উপকূলীয় এলাকা
লবণাক্ততায় বাড়ছে হৃদরোগের ঝুঁকি
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের উপকূলীয় এলাকার খাবার পানিতে উচ্চমাত্রার লবণাক্ততার উপস্থিতি এবং এর পাশাপাশি হৃদরোগ ও স্ট্রোকের বাড়তি ঝুঁকির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই চিত্র খাবার পানির নিরাপত্তা, জলবায়ু অভিযোজন এবং অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তাকে জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। ‘পানীয় জলের লবণাক্ততা ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব : বাংলাদেশের প্রমাণ ও নীতিগত সুপারিশ’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের নীতি ও ফলাফল প্রকাশ সেমিনারে এই তথ্যগুলো উপস্থাপন করা হয়।
গতকাল সোমাবার আইসিডিডিআর,বি-এর সাসাকাওয়া মিলনায়তনে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন-এর সহযোগিতায় আইসিডিডিআর,বি এই সেমিনারের আয়োজন করে। আইসিডিডিআর,বি-এর সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ড. আলিয়া নাহিদ ‘এনআইএইচআর গেøাবাল হেলথ রিসার্চ সেন্টার ফর নন-কমিউনিকেবল ডিজিজেস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল চেঞ্জ’-এর বাংলাদেশ কর্মসূচির প্রাথমিক ফলাফল উপস্থাপন করেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম। বিশেষ অতিথি, ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি। বক্তব্য রাখেন ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান বাটলার ও আইসিডিডিআর,বি-এর নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, কর্মসূচির আওতায় খুলনার কয়রা ও সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ৭১টি কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতাধীন এলাকার ১৭২টি গ্রামে খাবার পানির উৎসগুলোর লবণাক্ততা পরীক্ষা করা হয়। গবেষকরা মোট ২৭ হাজার ৬৯৭টি পানির উৎস জরিপ করেন, যার মধ্যে ৬ হাজার ৭০৩টি (২৪ দশমিক ২ শতাংশ) খাবার পানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। খাবার পানির উৎসগুলোর মধ্যে কয়রায় ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ উৎসে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে।
ড. আলিয়া বলেন, উপকূলীয় বাংলাদেশের লাখো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জন্য যে পানির ওপর নির্ভর করতে হয়, সেই পানিই এখন ক্রমশ স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। খাবার পানির লবণাক্ততা এখন আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়। পানির মাধ্যমে অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি হৃদরোগ ও কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আর গর্ভাবস্থায় নারীরা বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
গবেষণায় আরেকটি অংশে কয়রা ও আশাশুনির ৪০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও মূল্যায়ন করা
হয়। তাদের মধ্যে প্রায় প্রতি ৫ জনে একজনের (২১ দশমিক ৬ শতাংশ) আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (হৃদরোগ কিংবা স্ট্রোক) এর ঝুঁকি (কমপক্ষে ১০ শতাংশ বা তার বেশি) রয়েছে বলে অনুমান করা হয়েছে। এর হার কয়রায় ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গবেষকগণ পানি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয়ে একটি সমন্বিত ইন্টারভেনশন প্যাকেজ তৈরি করেছে। পানিবিষয়ক কর্মসূচির লক্ষ্য হলো, কমিউনিটি সচেতনতা বাড়ানো, পানির উৎসের সুষ্ঠু পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন ও নজরদারি জোরদার করার মাধ্যমে নিরাপদ খাবার পানির প্রাপ্যতা বাড়ানো। এর মধ্যে রয়েছে কমিউনিটি রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম, পন্ড স্যান্ড ফিল্টার এবং টিউবওয়েল, পাশাপাশি খাবার পানির উৎসের জন্য একটি প্রস্তাবিত ডিজিটাল রেজিস্ট্রি ও মনিটরিং ব্যবস্থা।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত কার্যক্রমে কমিউনিটি মোবিলাইজেশন ও স্বাস্থ্য শিক্ষার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের ডিজিটাল সেবাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এটি অ্যালগরিদম-ভিত্তিক ‘ক্লিনিক্যাল ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেম’-এর মাধ্যমে স্ক্রিনিং, রেফারেল, চিকিৎসা ও ফলো-আপ কার্যক্রমে সহায়তা করবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতেই উভয় কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে।
গত প্রায় দুই দশক ধরে উপকূলীয় বাংলাদেশে পরিচালিত গবেষণায় খাবার পানির লবণাক্ততা, বিশেষ করে সোডিয়ামের আধিক্যের সঙ্গে রক্তচাপ বাড়ার যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
