×

শেষের পাতা

নিষিদ্ধের ২২ বছরেও কমেনি দাপট

‘পলিথিন’ যেন মারণাস্ত্র

Icon

সেবিকা দেবনাথ

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

‘পলিথিন’ যেন মারণাস্ত্র

 শহর কিংবা গ্রাম, ছোট কাঁচাবাজার কিংবা বড় শপিংমল; সবখানেই দেখা মেলে পলিথিনের। জীবনকে সহজ করার নামে পলিথিন নামের ‘মারণাস্ত্র’ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আমরা নিজেরাই নিজেদের মৃত্যু ডেকে আনছি। অথচ ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে ২০০২ সালেই পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিল সরকার। কিন্তু সর্বত্র অবাধ ব্যবহার দেখে বোঝার কোনো জো নেই যে পলিথিন আসলে অবৈধ। মাঝেমধ্যে পলিথিনবিরোধী কিছু অভিযান পরিচালিত হলেও এর কোনো প্রভাবই যেন পড়ে না জনমনে। আর এ কারণেই নির্বিচারে পলিথিন ছড়িয়ে পড়ছে নদীনালা, খালবিল, ফসলের ক্ষেত এমনকি সমুদ্রেও।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্লাস্টিক দূষণের শিকার হওয়া দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম সারিতেই। চিপসের প্যাকেট থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পণ্য প্রতিনিয়ত যে পরিমাণ ফেলা হচ্ছে চারপাশে, তা নির্ধারণ করা মুশকিল। পলিথিন মাটিতে মিশে যেতে সময় লাগে ২০০ থেকে ৪০০ বছর। পলিথিনের ব্যবহারের কারণে ৩ ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এটি মাটি ও পানিকে দূষিত করছে। তৈরি করছে জলাবদ্ধতা। এটি পোড়ানোর কারণে দূষিত হচ্ছে বায়ু। শেষ পর্যন্ত এটি বায়ু অ্যাকুমিউলেশন পদ্ধতিতে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। ফলে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

গবেষণা তথ্য কী বলছে : কর্ণফুলী নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে ২০১৯ সালে চার বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প শুরু করেছিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এজন্য চীন থেকে আনা হয়েছিল ‘সাকশন ড্রেজার’। কিন্তু নদীর তলদেশে জমে থাকা পলিথিনের স্তর অত্যাধুনিক এই ড্রেজার দিয়েও সরানো যাচ্ছিল না। পরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভৌগোলিক বিশেষজ্ঞদলের গবেষণায় জানা যায়, নদীর তলদেশে ২ থেকে ৭ মিটার পর্যন্ত পলিথিন ও প্লাস্টিকের স্তর জমেছে। কর্ণফুলী বা বুড়িগঙ্গা নদীই নয়, সমুদ্রেও মিলছে পলিথিন বা প্লাস্টিক বর্জ্য। বেশ কিছু দিন আগে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বিশালাকৃতির মৃত তিমি ভেসে আসে। এই তিমি দুটির মৃত্যুর কারণ চিহ্নিত করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা দেখেছেন, এর অন্যতম কারণ পলিথিন বা প্লাস্টিক বর্জ্য। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পেটে প্লাস্টিক বর্জ্য গিয়েই তিমি দুটির মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা ও একে ঘিরে থাকা নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুরে দিনে পলিথিনের ব্যবহার ৮০ হাজার টন। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের ৬০৮ পয়েন্ট দিয়ে নদীতে পলিথিন পড়ছে। এতে শুধু নদীর গতিরোধ নয়, নষ্ট হচ্ছে প্রাণ-প্রকৃতি। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী, বালু এমনকি মেঘনা নদীর মাছের পেটেও মাইক্রো প্লাস্টিক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ খাদ্য হিসেবে মাছ এখন প্লাস্টিক খাচ্ছে। এতে তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি। ২০২২ সালের ‘প্রোলিফারেশন অব মাইক্রোপ্লাস্টিক ইন কমার্শিয়াল সি সল্টস ফ্রম দি ওয়ার্ল্ড লংগেস সি বিচ অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায়, দেশে উৎপাদিত লবণেও মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মিলেছে। এ লবণের প্রতি কেজিতে গড়ে প্রায় ২ হাজার ৬৭৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। সেখানে বলা হয়, দেশের মানুষ যে হারে লবণ গ্রহণ করে তাতে প্রতি বছর একজন মানুষ গড়ে প্রায় ১৩ হাজার ৮৮টি মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করে। ফলে এ বিপুল পরিমাণ লবণের মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

গবেষকরা বলছেন, প্লাস্টিক বা পলিথিনে গরম পানি বা গরম খাবার ঢালার সঙ্গে সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বিসফেলন-এ তৈরি হয়। বিসফেনল-এ থাইরয়েড হরমোনকে বাধা দেয়। বাধাপ্রাপ্ত হয় মস্তিষ্কের গঠনও। গর্ভবতী নারীদের রক্ত থেকে বিসফেনল-এ যায় ভ্রুণে। ফলে নষ্ট হতে পারে ভ্রণ, দেখা দিতে পারে বন্ধ্যাত্ব। শিশুও হতে পারে বিকলাঙ্গ। পলিথিনের বহুবিধ ব্যবহারে বিকল হতে পারে লিভার ও কিডনি। পলিথিনে শুধু গরম খাবার বা গরম পানির ব্যবহারেই ক্ষতি হয় না, স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি বা হিমায়িত (ফ্রিজিং) পানির ব্যবহারেও ক্ষতি হয় সমানভাবে। পলিথিনে মুড়িয়ে ফ্রিজে রেখে সেই খাবার খেলেও সমান ক্ষতি হয়।

