এশিয়া কাপ ট্রফি ছাড়া ফিরল ভারতের নারী ক্রিকেটারও, নেপথ্যে কী
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এশিয়া কাপ জিতেও ট্রফি নিতে অস্বীকার জানায় ভারতীয় নারী ক্রিকেট দল। ছবি: সংগৃহীত
গত বছর এশিয়া কাপ জিতেও ট্রফি না নিয়ে ফেরেছিলো ভারতের পুরুষ দল। এবার সূর্যকুমার যাদবদের মতো একইরকম দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হলো হারমানপ্রীত কাউরের দলের সঙ্গে। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল (এসিসি) প্রধান মহসিন নাকভির হাত থেকে ট্রফি নিতে অস্বীকৃতি জানায় ভারত, নাকভিও অনড় থেকে ফের ট্রফি না দিয়ে চলে যান।
বিভিন্ন দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের উত্থান-পতন কিংবা রাজনীতির প্রভাব অনেক সময় ক্রিকেটের মাঠেও এসে পড়ে। কখনও ক্রিকেটের হাত ধরে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু হয়েছে, আবার কখনও মাঠেই কোনো দেশ তার রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছে। রোববার দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত নারী এশিয়া কাপের ফাইনালে তেমনই আরেকটি উদাহরণ তৈরি হলো।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের সীমান্তে উত্তেজনা শুরুর পর থেকেই দুই দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সৌজন্যও অনেকটা কমে এসেছে। পাকিস্তানি খেলোয়াড় ও তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে করমর্দন এড়িয়ে চলেছেন ভারতীয় ক্রিকেটাররা। গত বছর পুরুষ দলের পর এবার নারী ক্রিকেট দলও পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) সভাপতি মহসিন নাকভির কাছ থেকে ট্রফি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির পর প্রশ্ন উঠছে—যে ক্রিকেট বিভিন্ন সময়ে কূটনীতির সেতু হিসেবে কাজ করেছে, সেই ক্রিকেটই কি এখন তার স্বতঃস্ফূর্ত সৌজন্য ও স্পোর্টসম্যানশিপ হারাচ্ছে?
আবারও ট্রফি নিতে অস্বীকৃতি
গত বছরও এশিয়া কাপের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানকে ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন মহসিন নাকভি। এসিসির সভাপতি হিসেবে তিনি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ওই আসরে ভারতীয় পুরুষ দল এশিয়া কাপ জেতার পরও তার হাত থেকে ট্রফি গ্রহণ করেনি।
এবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল নারী এশিয়া কাপের ফাইনালে। শ্রীলঙ্কাকে ৭২ রানে হারিয়ে শিরোপা জেতার পর মহসিন নাকভির হাত থেকে ট্রফি নিতে অস্বীকৃতি জানায় ভারতীয় নারী ক্রিকেট দল।
২০২৫ সালের পহেলগামের ঘটনার পর থেকেই ভারত-পাকিস্তানের রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বেড়েছে। সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের যৌথ বিবৃতিতেও পহেলগামের ঘটনার নিন্দা জানানো হয়েছে। ভারতও এ বিষয়ে বরাবরই কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে।
ফলে রোববারের ঘটনায় ফের স্পষ্ট হলো, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের ছায়া বাইশ গজেও পড়ছে। বিষয়টি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এশিয়া কাপের ফাইনালে কী ঘটল?
