×

ঢাকা

শিক্ষাগত যোগ্যতার কড়াকড়ি

সিংগাইর নির্বাচনে হোঁচট খাচ্ছেন অর্ধশিক্ষিত প্রার্থীরা

Icon

মাসুম বাদশাহ, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২১ পিএম

সিংগাইর নির্বাচনে হোঁচট খাচ্ছেন অর্ধশিক্ষিত প্রার্থীরা

ছবি : সংগৃহীত

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে আগাম প্রচার-প্রচারণায় বেশ সরগরম হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক মাঠ। সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ, গণসংযোগ, কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে শোডাউন এবং বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার প্রতিযোগিতায় জমে উঠেছিল নির্বাচনী পরিবেশ। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই মাঠে ছন্দপতন ঘটেছে। আলোচনার কেন্দ্রে এখন জনপ্রিয়তা, দলীয় পরিচয় কিংবা সাংগঠনিক শক্তি নয় প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা।

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়ে হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রুলের পর সিংগাইরের রাজনৈতিক মাঠে দেখা দিয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ। বিশেষ করে যেসব সম্ভাব্য প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তাদের অনেকেই প্রচার-প্রচারণা কিছুটা কমিয়ে দিয়েছেন বলে মাঠপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

তবে হাইকোর্টের রুলকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আদালত এখনো কোনো চূড়ান্ত রায় দেননি। ফলে কারও প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে এমন দাবিও এখনই করার সুযোগ নেই। তারপরও আদালতের রুলের বিষয়টি সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে।

মাঠপর্যায়ে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিংগাইর পৌরসভা ও উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে বিএনপি, জামায়াত ও সমমনা রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি চেয়ারম্যান পদে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে মাঠে রয়েছেন। 

৷ স্থানীয় সূত্রের তথ্যমতে, সিংগাইর পৌরসভায় ৮ জন, বায়রা ইউনিয়নে ৪ জন, জামসায় ৭ জন, বলধারায় ৭ জন, তালেবপুরে ৫ জন, সিংগাইর সদরে ৩ জন, চারিগ্রামে ৪ জন, সায়েস্তায় ৬ জন, চান্দহরে ৬ জন, জয়মন্টপে ৪ জন, জামির্ত্তায় ৬ জন এবং ধল্লায় ৬ জন সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।

এই হিসাবে বিএনপি, জামায়াত ও সমমনা রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭৬ জন। তবে এদের সবাই দলীয়ভাবে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে এই সংখ্যা সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঠপর্যায়ের তৎপরতার হিসাব হিসেবেই বিবেচ্য।

এদিকে শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রশ্ন সামনে আসতেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে ভোটার ও কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। বিশেষ করে যাদের শিক্ষাগত সনদ বা যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তাদের কাছে ভোটারদের প্রশ্ন—নির্বাচনের আইনগত যোগ্যতার মানদণ্ডে তারা শেষ পর্যন্ত টিকবেন তো? এমন প্রশ্নের মুখে কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থী নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে আনছেন। তাদের দাবি, জনপ্রতিনিধি হওয়ার ক্ষেত্রে শুধু শিক্ষাগত সনদকে একমাত্র যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও এলাকার মানুষের আস্থা এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে স্থানীয় সচেতন মহলের একটি অংশ মনে করছে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। সরকারি নথিপত্র, বাজেট, উন্নয়ন প্রকল্প, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও বিভিন্ন আইন-কানুনের সঙ্গে চেয়ারম্যানদের নিয়মিতভাবে কাজ করতে হয়। তাই ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এদিকে সিংগাইরের আওয়ামী লীগপন্থী বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যানদের অবস্থানও রয়েছে ভিন্ন এক বাস্তবতায়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মামলা-মোকদ্দমা ও নানা অভিযোগের কারণে তাদের অনেকে দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে সক্রিয় থাকতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। একমাত্র পৌরসভা ও আরো ৯টি  ইউনিয়নে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিষদের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথাও জানা গেছে।

এরই মধ্যে হাইকোর্টের নির্দেশনার পর সিংগাইরের আটটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে পুনরায় দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের অনুমোদন অনুযায়ী তারা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

