×

প্রথম পাতা

রংপুরে শিক্ষক পরিবার হত্যা

অনেক প্রশ্নেরই জবাব মিলছে না

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের ৩ সদস্য হত্যার ঘটনায় অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো যেমন মিলছে না তেমনি নতুন নতুন তথ্যও সামনে আসছে।

প্রসঙ্গত, গত শনিবার রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি বাসা থেকে জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১৩) লাশ উদ্ধার করা হয়। গত রবিবার ভোরে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারা দুজনই নিহত পরিবারের বাড়ির আশপাশের এলাকার বাসিন্দা এবং পরস্পরের আত্মীয়। ওইদিন বিকালেই তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। গ্রেপ্তারের পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদের এই তথ্য পাওয়া যায় বলে গোয়েন্দা পুলিশ জানায়। ওই দিন বিকালে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা করেন।

এই হত্যার মামলা তদন্তের জন্য মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখাকে (ডিবি) দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ডিবির পরিদর্শক মো. জিন্নাত আলী মামলাটি তদন্ত করবেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা জিন্নাত আলী বলেন, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আব্দুল মাবুদ মিয়া আমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছেন।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আদালতের বিশ্বস্ত সূত্র, তদন্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও পুলিশের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আদালতে অভিযুক্তদের দেয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে গণপতি চক্রবর্তী, প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও আগামী চক্রবর্তীকে বাসার ছাদে হত্যা করার কথা জানিয়েছে। তাদের হত্যার পর সবশেষ দোতলায় ঘরের ভেতরে ঢুকে ছেলে প্রিয়মকে হত্যা করে তারা।

যদিও এর আগে রবিবার সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ আসামিদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিলেন, মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের বিল্ডিংয়ের ওপর দিয়ে ওনাদের ছাদে আসে। ছাদে আসে বৃহস্পতিবার দিবাগত শেষ রাতে। এই দুজন ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে আড্ডা দেয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে পরিচয় গোপন রাখার জন্য তার গলায় থাকা গামছা প্যাঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। তার চিৎকার শুনে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় প্রীতিলতা চক্রবর্তীকেও গামছা প্যাঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর মায়ের চিৎকারে এগিয়ে আসা মেয়ে আগামী চক্রবর্তীকেও গামছা ও রশি দিয়ে গলায় প্যাঁচিয়ে হত্যা করা হয়। খুনিরা জানিয়েছে- আগামী চক্রবর্তী মারা যাচ্ছিল না, প্রায় চার-পাঁচ মিনিট লাগে তার প্রাণ যাওয়ার ক্ষেত্রে। সেই সময় তারা রশি দিয়ে তার গলায় এবং মুখে প্যাঁচিয়ে ধরে। সর্বশেষে ঘুমন্ত অবস্থায় শিশু প্রিয়মকে কাপড় প্যাঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যার পরও দীর্ঘ সময় বাড়িতে অবস্থান করে অভিযুক্তরা। গোসল করেছে, খেজুর ও শসা খেয়েছে,

আবার মাদক সেবন করেছে, স্বর্ণালংকার খুঁজেছে এবং মোবাইল ফোন পানিতে ডুবিয়ে রেখেছে। মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশের প্রাথমিক ধারণা ছিল এটি পরিকল্পিত ডাকাতি। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে যায় তাদের সেই বক্তব্য। বলা হয়, ডাকাতির ঘটনা সাজানো হয়েছিল। অথচ পুলিশেরই দাবি বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকার নেয়া হয়েছিল এবং গ্রেপ্তারদের দেখানো স্থান থেকে সেগুলো উদ্ধারও করা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন স্বর্ণালংকার যদি সত্যিই নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ডাকাতির বিষয়টি পুরোপুরি সাজানো বলা হচ্ছে কেন?

