তাহসিফ হত্যা
দীপকে জিজ্ঞাসাবাদে মিলল যেসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:২০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা এম তাহসিফ সাউরি হত্যা মামলায় চার দিনের পুলিশ রিমান্ড শেষে আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে আবারও তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন, হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্যদের শনাক্ত এবং হত্যার কারণ জানতে তাকে নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন দীপকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাসান শাহাদাত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন।
রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, চার দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে দীপ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তবে মামলার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে করা একাধিক প্রশ্নের জবাব তিনি কৌশলে এড়িয়ে গেছেন এবং কিছু বিষয়ে নীরবতা পালন করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ জানিয়েছেন, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে তিনি তাহসিফকে বাসা থেকে ডেকে বাইরে নিয়ে যান। পরে তাহসিফ, দীপ ও মামলার আরেক সন্দেহভাজন আসামি জেরিকা তাসনিম দিশা (১৯) বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরা করেন। একপর্যায়ে দিশা বাসায় চলে যান।
দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে তাহসিফ ও তিনি টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পৌঁছান। পরে সেখান থেকে তুরাগ নদীর তীরবর্তী একটি মাঠের দিকে যাওয়ার সময় কয়েকজন লোককে দেখতে পান তাঁরা। এ সময় দুজন আলাদা হয়ে যান বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন দীপ।
আরও পড়ুন: ‘হাসিনা জীবিত থাকা পর্যন্ত অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলতে পারে’
তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, ঘটনার আগে তাহসিফকে দীপ ও দিশার সঙ্গে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে দেখা গেছে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে সর্বশেষ তাঁদের সঙ্গেই তাহসিফকে দেখা গিয়েছিল। এ কারণে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দীপকে আরও সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে পুলিশ। আবেদনে তদন্তের স্বার্থে আটটি কারণ উল্লেখ করা হয়। সেগুলো হলো—
> বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা প্রাসঙ্গিক সিসিটিভি ফুটেজ আসামির উপস্থিতিতে যাচাই, পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করা।
> ভিকটিমের সঙ্গে নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অবস্থানকালে দীপ কিছু সময়ের জন্য অন্যত্র সরে গিয়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিট কোথায় এবং কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, তা যাচাই করা।
> ভিকটিম, আসামি দীপ ও অন্যদের ব্যবহৃত প্রাসঙ্গিক মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করা।
> মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করা।
> অজ্ঞাতনামা অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করা।
> হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলামত উদ্ধার করা।
> হত্যার উদ্দেশ্য বা মোটিভ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা।
> হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত স্থান নির্ধারণ করা।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে তিনজন
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজে গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে তাহসিফ ও তাঁর বান্ধবীকে প্রবেশ করতে দেখা যায়। তাঁরা একটি মোটরসাইকেলে সেখানে যান। কিছুক্ষণ পর আরেকটি মোটরসাইকেলে করে সেখানে পৌঁছান দীপ।
মোটরসাইকেল পার্ক করার পর তিনজনই রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করেন। অন্য একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তাহসিফ ও তাঁর বান্ধবী লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। এ সময় তাঁরা দীপের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। পরে হেলমেট পরা অবস্থায় দীপ সেখানে পৌঁছালে তিনজন একসঙ্গে বারের লিফটে ওঠেন।
সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থানের পর তিনজন আবার মোটরসাইকেলে করে বেরিয়ে যান।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরে তাহসিফের বান্ধবীকে তাঁর বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে ওই রাতের তাঁদের গতিবিধি, যাতায়াত এবং বিভিন্ন স্থানে অবস্থানের তথ্য সংগ্রহ করছেন তদন্তকারীরা। বিশেষ করে রেস্টুরেন্টে অবস্থান, দীপের সাময়িকভাবে অন্যত্র চলে যাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে টঙ্গীর মাজার বস্তিতে তাঁদের যাতায়াতের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এসব বিষয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যেভাবে উদ্ধার হয় তাহসিফের মরদেহ
গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম গত ৩১ অক্টোবর উত্তরখান থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। পরে তাহসিফের বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে গ্রেফতার দেখায় পুলিশ।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে নৌ-পুলিশ। নতুন করে তিন দিনের রিমান্ডে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের কারণ, ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা এবং তাহসিফের মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ মুহূর্তের গতিবিধি সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।
