টিআইবির বিবৃতি
দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয় স্পষ্ট করার তাগিদ প্রতিমন্ত্রীর প্রতি
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। টিআইবি বলেছে, জনস্বার্থে পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে সংবাদকর্মীরা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করলেও তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেছেন। সংশ্লিষ্ট তথ্য জানতে চাওয়াকে যেভাবে ক্ষোভ ও বিদ্বেষমূলকভাবে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, তা কর্তৃত্ববাদী আমলের ‘শুট দ্য মেসেঞ্জার’ চর্চার প্রতিফলন। গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানায় টিআইবি।
প্রতিমন্ত্রীর এমন আচরণের নিন্দা জানিয়ে টিআইবি বলছে, এ ধরনের প্রতিক্রিয়া মুক্ত গণমাধ্যম, স্বাধীন সাংবাদিকতা, বাকস্বাধীনতা ও জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার খর্ব করার শামিল। তাই এমন আত্মঘাতী প্রয়াস পরিহারের পাশাপাশি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নিয়োগকে ঘিরে চলমান বিতর্কের মূল বিষয়, দ্বৈত নাগরিকত্ব সম্পর্কে তার অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, টেকনোক্র্যাট কোটায় দ্বৈত নাগরিকত্বধারী ব্যক্তিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ অসাংবিধানিক। সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্য নন এমন কাউকে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে তাকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে।
তিনি বলেন, সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জনকারী বা সেই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকারকারী ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য। একই সঙ্গে ৬৬(২ক) অনুচ্ছেদে দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। ফলে দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল থাকা অবস্থায় টেকনোক্র্যাট কোটায় নিয়োগ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেন, এ বিষয়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে নিজের অবস্থান প্রকাশ না করে প্রতিমন্ত্রীর পদ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি নিজেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। অথচ বিষয়টি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জনস্বার্থে প্রকাশের লক্ষ্যে সংবাদকর্মীরা যখন সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করেছেন, তখন প্রতিমন্ত্রী সরাসরি উত্তর দেননি। বরং তিনি ‘কে নিউজ করছে’ এবং ‘কার এত জ্বালা’ বলে পাল্টা প্রশ্ন করেছেন, যা পতিত কর্তৃত্ববাদী আমলের ‘শুট দ্য মেসেঞ্জার’ চর্চারই প্রতিফলন।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সংবাদটি কে করেছে বা কে প্রশ্ন তুলেছে, তা মূল বিষয় নয়। মূল প্রশ্ন হলো, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার সময় তার বিদেশি নাগরিকত্ব বহাল ছিল কিনা। এমন একটি সুস্পষ্ট সাংবিধানিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেয়া তার দায়িত্ব। সরকারের শীর্ষ পর্যায়সহ বিভিন্ন অবস্থান থেকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মতপ্রকাশের
স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় পদে থাকা কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে তথ্যভিত্তিক ও সরাসরি জবাব প্রত্যাশিত।
সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক ও আইনগত প্রশ্নের উত্তর এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ প্রকাশের মাধ্যমে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারতেন। তা না করে তার দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রতিবেদনকারী গণমাধ্যম ও প্রশ্ন উত্থাপনকারী সংবাদকর্মীদের প্রতি ক্ষোভ ও বিদ্বেষমূলক পাল্টা প্রশ্ন একজন প্রতিমন্ত্রীর জন্য শোভনীয় নয়, বরং অনৈতিক ও উদ্বেগজনক, বলেন তিনি।
এ ধরনের প্রতিক্রিয়া স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকিস্বরূপ উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এতে সংবাদকর্মীদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ‘চিলিং ইফেক্ট’ সৃষ্টির আশঙ্কা বাড়ে। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অস্বস্তিকর বিষয়ে প্রশ্ন করাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। সর্বোপরি এতে জনগণের তথ্য জানার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় পদকে ঘিরে বিষয়টির আন্তর্জাতিক মাত্রা এবং বাংলাদেশের জন্য অনাকাক্সিক্ষত ও বিব্রতকর বিতর্কের ঝুঁকিও রয়েছে বলে মনে করে টিআইবি।
সংস্থাটি বলেছে, সরকারের পক্ষ থেকে অবিলম্বে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সঠিক ও প্রামাণ্য তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তার নিয়োগের সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্নে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সাংবিধানিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রশ্নকারী সংবাদমাধ্যমকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা মুক্ত গণমাধ্যম ও জনগণের তথ্য জানার অধিকার খর্ব করার শামিল বলেও মনে করছে সংস্থাটি।