এদিকে এই লোমহর্ষক ঘটনার বিচারের দাবিতে স্কুলের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ শোক মিছিল ও প্রার্থনা করেছে। এ সময় রংপুর পুলিশ প্রশাসনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে আগামী দিনের আলটিমেটাম বেঁধে দেয় তারা। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, এত দ্রুত তদন্তের একটি পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টি তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। তারা ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা আরো কেউ জড়িত কিনা, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।

সরিয়ে দেয়া হলো আরপিএমপি আবদুল মাবুদকে

রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার (আরপিএমপি) থেকে মোহাম্মদ আবদুল মাবুদকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) ডিআইজি মু. মাহবুবুর রশীদ। গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তৌছিফ আহমেদ স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ রদবদল করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এসবির ডিআইজি মু. মাহবুবুর রশীদকে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার, ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আসলাম উদ্দিনকে পুলিশ সদর দপ্তরে (টিআর পদে) এবং নোয়াখালী পিটিসির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নূরুল আমীনকে খাগড়াছড়ি এপিবিএন ও বিশেষায়িত ট্রেনিং সেন্টারে বদলি করা হয়েছে।

‘সিসিটিভি ক্যামেরার ভয়েই বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন করেন সিদ্ধার্থ’

গতকাল মামলার তদন্তকারী সংস্থা রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সহকারী কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ৪ জনকে হত্যার পরও বাড়ির ভেতরে নিজেদের উপস্থিতির আলামত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল সিদ্ধার্থ দাসের। বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকতে পারে- এমন সন্দেহ থেকেই হত্যাকাণ্ডের পর বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন তিনি। এ সময় বৈদ্যুতিক মিটারের তার কাটতে গিয়ে শর্টসার্কিটও হয়, ফলে পুরো বাড়ি বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, পুলিশের কাছে কিছু বিষয় গোপন করলেও আদালতে দুই আসামিই পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জবানবন্দি দিয়েছেন।

ডোমের বয়ানে ধর্ষণের আলামতের তথ্য ভুল- দাবি চিকিৎসকের

এই শিক্ষক পরিবারের ৪ জনের হত্যায় একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসছে। সম্প্রতি মরদেহ সংরক্ষণ কক্ষের ডোমের দেয়া একটি বক্তব্য সামনে আসে। সেখানে মরদেহে ধর্ষণের আলামত পাওয়ার কথা জানা যায়। তবে ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর চিকিৎসক বলছেন ভিন্ন কথা। স্পষ্ট জানিয়েছেন হত্যাকাণ্ডের এই ইস্যুতে ধর্ষণ বা এরূপ কোনো ঘটনা নেই।

ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কুমার বিশ্বাস জানান, ডোমের কাছে মনে হয়েছিল এটা ধর্ষণের আলামতের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো উপাদান। তবে আমরা সেটি ফরেনসিকে পাঠিয়েছি। এর ফলাফলও এসে গেছে। এতে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ডোমের বক্তব্যে যা এসেছে, সেটি তার ভুল অনুমানের বয়ান; যা সত্য নয়। মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবে টেস্ট করা হয়েছে। রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। এছাড়া শরীরে অন্য কোনো ক্যামিকেলের অস্তিত্বও পাওয়া যায়নি।

আসামি ও পুলিশ কর্মকর্তার একই শার্ট নিয়ে চাঞ্চল্য

ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারকৃত সিদ্ধার্থের পরিহিত শার্ট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। মরদেহ উদ্ধারের দিন একই ধরনের শার্ট পড়ে ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তীও। স্থানীয়দের দাবি, আসামি ও পুলিশ কর্মকর্তার পরনে একই ধরনের শার্ট দেখা যাওয়ার বিষয়টি সন্দেহের অবকাশ তৈরি করেছে। তাই বিষয়টি নিয়েও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে সনাতন চক্রবর্তী বলেন, একই ধরনের শার্ট একাধিক ব্যক্তি পরতে পারেন। একই শার্ট আলাদা আলাদা লোক পরতেই পারে। মূল ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিতেই তুচ্ছ বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে।