রোববার দুবাইয়ে নারী টি-টোয়েন্টি এশিয়া কাপের ফাইনালে প্রথমে ব্যাট করে ভারত নির্ধারিত ২০ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে ১৮৩ রান সংগ্রহ করে। জবাবে শ্রীলঙ্কা ২০ ওভারে ১১১ রানে অলআউট হয়ে যায়। ফলে ৭২ রানের বড় ব্যবধানে জয় পেয়ে শিরোপা জেতে ভারত।
জয়ের পর ভারতীয় খেলোয়াড়েরা নিজেদের মধ্যে উদযাপনে মেতে ওঠেন। অধিনায়ক হরমনপ্রীত কাউরও সেখানে ছিলেন। তবে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তাকে দেখা যায়নি।
আরও পড়ুন: অস্ট্রেলিয়ায় আলো ছড়িয়েই সিপিএলে জায়গা করে নিলেন মিরাজ
নির্ধারিত সময়ের প্রায় ৪০ মিনিট পর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শুরু হয়। এসিসির সভাপতি হিসেবে পুরস্কার বিতরণ করছিলেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি।
আম্পায়ারদের স্মারক এবং রানার্সআপ শ্রীলঙ্কার খেলোয়াড়দের পদক ও পুরস্কারের চেক দেওয়া হলেও বিজয়ী ভারতীয় দলের হাতে ট্রফি তুলে দিতে দেখা যায়নি। দীর্ঘ আলোচনা শেষে ভারতীয় দল জানিয়ে দেয়, তারা নাকভির কাছ থেকে ট্রফি নিতে চায় না। এরপর সেখানেই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শেষ হয়।
খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে ভারতীয় নারী দলের কোচ অমল মুজুমদার বলেন, ‘‘বিসিসিআই যে অবস্থান নিয়েছে, আমরা তার পাশে আছি এবং তাকে সমর্থন করছি। আমাদের কাছে এই টুর্নামেন্ট শেষ এবং আমরাই চ্যাম্পিয়ন। এটুকুই আমাদের জন্য যথেষ্ট। বড় বোর্ডেও লেখা ছিল যে ভারত এশিয়া কাপ ২০২৬-এর চ্যাম্পিয়ন।’’
ভারত ও পাকিস্তানের বক্তব্য কী?
ট্রফি গ্রহণ না করার সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। সংস্থাটির সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া সংবাদ সংস্থা আইএএনএসকে বলেন, ‘‘এশিয়া কাপের ট্রফি নিয়ে একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আমাদের পুরুষ দল প্রায় দেড় বছর আগে এশিয়া কাপ জিতেছিল। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে পহেলগামের ঘটনার পর দেশের মানুষ চান না আমরা প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখি।’’
তিনি বলেন, ‘‘কিন্তু আমাদের সরকারের নীতি হলো, বহুজাতিক টুর্নামেন্টে আমাদের প্রতিটি দেশের বিপক্ষে খেলতে হবে। আমরা সেই নীতি অনুসরণ করে খেলেছি, সব দলের বিপক্ষে দল পাঠিয়েছি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সব শর্ত আমরা মেনে নেব।’’
দেবজিৎ সাইকিয়ার ভাষ্য, ‘‘যে দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আগে থেকেই খারাপ ছিল এবং ২০২৫ সালের এপ্রিলের পর আরও খারাপ হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান এখনো চলছে। তাদের অন্যতম একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা (মহসিন নাকভি), যিনি আমাদের দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছেন। আমরা তার কাছ থেকে ট্রফি নিতে পারি না। দেড় বছর আগে আমাদের ছেলেরা যেমন তার কাছ থেকে ট্রফি নেয়নি, তার সঙ্গে মিল রেখে আমাদের নারী দলও সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, একই রকম পরিস্থিতিতে আমরা ট্রফি নেব না।’’

রোববারের ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে পাকিস্তানও। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ‘ডন’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী ঘটনাটিকে ‘অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি ভারতের ‘খেলাসুলভ মনোভাব’ বা স্পোর্টসম্যানশিপ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। একই সঙ্গে ভারতকে ‘ক্রীড়া সংস্কৃতি ধ্বংসের’ জন্য দায়ী করেন তিনি।
স্থানীয় পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমকে তালাল চৌধুরী বলেন, ‘‘আমাদের ক্রীড়া সংস্কৃতি শান্তি ও ভালোবাসার প্রতীক হয়ে এসেছে এবং অনেক যুদ্ধ অবসানেও ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এখন তা দুর্বল হয়ে পড়ছে।’’
তার দাবি, পাকিস্তান খেলাধুলাকে রাজনীতির অংশ করেনি কিংবা দুই দেশের মধ্যকার সংঘাতের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করেনি।
ক্রিকেট কি সম্প্রীতির জায়গা হারাচ্ছে?
