আন্দোলনের পর বদলে গেল অবস্থান
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
টাঙ্গাইলে জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড ও নাগরিক সংগঠনের ব্যানারে চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইল এবং অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। তারা হলেন- কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন যুবলীগের জেলা কমিটির মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক রাশেদ খান মেনন রাসেল এবং অভিনেতা নূর মোহাম্মদ রাজ্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকা রাশেদ খান মেনন রাসেল গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অবস্থান পরিবর্তন করে ‘নাগরিক সুরক্ষা কমিটি’ নামে একটি সংগঠনে যোগ দেন। এতে তার সঙ্গে যুক্ত হন অভিনেতা নূর মোহাম্মদ রাজ্য।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, আন্দোলনের সময় বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলে যুবলীগ নেতা রাসেলের সরাসরি অংশগ্রহণ ছিল। সরকার পতনের পর নিজেদের অবস্থান আড়াল করতেই তারা সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড ও নাগরিক সংগঠনের কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পেশায় সাংবাদিক রাশেদ খান মেনন রাসেল একটি জাতীয় দৈনিকের টাঙ্গাইল প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, নিজের ফেসবুক পেজকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডেই তাকে বেশি সক্রিয় দেখা যায়। সম্প্রতি জনদুর্ভোগ ও বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা নিয়ে তাদের তৎপরতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজনের প্রশ্ন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে টাঙ্গাইলে বিভিন্ন সংকট ও অনিয়ম নিয়ে তারা তেমন সরব ছিলেন না। অথচ সরকার পরিবর্তনের পর হঠাৎ করেই বিভিন্ন ইস্যুতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন তারা। এর আড়ালে শহরে অস্থিরতা তৈরির কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাঙ্গাইলের এক সরকারি কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফেসবুক পেজে ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। পরে ভিডিও প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন নতুন বাস টার্মিনাল এলাকার এক বেসরকারি ক্লিনিক মালিক। তার দাবি, সম্প্রতি ওই ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক নবজাতকের মৃত্যু হয়। তবে শিশুটির স্বজনদের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ ছিল না। এরপর রাশেলসহ কয়েকজন সাংবাদিক ক্লিনিকে গিয়ে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা আদায় করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে আকুর টাকুর পাড়া এলাকার এক সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে টাঙ্গাইল সদরের তৎকালীন ইউএনওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেছিলেন নূর মোহাম্মদ রাজ্য। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, লৌহজং নদীর তীর উচ্ছেদের কথা বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।
ওই সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তার আরও দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সুবিধা নিয়ে ‘রাজ্য সিনেপ্লেক্স’ চালু করেন অভিনেতা নূর মোহাম্মদ রাজ্য। বর্তমানে তার বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা প্রমাণের কথা তিনি উল্লেখ করেননি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডের আড়ালে বিভিন্ন মানুষকে নানা অভিযোগ বা সমস্যার কথা বলে চাপে ফেলে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের কেউ কেউ বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সমাজসেবার আড়ালে প্রভাব খাটিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিনেতা ও সাংবাদিক নূর মোহাম্মদ রাজ্য। তার দাবি, তিনি কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ নিয়ে সমাজসেবা করেন না। বরং নিজের অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে দীর্ঘদিন ধরে টাঙ্গাইলের দখল-দূষণ, নদী, যানজট ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করছেন।
নূর মোহাম্মদ রাজ্য বলেন, ‘যারা সমাজসেবা করে, তারা তো নিজের খেয়ে করে।’ তার দাবি, নাগরিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে টাঙ্গাইলের একটি নদীর জন্য সরকারি বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ওই নদীর কাজ চলমান এবং বাংলাদেশে মাত্র ১৩টি নদী এ ধরনের সরকারি বাজেট পেয়েছে।
টাঙ্গাইলের বিভিন্ন উন্নয়ন ও নাগরিক সমস্যা নিয়ে নিজের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তার উদ্যোগে প্রায় ৪০ বছর পর পৌরসভার মাধ্যমে একটি উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে। সম্প্রতি টাঙ্গাইলের নতুন বাসস্ট্যান্ডও দখলমুক্ত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ ছাড়া বেবিস্ট্যান্ড এলাকার ফুটপাতসহ বিভিন্ন স্থানের অবৈধ দখল উচ্ছেদেও তার উদ্যোগ ছিল বলে জানান।
দখলদারদের বিষয়ে রাজ্য বলেন, যারা দখল বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত, তারা সবসময় নিজেদের স্বার্থ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। এ কারণেই নাগরিক উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি এসব বিষয়ে কথা বলেন বলে দাবি করেন।
তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, তার ফেসবুক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করলেই তার কাজ ও অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। তিনি দাবি করেন, সাংবাদিক হিসেবে সত্য উদ্ঘাটন করাই তার কাজ।
অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে রাজ্য বলেন, ‘রাজ্যের সঙ্গে বসে ৫০০ টাকার বিরিয়ানি খেয়েছি কিংবা রাজ্য কারও পেছনে ৫০০ টাকা খরচ করেছে- এমন প্রমাণও যদি কেউ দিতে পারে, তাহলে যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নেব।’
লৌহজং নদী নিয়ে নিজের কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন। বিডি ক্লিনের প্রায় ২ হাজার ৭০ জন সদস্যের সহযোগিতায় দুই কিলোমিটার নদী পরিচ্ছন্ন করা এবং চার কিলোমিটার নদীর সীমানা মাপার কাজ হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
রাজ্য জানান, লৌহজং নদী নিয়ে ২০১৫, ২০২০ ও ২০২৪ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিভিন্ন কার্যক্রম হয়েছে। নদী খননের আগে সিএস রেকর্ড অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছেন বলে দাবি করেন।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন যুবলীগের জেলা কমিটির মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক রাশেদ খান মেনন রাসেলের ফোনে একাধিকবার কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।