পুলিশের দাবি নিয়ে সন্দেহ পরিবারের

নিহত প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী বলেন, হত্যার কারণ সম্পর্কে পুলিশের দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছে গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার। কিছুই বুঝতে পারছি না। পুলিশ যে কী করছে, কী হচ্ছে। পুলিশ বলছে ইয়াবাখোর দুজন নাকি এক এক করে চারজনকে মারছে।

গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর জামাতা বিশ্বজিৎ রায় বলেন, পুলিশ যা বলছে তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। দুইটা কম বয়সী ছেলে চারটা মানুষকে মেরে ফেলতে পারে না। আর ওই দুই ছেলের ফিজিক্যাল (শরীরের) যে অবস্থা তাতে তারা চারজনকে মারার ক্ষমতা রাখে না। বিষয়টি নিয়ে অনেক প্রশ্ন আমাদের মধ্যেই আছে। হত্যার শিকার গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির আলমারি ও ড্রয়ার খুলে তছনছ করা ছিল। বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন ছিল। দুই তরুণ যে হত্যা করেছে, তা বিশ্বাস করতে চাইছে না তাদের পরিবার।

ঘটনার রাতে নিজ বাড়িতে ছিলেন না সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ

অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ হত্যার ঘটনার দিন রাতে নিজ বাড়িতে ছিলেন না। তবে মরদেহ উদ্ধারের সময় সিদ্ধার্থ আশপাশে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে পাশের একটি বাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েন। আর মুগ্ধ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে গেলেও পরে তাকে ধাওয়া দিয়ে আটক করা হয়। হত্যাকাণ্ডের সেই রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাসের নিজ বাড়িতে অবস্থান না করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তাদের অভিভাবকরা।

মুগ্ধের মা বলেন, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাতে মুগ্ধ এবং বাড়িতে বেড়াতে আসা তার নানিসহ ১০টার দিকে আমরা খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ি। মুগ্ধ তার রুমে চলে যায়। আমি এবং আমার মাসহ গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির কাজ করছিলাম। আমি জানতাম না যে, মুগ্ধ রুমে নেই। সে কখন বেরিয়ে গেছে জানি না। পরের দিন বাসায় এলে কেন বাসায় ছিল না জানতে চাইলে মুগ্ধ জানায়, সে নাকি বল খেলতে গিয়েছিল। এরপর আর কথা না বাড়িয়ে আমি নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। তবে ছেলে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে- এমন আশঙ্কা থেকে মাসখানেক আগেও ছেলেকে সতর্ক ও এসব থেকে দূরে থাকার উপদেশ দেন তিনি।

সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস বলেন, সিদ্ধার্থ মাঝেমধ্যে প্রতিবেশী বন্ধু ও আত্মীয়ের বাড়িতে ঘুমাত। বৃহস্পতিবার ওই রাতে সে বাড়িতে না থাকায় ধারণা করেছিলাম হয়তো সেখানেই ঘুমিয়েছে। শনিবার রাতে মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ এসে সিদ্ধার্থকে যখন খুঁজছিল, তখন নিজে গিয়ে প্রতিবেশী এক কাকার বাড়ি থেকে সিদ্ধার্থে ডেকে দেই। এরপর পুলিশ তাকে আটক করে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

গারো পাহাড় সীমান্তে মাদকের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, টহলের খবর পৌঁছে যায় আগেই

গারো পাহাড় সীমান্তে মাদকের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, টহলের খবর পৌঁছে যায় আগেই

জমি সংক্রান্ত বিরোধে মারধর, এলাকাবাসীর প্রতিবাদ

জমি সংক্রান্ত বিরোধে মারধর, এলাকাবাসীর প্রতিবাদ

নবম পে স্কেলের গেজেট আটকে আছে যে কারণে

নবম পে স্কেলের গেজেট আটকে আছে যে কারণে

তারা মুখে বলে ‘বন্ধু’: ভারতকে নিয়ে চিফ হুইপ

তারা মুখে বলে ‘বন্ধু’: ভারতকে নিয়ে চিফ হুইপ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App