×

রাজশাহী

প্রবাসীদের কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ‘জিনের বাদশারা’

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২২ পিএম

প্রবাসীদের কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ‘জিনের বাদশারা’

ছবি: সংগৃহীত

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার সীমান্তঘেঁষা চৌমহন গ্রামে গড়ে উঠেছে ‘জিনের বাদশা’ ও ‘তান্ত্রিকদের’ চক্র। তারা বিভিন্ন কৌশল ও পন্থায় প্রতরণা করে মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী।

এসব চক্র প্রথমে নানা নাটকীয়তা সৃষ্টি করে। তারপর একটা ভিতিকর পরিবেশে মানুষকে জব্দ করে।

যেমন: গলা থেকে পা পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে রাখা। চারপাশে অন্ধকার। চালানো হয় তন্ত্র-মন্ত্রের আসর। ভয়ানক শব্দ, অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি আর নানা কৌশলে তৈরি করা হয় ভৌতিক পরিবেশ। এরপর দাবি করা হয়, হাজির হয়েছে জিন, পরী কিংবা অদৃশ্য কোনো শক্তি। জীবনের যেকোনো সমস্যার সমাধান দেওয়ার কথা বলে এর বিনিময়ে চাওয়া হয় হাজার হাজার টাকা, কখনো বা ছাগল, গরু কিংবা মহিষ।

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার সীমান্তঘেঁষা চৌমহন গ্রামকে ঘিরে উঠেছে এমনই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, ছোট্ট এই গ্রামে গড়ে উঠেছে কথিত ‘জিনের বাদশা’ ও তান্ত্রিকদের একটি চক্র। ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অলৌকিক ক্ষমতার প্রচার চালিয়ে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও ইউরোপে থাকা প্রবাসীদের টার্গেট করে ভয়ভীতি দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন: রোহিঙ্গাদের আর্তনাদ: বিশ্বকে ১০ মিনিটের বার্তা রোহিঙ্গাদের

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, সন্তান অবাধ্য হওয়া কিংবা ব্যক্তিগত নানা সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়ে প্রথমে অল্প পরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়। পরে কথিত জিন-পরীর ভয় দেখিয়ে ধাপে ধাপে আরও টাকা, ছাগল, গরু কিংবা মহিষের দাম দাবি করা হয়। একপর্যায়ে আতঙ্কিত হয়ে ভুক্তভোগীরা দাবিকৃত অর্থ পাঠাতে বাধ্য হন।

প্রবাসীদের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ

মালয়েশিয়া প্রবাসী মো. আলামিন হোসেন জানান, সোহান নামের এক কথিত ‘জিনের বাদশার’ সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ওই ব্যক্তি তাঁর পারিবারিক সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে যোগাযোগ করেন। পরে বিভিন্ন ধরনের ভয় দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে দেড় লাখ টাকার বেশি নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

আলামিন বলেন, তাঁকে বলা হয়, আরও টাকা না দিলে তাঁর ‘বংশ নির্বংশ’ করে দেওয়া হবে। এমনকি পরীর মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের তুলে নিয়ে যাওয়ার ভয়ও দেখানো হয়। এসব কথায় তাঁকে দীর্ঘ সময় আতঙ্কের মধ্যে রাখা হয়েছিল বলে দাবি তাঁর।

লন্ডনপ্রবাসী বদরুল ইসলাম জানান, শুরুতে রাতে ‘হাজিরা’র জন্য ২১ টাকা বা ৩০০ টাকা চাওয়া হতো। এরপর কথিত জিনের চাহিদার কথা বলে ধাপে ধাপে অর্থ নেওয়া শুরু হয়।

বদরুলের ভাষ্য, বিকাশের মাধ্যমে তাঁর কাছ থেকে প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। পরে বলা হয়, ১০১টি ছাগল না দিলে পরী তাঁকে নিয়ে যাবে এবং তাঁর মৃত্যু হতে পারে। পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তিনি ও তাঁর স্বজনেরা আরও অর্থ পাঠান বলে জানান।

গ্রামজুড়ে ‘জিনের বাদশা’ চক্রের অভিযোগ

স্থানীয়দের দাবি, চৌমহন গ্রামে ভোটার সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫০০। এর মধ্যে অন্তত ৩৭ জন কথিত ‘জিনের বাদশা’ রয়েছেন। প্রত্যেকের সঙ্গে ১০ থেকে ১৫ জন করে সহযোগী কাজ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পাশের কুশমাইল ও সংগ্রামপুর গ্রামেও আরও ৮ থেকে ১০ জন কথিত ‘জিনের বাদশা’ রয়েছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।

তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনেকেই ভয় পান। চৌমহন বাজার ও বটতলা মোড় এলাকায় কয়েকজন নারী, তরুণ ও বয়স্ক মানুষের সঙ্গে কথা বললে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকে জানান, তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে বিপদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনের বেলায় অভিযুক্তরা সাধারণ মানুষের মতোই চলাফেরা করেন। তবে রাত নামলেই শুরু হয় কথিত জিন-ভূতের আসর, ভিডিও ধারণ ও অনলাইন প্রচারণা।

