আন্তর্জাতিক ফুটবল মাঠে কী আর নামবেন না নেইমার!
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম
ফাইল ছবি
এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ব্রাজিলের আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান ভরসা ছিলেন নেইমার। তাঁর অসাধারণ প্রতিভা, গোল ও নান্দনিক ফুটবলে সমৃদ্ধ হয়েছে সেলেসাওদের অনেক স্মরণীয় মুহূর্ত। তবে সেই অধ্যায়ের এবার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল। ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি নিশ্চিত করেছেন, জাতীয় দলে আর ফিরছেন না নেইমার।
বিশ্বকাপের হতাশা পেছনে ফেলে ব্রাজিলকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছেন আনচেলত্তি। তাঁর সেই পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে তরুণদের নিয়ে একটি নতুন দল গড়ে তোলা। আর সেই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারও আর থাকছে না।
সান্তোসের এই ফরোয়ার্ড আর হলুদ জার্সিতে ফিরবেন না—এ কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন আনচেলত্তি। দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলের ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নেইমারের বিদায়ে যে বড় শূন্যতা তৈরি হবে, সেটিও স্বীকার করেছেন ইতালিয়ান এই কোচ। তবে তাঁর মতে, নেইমারের মতো একজন ফুটবলারের প্রকৃত বিকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়।
‘সিএনএন এস্পোর্তেসকে’ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেইমারের জাতীয় দলে না ফেরার বিষয়টি পরিষ্কার করেন আনচেলত্তি।
ব্রাজিল কোচ বলেন, ‘নিজের অসামান্য মানের কারণেই দলে থাকার পূর্ণ যোগ্যতা তার ছিল। তবে নেইমার নিজেই নিশ্চিত করেছে যে সে আর জাতীয় দলে ফিরতে চায় না। নেইমারের বিকল্প তৈরি করা কখনোই সম্ভব নয়, কারণ সে ছিল এক অসাধারণ ও অনন্য প্রতিভা। এক কথায়, সে একজন অপূরণীয় ফুটবলার।’
আরও পড়ুন: মেসির গোলেও জয়বঞ্চিত মায়ামি, পয়েন্ট খোয়াল শেষ মুহূর্তে
এর মধ্য দিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের পর নেইমারের ভবিষ্যৎ নিয়ে চলা দীর্ঘদিনের জল্পনারও অবসান হলো। চোট, প্রত্যাবর্তন ও নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া নেইমার এবার ব্রাজিলের জার্সিতে আর মাঠে নামবেন না।
তরুণদের ঘিরে নতুন ব্রাজিল
নেইমার অধ্যায়ের সমাপ্তির পর আনচেলত্তি ও জাতীয় দলের পরিচালক রদ্রিগো কায়েতানোর সামনে এখন মূল লক্ষ্য দল পুনর্গঠন। তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ২০৩০ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে একটি নতুন প্রজন্মের দল তৈরি করা, যারা ব্রাজিলকে আবারও বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবে।
সাম্প্রতিক স্কোয়াড ঘোষণাতেও সেই পরিকল্পনার আভাস পাওয়া গেছে। অভিজ্ঞদের পাশাপাশি জায়গা করে দেওয়া হয়েছে প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ ও ঘরোয়া লিগের উদীয়মান ফুটবলারদের।
আগামী চার বছরের পরিকল্পনা তুলে ধরে ২০০৪, ২০০৫ ও ২০০৬ সালে জন্ম নেওয়া ফুটবলারদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন আনচেলত্তি। এমনকি ২০০৮ সালে জন্ম নেওয়া বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান ফুটবলারকেও পর্যবেক্ষণে রাখছেন তিনি।
আনচেলত্তির ভাষায়, ‘আমার মনে হয় আমাদের ধাপে ধাপে এগোতে হবে। এখন মূল নজর দিতে হবে ভবিষ্যৎ গড়ার মতো তরুণদের দিকে—বিশেষ করে ২০০৪, ২০০৫ ও ২০০৬ সালে জন্মানো খেলোয়াড়দের ওপর। এমনকি ২০০৮ সালে জন্মানো অনেক চমৎকার মানের তরুণ ফুটবলারও আমাদের আছে; যারা এখনো নিয়মিত খেলছে না, তবে খেলার পূর্ণ সামর্থ্য রাখে। বয়স বিবেচনা করে ও তাদের প্রাপ্য সময় দিয়ে এখনই এদের পরখ করে নেওয়ার সঠিক সময়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটা ঠিক যে ৩৬ বা ৩৭ বছর বয়সেও একজন খেলোয়াড় দারুণ পারফর্ম করতে পারে, কিন্তু এখন আমাদের তরুণদেরই অগ্রাধিকার দিতে হবে।’
নেইমারনির্ভরতা থেকে দলীয় ফুটবলে
নেইমার যুগে ব্রাজিলকে ঘিরে অন্যতম বড় সমালোচনা ছিল দলের অতিমাত্রায় একজন খেলোয়াড়নির্ভর হয়ে পড়া। ম্যাচের ফল বদলে দিতে নেইমারের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার অভিযোগও ছিল।
আনচেলত্তি সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল গড়ে তুলতে চান। তাঁর পরিকল্পনায় কোনো একক তারকা নয়, বরং দলগত শক্তিই হবে ব্রাজিলের প্রধান অস্ত্র।
তরুণ প্রতিভাদের সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে গড়ে তুলে আধুনিক ফুটবলের গতি ও কৌশলের সঙ্গে ব্রাজিলকে আরও ভালোভাবে মানিয়ে নেওয়াই এখন তাঁর লক্ষ্য।
আনচেলত্তি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, আধুনিক ফুটবলে একক ব্যক্তিনৈপুণ্য নয়, আসল কথা হলো দলগত ফুটবল। অবশ্যই দলে বড় মাপের প্রতিভা থাকলে জেতার সম্ভাবনা বাড়ে, তবে আধুনিক ফুটবল দলগত সংহতির অভাব মোটেও সহ্য করে না। আমরা একক কোনো অসাধারণ তারকার ওপর নির্ভর করতে চাই না, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী সমন্বিত দল গড়ে তুলতেই কাজ করছি।’
অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের বিপক্ষে আসন্ন প্রীতি ম্যাচগুলোতেই আনচেলত্তির এই নতুন পরিকল্পনার প্রাথমিক পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় দলের জন্য কারা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন, এসব ম্যাচে তা যাচাই করতে বেশ কয়েকজন নতুন মুখকে সুযোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নেইমারকে বাদ দিয়ে নতুন প্রজন্মের ওপর নির্ভর করে ব্রাজিলকে পুনর্গঠনের এই প্রক্রিয়া তাই শুধু একজন তারকার বিদায় নয়; বরং সেলেসাওদের ফুটবলে একটি নতুন যুগের সূচনাও হতে পারে।
