জলাভূমিতে কুঁচিয়া শিকার, জীবিকার লড়াইয়ে চরাঞ্চলের মানুষ
এআর সোয়েব চৌধুরী, চরফ্যাশন (ভোলা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম
কুঁচিয়া শিকারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত রয়েছেন স্থানীয় অনেক দরিদ্র পরিবার। ছবি: ভোরের কাগজ
ভাত-কাপড়ের সংস্থান করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জলাভূমিতে কুঁচিয়া শিকার করছেন চরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষ। সকাল থেকে সন্ধ্যা—কখনো কোমরসমান পানি, কখনো কাদামাটির জলাশয়ে ডুবে চলে তাঁদের নিরন্তর সংগ্রাম। কারও হাতে বাঁশের তৈরি ফাঁদ, কারও হাতে মাছ ধরার সরঞ্জাম। দিনের শেষে পাওয়া কুঁচিয়াই তাঁদের সংসারের খাবার, সন্তানদের পড়াশোনা এবং বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। চরফ্যাশন উপজেলার ওসমানগঞ্জ ইউনিয়নের বিভিন্ন জলাশয় ও আশপাশের এলাকায় এমন জীবনসংগ্রামের দৃশ্য চোখে পড়ে।
স্থানীয়ভাবে কুঁচিয়া শিকারকে কেউ বলেন ‘কুঁচি ধরা’, আবার কেউ বলেন ‘কুঁচিয়া মারা’। দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন স্থানীয় অনেক দরিদ্র পরিবার। এমনই একজন কুঁচিয়া শিকারি অবিনাশ সরকার। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন হরিপদ শর্মার মতো আরও কয়েকজন। অভাবের সংসারে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় বছরের পর বছর তাঁরা জলাশয়ে কুঁচিয়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, অবিনাশের পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ, সন্তানদের লেখাপড়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে কুঁচিয়া শিকারই প্রধান ভরসা। বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে জলাশয়ের অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁদের কাজের ধরনও বদলে যায়। বছরের বড় একটি সময় তাঁরা এই পেশায় নিয়োজিত থাকেন। কুঁচিয়া শিকারে ব্যবহার করা হয় বাঁশের তৈরি বিশেষ ফাঁদ। স্থানীয়ভাবে এগুলো ‘দোয়াইর’ বা ‘কাঁদা’ নামে পরিচিত। বাঁশ-বেত ও প্লাস্টিকের সুতা দিয়ে তৈরি এসব ফাঁদ জলাশয়ের কাদামাটি ও গাছপালার মধ্যে নির্দিষ্ট স্থানে বসানো হয়। পরে কুঁচিয়া ফাঁদে প্রবেশ করলে তা সংগ্রহ করেন শিকারিরা। এ ছাড়া স্থানীয় জলাশয়ে কুঁচিয়া ধরতে বিভিন্ন ধরনের কৌশল ও সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়। জলাশয়ের গভীরতা, কাদার ধরন এবং কুঁচিয়ার বিচরণস্থল বুঝে ফাঁদ বসাতে হয়। অভিজ্ঞতা ছাড়া এ পেশায় সফল হওয়া কঠিন। কুঁচিয়া শিকারিদের আয় নির্ভর করে প্রতিদিনের সংগ্রহের ওপর। কোনো দিন ভালো পরিমাণ কুঁচিয়া পাওয়া গেলেও কোনো দিন প্রত্যাশা অনুযায়ী পাওয়া যায় না। সংগৃহীত কুঁচিয়া স্থানীয় বাজার ও পাইকারদের কাছে বিক্রি করা হয়। স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি কুঁচিয়া ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তবে মৌসুম, আকার, চাহিদা ও বাজারভেদে দাম পরিবর্তিত হয়। ওসমানগঞ্জের লতিফ মিয়ার হাটসহ আশপাশের বাজারগুলোতে কুঁচিয়া কেনাবেচা হয়। স্থানীয় পাইকাররা শিকারিদের কাছ থেকে কুঁচিয়া সংগ্রহ করে পরবর্তী সময়ে বড় বাজারে সরবরাহ করেন। এভাবে শিকারি থেকে পাইকার একটি ছোট অর্থনৈতিক চক্র গড়ে উঠেছে।

কুঁচিয়া শুধু স্থানীয় মানুষের খাদ্য বা জীবিকার উপকরণ নয়; এর বাণিজ্যিক গুরুত্বও রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কুঁচিয়ার চাহিদা রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও কুঁচিয়া রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে জলাভূমিনির্ভর এই পেশা গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কুঁচিয়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে আধুনিক ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে অনেক সময় প্রকৃত শিকারিরা তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য পান না। কুঁচিয়া সাধারণত জলাশয়, বিল, খাল, হাওর ও কাদাযুক্ত পরিবেশে বিচরণ করে। কিন্তু জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট হওয়ার কারণে দেশীয় জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব ও প্রজনন পরিবেশ হুমকির মুখে পড়তে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে কুঁচিয়া শিকারিদের জীবিকায়। কারণ তাঁদের কর্মসংস্থান পুরোপুরি নির্ভরশীল জলাভূমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, জলাভূমি সংরক্ষণ, কুঁচিয়ার প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র রক্ষা, শিকারিদের প্রশিক্ষণ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নত হতে পারে।
চরাঞ্চলের এসব কুঁচিয়া শিকারির অধিকাংশই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। তাঁদের নেই স্থায়ী কর্মসংস্থান, নেই সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। অথচ তাঁদের শ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় জলজ সম্পদ আহরণ ও বাজার অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কুঁচিয়া শিকারিদের তালিকা তৈরি, সহজ শর্তে ঋণ, বিকল্প কর্মসংস্থান, নিরাপদ সংগ্রহব্যবস্থা এবং সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জলাভূমির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। ভাত-কাপড়ের তাগিদে যাঁরা প্রতিদিন জলাশয়ের কাদামাটিতে নেমে কুঁচিয়া খোঁজেন, তাঁদের কাছে এটি নিছক পেশা নয় এটি বেঁচে থাকার সংগ্রাম। চরফ্যাশনের এসব প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গ্রামীণ অর্থনীতির আড়ালে থাকা অনেক শ্রমজীবী মানুষের গল্প এখনো যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি।
