×

প্রথম পাতা

মার্কিন অর্থনীতিকেই ‘যুদ্ধে’ নামাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প

Icon

মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্কিন অর্থনীতিকেই ‘যুদ্ধে’ নামাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প

ফাইল ছবি

এবার একদিকে মিত্র কানাডা, অন্যদিকে ইরানের অর্থনীতিকে নিয়ে খেলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নতুন করে গাড়ি, ট্রাক, মোটর পার্টস বা গাড়ির যন্ত্রাংশ ও ইস্পাতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে কানাডাকে চাপে রাখতে চাইছেন তিনি। তবে উল্টো মার্কিন পণ্যের ওপর সমপরিমাণ পাল্টা শুল্ক আরোপ করে জবাব দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্টিল, ইলেকট্রনিকস ও অন্যান্য পণ্যের ওপর এই শুল্ক বসবে। এতে বেশ চটেছেন ট্রাম্প। সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কানাডার চেয়ে ধনী ও শক্তিশালী হিসেবে উল্লেখ করে অটোয়াকে ‘লাইনে আসতে’ বলেছেন তিনি।

কানাডার সঙ্গে নতুন করে এই উত্তেজনার আগেই গত ছয় মাস ধরে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছেন ট্রাম্প। তেহরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে মরিয়া হয়ে আছেন তিনি। তবে দেশটিকে পরাস্ত করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাত্রা আরো বাড়ানো হয়েছে।

যদিও ট্রাম্পের এই অবস্থানের বিপরীতে একদমই ভীত নয় কানাডা কিংবা ইরান। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ ও অতিপ্রয়োজনীয় খনিজ সম্পদ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ারও হুমকি দিয়েছে কানাডা। অপরদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে প্রতিশোধ নেয়ার অঙ্গীকার করেছে তেহরান। দেশটি বলছে, ওয়াশিংটনের চাপের কাছে নতিস্বীকার করবে না ইরান।

মূলত কানাডার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন শুরু হয় গত শুক্রবার থেকে। এদিন মধ্যরাত থেকে কানাডার পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প। যা প্রায় ২০ বিলিয়ন (২ হাজার কোটি) ডলার মূল্যের। এর আগে কয়েক দিন ধরে দুই দেশের মধ্যে নিবিড় আলোচনা চললেও শুক্রবার রাতে কোনো বাণিজ্যচুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি তারা। এতে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য অংশীদার ও মিত্র এই দুই দেশের মধ্যকার নাজুক সম্পর্ক আরো খারাপ হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তি (ইউএসএমসিএ) নামের মহাদেশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎও বেশ জটিল হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন: হাসপাতালে আগুনে ১৪ নবজাতকের মৃত্যু

শুল্ক আরোপের এ ঘটনার কয়ের ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা পদক্ষেপ নেন মার্ক কার্নি। শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমপরিমাণ পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্টিল, ইলেকট্রনিকস ও অন্যান্য পণ্যের ওপর এই শুল্ক কার্যকর হবে।

তবে এই ঘটনার রেশ ধরে পাল্টাপাল্টি উত্তেজনাকর অবস্থান ধরে রেখেছে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র। গত সোমবার বার্তা সংস্থা এপিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে অন্টারিও প্রদেশের সরকারপ্রধান ডগ ফোর্ড বলেন, ‘সব পথই খোলা আছে। যা করা প্রয়োজন, আমি তা-ই করব।’

অন্টারিও প্রদেশ যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ রপ্তানির মূল্য বাড়িয়ে দিতে পারে কিংবা সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে বলে জানান তিনি। ফোর্ড বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ লাখ বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ জোগাই।’ ট্রাম্প যদি কানাডার উৎপাদনশিল্প ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়ে যান, তবে তাকে ‘একগাদা ব্যাটারি সঙ্গে রাখতে হবে’ বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

ফোর্ডের এ মন্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছেন ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রæথ সোশ্যালে ফোর্ডের বক্তব্যকে ‘ফাঁকা বুলি’ বলে উড়িয়ে দেন তিনি। অন্টারিওর এই সরকারপ্রধানকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার পাশাপাশি কানাডার নেতাদের ‘সোজা লাইনে’ আসারও (অবাধ্য না হওয়ার) তাগিদ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ট্রাম্প লিখেছেন, ‘কারো উচিত এ ভাঁড়গুলোকে ‘সাজা লাইনে’ নিয়ে আসা, অন্যথায় কানাডার জন্য এর পরিণাম আরো ভয়াবহ হবে!’ পোস্টে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে আবারো ‘গভর্নর কার্নি’ বলে কটাক্ষ করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অনেক বড়, ধনী ও শক্তিশালী’ দাবি করে ট্রাম্প বলেন, দক্ষিণের এ প্রতিবেশী রাষ্ট্রটিকে ছাড়া কানাডা ‘টিকতেই পারবে না’। তবে ট্রাম্পের এ ব্যক্তিগত আক্রমণের জবাবে গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ডগ ফোর্ডও বেশ চড়া ভাষা ব্যবহার করেন। ফোর্ড বলেন, ট্রাম্প যতই হুমকি দেন না কেন, তিনি তাকে বা তার হুমকিকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করেন না এবং তার সামনে মাথা নত করবেন না।

