ছাকৃত। অনিচ্ছাকৃত গাফিলতি বলতে কোনো শব্দ নেই বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ জাকির হোসেন। তিনি মনে করেন, দেশের এখন একটি কঠোর ও কার্যকর আইন প্রয়োজন। ২০১৪ সালে একটি স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনের খসড়া তৈরি করা হলেও তা এখনো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েই পড়ে আছে। পরবর্তী সময়ে ২০১৮, ২০২৩ এবং ২০২৪ সালের সংশোধিত খসড়াগুলোতেও বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসেনি। বিএমডিসি সংস্কারের পরিবর্তে এই আইনটি তদারকি ও বাস্তবায়নের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য কমিশন গঠনের পরামর্শ দিয়েছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার কমিশনের এই সদস্য। সেখানে রোগীর একজন প্রতিনিধি ও একজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এই প্রক্রিয়ায় উভয় পক্ষের পাশাপাশি অবশ্যই একটি তৃতীয় পক্ষ, যেমন আইনি বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার সুপারিশ করেন ডা. জাকির হোসেন।
আইন বিশ্লেষক ও জনস্বাস্থ্য আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম জানান, দেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্য খাত ব্যবস্থাপনায় প্রায় ৪৫টি বিচ্ছিন্ন আইন থাকলেও রোগী ও স্বাস্থ্যসেবা দানকারীদের সুরক্ষায় কোনো যুগোপযোগী ও পূর্ণাঙ্গ আইন নেই। তিনি বলেন, দেশে কোনো চিকিৎসক আক্রান্ত হলে বা চিকিৎসাজনিত অবহেলায় কোনো রোগীর মৃত্যু হলে স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন আলোচনায় আসে। তার কয়েক দিন পরই আইনের দাবি ও অধিকার হারিয়ে যায়। গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে এ ঘটনা ঘটে আসছে। এ আইনের বিরোধীরা যত সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী, এ আইনের সুবিধাভোগীরা ততটা সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী নয়। সরকার বদল হয়, কিন্তু নাগরিকদের আইনের অধিকার অর্জন হয় না। দেশের বিদ্যমান আইনে চিকিৎসায় অবহেলা সম্পর্কিত শাস্তি বা দায় নির্ধারণের সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া নেই। এ ক্ষেত্রে মূলত কয়েকটি আইনের ওপর নির্ভর করা হয়। যেমন- একাধিক দণ্ডবিধি অনুযায়ী অবহেলা বা দায়িত্বহীনতার মাধ্যমে সেবাগ্রহীতার স্বাস্থ্য বা জীবনহানির জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে এবং বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০-এর ধারা ২৩ অনুযায়ী পেশাগত নীতিমালা লঙ্ঘনের দায়ে চিকিৎসকের নিবন্ধন বাতিল করা যেতে পারে। তবুও এসব বিধান স্বাস্থ্যসেবা খাতে দায়বদ্ধতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট নয়। ফলে একটি সমন্বিত ও আধুনিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় সুশাসন নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে চিকিৎসা খাতে বেশ কিছু কাঠামোগত ও আইনি সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান, যা রোগীর অধিকার সুরক্ষা ও চিকিৎসাসেবার মান নিশ্চিত করতে বাধা সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে চিকিৎসায় অবহেলার কোনো স্পষ্ট আইনি সংজ্ঞা না থাকায় দায় নির্ধারণ ও বিচার প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে। চিকিৎসক, নার্স, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, চিকিৎসায় সহায়তাকারী, উপকরণ সরবরাহকারী ও রোগীর দায়িত্ব-কর্তব্য নির্ধারণ না থাকলে চিকিৎসায় অবহেলার দায় একতরফা চিকিৎসকদের ওপর বর্তায়। এছাড়া নৈতিকতা লঙ্ঘন ও ক্ষতিপূরণযোগ্য অবহেলার বিষয়গুলো আলাদাভাবে নির্ধারণের বিধান নেই। একটি আধুনিক ও কার্যকর স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি, যা নাগরিকের স্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একটি আধুনিক ও সমন্বিত স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রণীত হলে রোগী ও চিকিৎসক উভয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা, মান নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