তবে দায়িত্ব ফিরে পাওয়ার পরও কয়েকজন চেয়ারম্যান স্বাভাবিকভাবে পরিষদে বসে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পরও নানা কারণে তারা পরিষদে গিয়ে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও কয়েকজন চেয়ারম্যান জানিয়েছেন।

তাদের কেউ কেউ আরও দাবি করেছেন, দায়িত্ব পুরোপুরি ফিরে না পেলে তারা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন স্থগিতের আবেদন করতে পারেন। যদিও এ ধরনের পদক্ষেপের বাস্তবতা নির্ভর করবে আদালতের সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।

 অন্যদিকে মাঠের রাজনীতিতে পিছিয়ে নেই এসব চেয়ারম্যানের অনেকেই। প্রকাশ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা সীমিত থাকলেও কেউ কেউ নীরবে নিজেদের সমর্থক ও ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। কয়েকজন চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজনৈতিক ও আইনগত পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি রাখছেন।

তাদের ভাষ্য, নির্বাচনের পরিবেশ অনুকূলে থাকলে এবং আইনগত বাধা না থাকলে তারা ভোটের মাঠে নামবেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে জয় পাওয়ার ব্যাপারেও তারা আশাবাদী।

শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রশ্নে আওয়ামী লীগপন্থী কয়েকজন চেয়ারম্যানের দাবি, তাদের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের বড় একটি অংশ শিক্ষাগত যোগ্যতার মানদণ্ড নিয়ে সমস্যায় পড়বেন না। তবে কিছু  প্রার্থী এই প্রশ্নে বাদ পড়তে পারেন বলেও তারা মনে করছেন।

সবকিছু মিলিয়ে সিংগাইরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন এখন একাধিক প্রশ্নের মুখে। একদিকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আগাম প্রচার-প্রচারণা, অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সাবেক চেয়ারম্যানদের আইনি লড়াই; তার ওপর যুক্ত হয়েছে শিক্ষাগত যোগ্যতার নতুন বিতর্ক।

হাইকোর্টের রুলের পর সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে তাদের নিয়ে, যারা দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী মাঠে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন কিন্তু শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রশ্নে এখনো নিশ্চিত নন তাদের ভবিষ্যৎ। ফলে এতদিনের গণসংযোগ, কর্মী সমাবেশ কিংবা মাঠের শক্তি শেষ পর্যন্ত কতটা কাজে আসবে, সেটিও এখন নির্ভর করছে আইনগত সিদ্ধান্তের ওপর।

সিংগাইরের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন তাই একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে জনসমর্থন ও রাজনৈতিক শক্তিই কি হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রধান যোগ্যতা, নাকি শিক্ষাগত যোগ্যতার নতুন মানদণ্ডে বদলে যাবে পুরো নির্বাচনী হিসাব? চূড়ান্ত উত্তর মিলবে আদালতের সিদ্ধান্ত ও নির্বাচনী আইন-কানুনের পরবর্তী অবস্থান স্পষ্ট হলে। তবে এরই মধ্যে শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রশ্নে অনেক সম্ভাব্য প্রার্থীর প্রচার-প্রচারণায় ভাটা পড়ায় সিংগাইরের নির্বাচনী মাঠে যে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে কৌতূহল বাড়ছে ভোটারদের মধ্যেও।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

আবারও বাড়ল জেট ফুয়েলের দাম

আবারও বাড়ল জেট ফুয়েলের দাম

সপ্তাহের ব্যবধানে ডিমের ডজন ১৮০ টাকা

সপ্তাহের ব্যবধানে ডিমের ডজন ১৮০ টাকা

স্থানীয় নির্বাচনে এবার ভোট দিতে পারবেন কতজন?

স্থানীয় নির্বাচনে এবার ভোট দিতে পারবেন কতজন?

ইয়াবাসহ ছাত্রদলের দুই নেতা আটক, গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে দিল জনতা

ইয়াবাসহ ছাত্রদলের দুই নেতা আটক, গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে দিল জনতা দল থেকে বহিষ্কার

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App