শুধু ভারতীয় দলের ট্রফি গ্রহণে অস্বীকৃতিই নয়, এবারের এশিয়া কাপেও ক্রিকেটের মাঠে রাজনৈতিক সম্পর্কের ছায়া দেখা গেছে। সেমিফাইনালে ভারতের বিপক্ষে খেলার সময় বাংলাদেশের অধিনায়কও ভারতীয় অধিনায়কের সঙ্গে করমর্দন করতে অস্বীকৃতি জানান।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কেও নানা ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। চলতি বছর আইপিএলে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে খেলানোর কথা ঘোষণা করা হলেও পরবর্তীতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে তাকে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে বাংলাদেশ ভারতে আয়োজিত বিশ্বকাপ বয়কট করে।
এগুলোও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রভাব খেলার মাঠে পড়ার উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
ভারতে আইপিএল শুরুর প্রথম মৌসুমে শোয়েব আখতার, উমর গুল ও শোয়েব মালিকসহ পাকিস্তানের জাতীয় দলের ১১ জন ক্রিকেটার খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা না হলেও কোনো মৌসুমেই পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের আর আইপিএলে দেখা যায়নি।
ক্রিকেট কি শুধু খেলা, নাকি কূটনীতির হাতিয়ারও?
ভারত-পাকিস্তানের রাজনৈতিক সমীকরণের ছায়া বাইশ গজে নতুন কিছু নয়। দুই দেশের ম্যাচ বরাবরই ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে আলাদা উন্মাদনা তৈরি করে। তবে অতীতের অনেক ঘটনাই মনে করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্যেও ক্রিকেট কখনও কখনও সৌজন্য ও সম্প্রীতির বার্তা বহন করেছে।
কার্গিল যুদ্ধের পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক যখন প্রায় তলানিতে, তখনও ক্রিকেট সাক্ষী হয়েছিল ভিন্ন ধরনের সৌজন্যের।
২০০৪ সালে ভারতীয় ক্রিকেট দল পাকিস্তানে সফরে যাওয়ার আগে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী ভারতীয় দলের অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলিকে বলেছিলেন, ‘‘খেল হি নহি, দিল ভি জিতিয়ে’’—অর্থাৎ শুধু খেললেই হবে না, মনও জয় করে আসতে হবে।
সৌরভ গাঙ্গুলী তার আত্মজীবনী A Century Is Not Enough: My Roller-coaster Ride to Success-এ ওই সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি জানিয়েছেন, পাকিস্তানে সফরে যাওয়ার আগে বাজপেয়ী কীভাবে তাকে ও তার দলকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
এরও আগে-পরে ক্রিকেটকে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের একাধিক নজির রয়েছে। ২০১১ সালে মোহালিতে ভারত-পাকিস্তান বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল দেখতে পাশাপাশি বসেছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি।
২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পর স্থগিত হয়ে যাওয়া দ্বিপাক্ষিক আলোচনা পুনরায় শুরুর লক্ষ্যে শান্তির বার্তা হিসেবে মনমোহন সিং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে ওই ম্যাচ দেখতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
অর্থাৎ ক্রিকেট শুধু দুই দলের জয়-পরাজয়ের লড়াই নয়, অতীতে কখনও কখনও এটি দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সৌহার্দ্যের সেতুও তৈরি করেছে।
কিন্তু পুলওয়ামা ও পহেলগামের মতো ঘটনা ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে দূরত্ব তৈরি করেছে। সেই দূরত্ব কমাতে কিংবা দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরুর ক্ষেত্রে ক্রিকেট আবারও কোনো ভূমিকা রাখতে পারে—এমন প্রত্যাশা যারা করেছিলেন, দুবাইয়ের এশিয়া কাপ ফাইনালের ঘটনা তাদের সেই আশায় আরও একবার ধাক্কা দিল।
সূত্র: বিবিসি বাংলা।