আরও পড়ুন: প্রবাসীর স্ত্রীসহ কোটি টাকা নিয়ে উধাও স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা

চৌমহনের বাসিন্দা মিঠুন সরদার বলেন, অভিনয় ও ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেছেন কথিত কবিরাজ ও ‘জিনের বাদশারা’। তাবিজ, কুফরি কাজ কিংবা জিন-ভূতের ভয় দেখিয়ে বিপদে পড়া মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে।

তাঁর দাবি, যারা একসময় বিল-জমিতে কাজ করতেন কিংবা ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তাদের অনেকের জীবনযাত্রায় এখন বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। কেউ কেউ দামি মোটরসাইকেল, গাড়ি ও বাড়ির মালিক হয়েছেন। মানুষের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের একটি অংশ মসজিদ-মাদ্রাসায় দান করে নিজেদের ভালো মানুষ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টাও করা হয় বলে অভিযোগ তাঁর।

বড়াইগ্রামের বাসিন্দা মখলেসুর রহমান বলেন, জিনের ভয় দেখিয়ে প্রতারণার পাশাপাশি এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তাঁর দাবি, এক ইতালি প্রবাসীর কাছ থেকে একটি প্রতারকচক্র এক থেকে দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

তিনি বলেন, টাকা নেওয়ার পর অনেক সময় ব্যবহৃত বিকাশ নম্বর বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে পরে অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের প্রতারণা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

ভিডিও বানিয়ে অনলাইনে প্রচারণা

বড়াইগ্রামের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অহিদুল হক সরকার বলেন, কথিত ‘জিনের বাদশারা’ এলাকার জঙ্গল ও ঝোপঝাড়ে গিয়ে ভৌতিক পরিবেশ তৈরি করেন। কখনো কথিত কবিরাজ, আবার কখনো ভুক্তভোগীর ভূমিকায় অভিনয় করে ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে এসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

তাঁর ভাষ্য, এসব ভিডিও দেখে দূর-দূরান্তের মানুষ যোগাযোগ করলে তাদের পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়। এরপর জিন-ভূতের ভয় দেখিয়ে বিকাশের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়।

অহিদুল হক বলেন, যারা আগে দিনমজুরি করতেন, তাদের অনেকেই এখন কয়েক লাখ টাকা দামের মোটরসাইকেল, গাড়ি ও জমির মালিক। প্রবাসীদের সঙ্গে প্রতারণা করে এসব অর্থ উপার্জন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একজন দিনমজুরের রাতারাতি অর্থবিত্তের মালিক হয়ে ওঠা দেখে অন্যরাও এ পথে ঝুঁকছেন বলে মনে করেন তিনি।

সাংবাদিকদের বাধা ও হুমকির অভিযোগ

প্রতারণার শিকার প্রবাসী ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কথিত ‘জিনের বাদশা’ ইমরান, রিপন, সম্রাট, রাশিদুল ও রোকনুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে সাংবাদিকদের আসার খবর পেয়ে তারা সরে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ সময় তাদের সহযোগীরা মোটরসাইকেলে সাংবাদিকদের গতিবিধি নজরদারি করেন এবং কটূক্তি ও অসহযোগিতা করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া এক কথিত ‘জিনের বাদশা’ মুঠোফোনে স্থানীয় এক সাংবাদিককে হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফোনে ‘গুরুজির অভিশাপ’ দেওয়ার কথা বলে ভয় দেখানোর পাশাপাশি মাটির নিচে পুঁতে ফেলার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়েও ওই ব্যক্তি ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পুলিশের বিশেষ অভিযান

নাটোর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইফতে খায়ের আলম বলেন, ‘জিনের বাদশা’ পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগে এরই মধ্যে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এরপরও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকাটির ওপর সতর্ক নজর রাখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, কেউ আশঙ্কা বোধ করলে কিংবা প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত পুলিশকে তথ্য দিতে হবে। পুলিশের গোয়েন্দা তৎপরতা ও নিয়মিত নজরদারি আরও বাড়ানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চৌমহনে গভীর রাত পর্যন্ত কথিত জিন-ভূতের কর্মকাণ্ডের ভিডিও ধারণ ও অনলাইন প্রচারণা চলে। গ্রামের প্রবেশপথসহ বিভিন্ন গাছে গোপনে ক্যামেরা স্থাপনের অভিযোগও রয়েছে। এতে স্থানীয়দের স্বাভাবিক চলাচল ও জীবনযাত্রায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে দাবি তাদের।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

এশিয়া কাপের প্রস্তুতিতে পুরুষ দলের বিপক্ষে খেলল পাকিস্তান নারী দল

এশিয়া কাপের প্রস্তুতিতে পুরুষ দলের বিপক্ষে খেলল পাকিস্তান নারী দল

প্রবাসীদের কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ‘জিনের বাদশারা’

প্রবাসীদের কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ‘জিনের বাদশারা’

নতুন দায়িত্ব পেলেন শাহে আলম

নতুন দায়িত্ব পেলেন শাহে আলম

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে যা বললেন তথ্যমন্ত্রী

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে যা বললেন তথ্যমন্ত্রী

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App