সেপ্টেম্বর থেকে পলিথিনের বিরুদ্ধে অভিযান : গতকাল বুধবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ ও পানি উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাংবাদিকদের জানান, তারিখ নির্ধারণ করা না হলেও আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে সারাদেশে পলিথিনের বিরুদ্ধে অভিযান কার্যক্রম চলবে। এর আগে মার্কেটগুলোতে গিয়ে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার বা বিক্রি বন্ধে প্রথমে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় দেয়া হবে। এরপর অভিযান শুরু হবে। রিজওয়ানা হাসান বলেন, অভিযান কার্যক্রমের তারিখ নির্ধারিত হয়নি। কারণ এর সঙ্গে আরো কয়েকটি সংস্থা সম্পৃক্ত। এখন সবাই একটা আন্দোলনের মেজাজে আছে। সবাই সবার দাবি পেশ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওইদিকে ব্যস্ত আছে। তবে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই পলিথিনের বিরুদ্ধে অভিযান কার্যক্রম দেখা যাবে।

আইনে যা আছে : বাংলাদেশে ২০০২ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫-এর পরিপ্রেক্ষিতে পলিথিনের তৈরি ব্যাগ ব্যবহার, উৎপাদন, বিপণন এবং পরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়। আইনের ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি নিষিদ্ধ পলিথিনসামগ্রী উৎপাদন করে তাহলে ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা, এমনকি উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। সেসঙ্গে পলিথিন বাজারজাত করলে ছয় মাসের জেলসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান করা হয়। ২০০২ সাল থেকে তিন-চার বছর পলিথিনের ব্যবহার সীমিত হলেও বর্তমানে যত্রতত্র অবাধে ব্যবহার হচ্ছে। তবে সরকার পলিথিনের ব্যাগ উৎপাদন নিষিদ্ধ করলেও ৫৫ মাইক্রোনের অধিক পলিথিনজাতীয় পণ্য বা মোড়ক উৎপাদনের অনুমোদন দিয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনুমোদিত কাঁচামাল আমদানি করে নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন হচ্ছে। অনুমোদিত কারখানার মালিকরা ছোট কারখানাগুলোর কাছে কাঁচামাল বিক্রি করছে। এছাড়া বিভিন্ন প্লাস্টিক পণ্য তৈরির পর উচ্ছিষ্ট কাঁচামালগুলো রিসাইকেল করে নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ তৈরি হচ্ছে।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) তথ্য মতে, রাজধানীসহ দেশজুড়ে নিষিদ্ধ পলিথিন তৈরির প্রায় দেড় হাজার কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে পুরান ঢাকার অলিগলিতে রয়েছে অন্তত ৩০০-এর বেশি কারখানা। কেরানীগঞ্জ, জিঞ্জিরা, কামরাঙ্গীর চর, মিরপুর, কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও, টঙ্গীতে ছোট-বড় বেশ কিছু কারখানা রয়েছে। যাত্রাবাড়ী থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে আরো শতাধিক কারখানা। এসব কারখানা থেকে সারাদেশে সরবরাহ করা হয় পলিথিন।

প্লাস্টিক বা পলিথিনের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, পলিথিন বা প্লাস্টিক ব্যবহার করা মানে বিপদ ডেকে আনা। পলিথিন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে, মাটির উর্বরতা নষ্ট করে। আবার এই পলিথিন পুড়িয়ে দিলে বায়ুদূষণ হয়। তিনি আরো বলেন, প্লাস্টিক শরীরে ক্যান্সার তৈরি করার প্রথম ১০টি কারণের মধ্যে একটি। মনে রাখতে হবে, সব প্লাস্টিকই ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করে। বাতাস ও পানির মাধ্যমেও মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করে। মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে, যা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি ডেকে আনছে। অথচ পর্যাপ্ত বিকল্পের অভাবে নিষিদ্ধ এই পলিথিন বন্ধ করা যাচ্ছে না।

জানা যায়, পাটের না হলেও পলিথিনের বিকল্প হিসেবে এক ধরনের ব্যাগ দেশে উৎপাদন হচ্ছে। তবে তার দাম সাধারণ পলিথিনের তুলনায় কিছুটা বেশি আর সেগুলোর প্রায় সবই রপ্তানি হচ্ছে পশ্চিমা দেশে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪ বাংলাদেশি

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪ বাংলাদেশি

১০ অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে বদলি

১০ অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে বদলি

অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে ৩ কোটির মানহানির মামলা

অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে ৩ কোটির মানহানির মামলা

বিদ্যুৎ সংকট কমবে কবে, জানালেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা

বিদ্যুৎ সংকট কমবে কবে, জানালেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App