আরও পড়ুন: স্বামীকে লুকিয়ে ১২ লাখ টাকা সঞ্চয়! বক্স খুলে হতবাক স্ত্রী, অতঃপর…

ডগ ফোর্ড মনে করেন, অটোয়ার (কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার) উচিত, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে আরো কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া। এর মধ্যে জ্বালানি তেল, পটাশ ও কৌশলগত খনিজ সম্পদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

অন্যদিকে একই দিন ইরানের বিরুদ্ধে নতুন পদক্ষেপগুলো ঘোষণা করেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। এ সময় ইরানকে একঘরে করার ঘোষণা দেন তিনি। তবে সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে বিরত থাকেন স্কট বেসেন্ট। বলেন, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রাখলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে ডলারের ওপর নির্ভরশীল বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বের করে দেয়ার ঝুঁকিতে পড়তে হবে।

কোন কোন দেশকে লক্ষ্য করে এসব নিষেধাজ্ঞা দেয়া হবে, তা জানাননি বেসেন্ট। এসব শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কবে কার্যকর হবে, সেটিও বলেননি তিনি। তার ভাষ্য, নতুন নির্দেশনা মেনে নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে সময় দেয়া হবে। তবে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ৬০ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। এ তালিকায় ইরানের তেল-বাণিজ্যে সহায়তা করার অভিযোগ থাকা চীনের কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান নেই।

ওই নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিলে তারা সামরিক জবাব দেয়ার পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি আরো কমিয়ে দিতে পারে। পরে ইরানের অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।’

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে মাদানিজাদেহ বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই, শত্রæরা আমাদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক সন্ত্রাসী হামলা চালাতে চায়। কিন্তু আমাদেরও নিজস্ব হাতিয়ার আছে এবং আমরা জানি কীভাবে এ খেলা খেলতে হয়। আমাদের প্রতিরক্ষা এখন আর শুধু আত্মরক্ষামূলক নয়; শত্রæদের হামলার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’

ইরানি অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, চীন ও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের এসব পদক্ষেপ ‘গ্রহণ করেনি’। অন্য দেশগুলোও এসব নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি। রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরানের অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ ও জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোতে বড় ধরনের আঘাত হানা হবে। এ তথ্য জানিয়েছে প্রেস টিভি।

ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, সোমবার প্রশাসনের বক্তব্য থেকে মনে হচ্ছে, ট্রাম্প এবার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকেই যুদ্ধে নামাচ্ছেন। তিনি কানাডার সঙ্গে অসম বাণিজ্যচুক্তি করতে চান। একইসঙ্গে ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে চাইছেন। দুই ক্ষেত্রেই ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা অনিশ্চিত। কারণ, নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় এর আগে যখনই অর্থনৈতিক পরিণতি স্পষ্ট হয়েছে, ট্রাম্প তখনই পিছু হটেছেন।

তারা আরো বলেন, একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এ প্রশাসন আরো অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের ওপর নির্ভর করছে। যদিও কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নানা স্তরের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে ইরান। এসব নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও তাদের নেতৃত্বকে নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি।

উল্লেখ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করেন, তিনি ও যুক্তরাষ্ট্র এতটাই শক্তিশালী- শত্রæ-মিত্র উভয়ই তার ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করবে। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তার নেয়া পদক্ষেপগুলো এই আকাক্সক্ষাকে স্পষ্ট করেছে। কিন্তু এখন ইরান ও কানাডার সামনে ক্ষমতার দর্শনটি এক কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায্য শুল্ক ও বাণিজ্য নীতির বিরুদ্ধে মার্ক কার্নির অবস্থান কানাডার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি দৃঢ় ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। যা প্রমাণ করেছে জাতীয় স্বার্থ ও আত্মমর্যাদার কাছে আপস করা যায় না। একইভাবে জবাব দিচ্ছে ইরানও।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

বিএনপির পাঁচ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা

বিএনপির পাঁচ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা

শরিফুলের রেকর্ডে বড় লাফ, এগোলেন মুশফিক-মিরাজও

ক্রিকেট র‍্যাঙ্কিং শরিফুলের রেকর্ডে বড় লাফ, এগোলেন মুশফিক-মিরাজও

এক ডাক্তারের কাঁধে ৪১ হাজার রোগী!

এক ডাক্তারের কাঁধে ৪১ হাজার রোগী!

এই সরকারও যাতে ফ্যাসিস্ট হয়ে না ওঠে, প্রয়োজন সঠিক রোডম্যাপ

আইনমন্ত্রী এই সরকারও যাতে ফ্যাসিস্ট হয়ে না ওঠে, প্রয়োজন সঠিক রোডম্যাপ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App