কিশোরগঞ্জ গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ‘তদন্তে মেলেনি সত্যতা’
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
কিশোরগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, টেন্ডারে পক্ষপাতিত্ব, ঘুষ-বাণিজ্য ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলে বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। ইতোমধ্যে অভিযোগের বিষয়ে উচ্চ পর্যায় থেকে তদন্ত করে এগুলো ভিত্তিহীন বলে রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। ফলে স্মারকলিপিতে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সঠিক নয় সব গুলোই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
২৫ সেপ্টেম্বর কয়েকজন ঠিকাদারের পক্ষ থেকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে দেওয়া স্মারকলিপিতে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলা হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের এলটিএম ও ওটিএম টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, অগ্রিম অর্থ গ্রহণ এবং ৫২ জন ঠিকাদারকে টেন্ডার প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ভুয়া বা অতিরিক্ত বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন, কিশোরগঞ্জ মডেল মসজিদের ই/এম কাজের বিল দ্রুত পরিশোধ এবং সিকিউরিটি ডিপোজিট ও চেকের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও আনা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্মারকলিপিতে সংশ্লিষ্ট টেন্ডারের পূর্ণ নথি, অংশগ্রহণকারী ঠিকাদারদের তালিকা, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, বিল-ভাউচার কিংবা অর্থ লেনদেনের নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি বলে কিশোরগঞ্জ টিকাদার সমিতির দাবি। ২০২৩ সালের ১ নভেম্বর কিশোরগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন মো. মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর। তাঁর দায়িত্বকালে গণপূর্ত বিভাগের কাজগুলো সরকারি ক্রয়বিধি ও অনলাইন টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কোনো ঠিকাদারকে ব্যক্তিগতভাবে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ সরকারি অনলাইন টেন্ডার ব্যবস্থায় সীমিত। দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে দরপত্র দাখিল, মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ দেওয়ার প্রতিটি ধাপেই নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
আরো পড়ুন: নিখোঁজ দুই মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর সন্ধান মিলল আবাসিক হোটেলে
নির্বাহী প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ দাপ্তরিক সূত্রের দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। এতে কিছু ঠিকাদার অসন্তুষ্ট হয়ে বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন।
স্মারকলিপিতে ৫২ জন ঠিকাদারকে টেন্ডার প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের বক্তব্য, গণপূর্ত বিভাগের শতভাগ দরপত্র অনলাইন প্রক্রিয়ায় আহ্বান করা হয়। ঠিকাদাররা নির্ধারিত নিয়মে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্য দিয়ে দরপত্রে অংশ নেন।
তাদের দাবি, অনলাইন দরপত্র ব্যবস্থায় কোনো নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে ব্যক্তিগতভাবে বাদ দেওয়ার সুযোগ নির্বাহী প্রকৌশলীর একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না। যোগ্যতা, দরপত্রের শর্ত এবং সরকারি ক্রয়বিধি অনুসারে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হওয়ার কথা।
স্মারকলিপিতে এলটিএমের কাজ ওটিএম পদ্ধতিতে সম্পন্ন করে সরকারি রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগও করা হয়েছে। সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় কোনো কাজ কোন পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে, শুধু অভিযোগপত্রে কোনো অনিয়মের কথা উল্লেখ থাকলেই সেটি প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ভুয়া বা অতিরিক্ত বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে স্মারকলিপিতে। সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি, এসব অভিযোগের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট বিল, ভাউচার বা অর্থ উত্তোলনের নথি সংযুক্ত করা হয়নি।
কিশোরগঞ্জ মডেল মসজিদের ই/এম কাজের বিল দ্রুত পরিশোধ এবং সিকিউরিটি ডিপোজিট ও চেকের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়মিত অফিস করেন না এমন অভিযোগও তোলা হয়েছে। এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, “স্যার মাঝেমধ্যে বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন স্থানে অডিট ও কাজ পরিদর্শনে যান। ঢাকায় ও ময়মনসিংহে তাঁর বিভিন্ন সভা থাকে। এ কারণে কোনো কোনো সময় তাঁকে অফিসে পাওয়া যায় না।
সরকারি কোয়ার্টার সংস্কার না করায় সরকারি সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে স্মারকলিপিতে। তবে কোন কোয়ার্টার, কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন ছিল, তার জন্য কত টাকা বরাদ্দ ছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ওপর কী দায়িত্ব ছিল এসব নির্দিষ্ট তথ্য অভিযোগে স্পষ্ট নয় বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি।
সরকারি স্থাপনা সংস্কারের ক্ষেত্রে সাধারণত চাহিদা, বরাদ্দ, প্রশাসনিক অনুমোদন ও দাপ্তরিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়। তাই এ অভিযোগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ছাড়া ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ করা কঠিন।
নাটোরে দুটি বাড়ি এবং ঢাকায় ১০ তলা ভবনসহ বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও স্মারকলিপিতে করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষ এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরের সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য, তিনি কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেননি। বরং সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করে কাজ করার জন্য অধীনস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন।
তাদের দাবি, কোনো কর্মকর্তা বা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে নির্দিষ্ট নথি ও প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তা উপস্থাপন করা উচিত। প্রমাণ ছাড়া একের পর এক অভিযোগ তুলে কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা হলে সেটি তাঁর প্রশাসনিক ও পেশাগত ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, কিশোরগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নিয়মিত ঠিকাদারদের সংগঠন হিসেবে পরিচিত ঠিকাদার সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরিত একটি প্রতিবাদলিপি দেওয়া হয়েছে।
তাদের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলীকে ঘিরে প্রকাশিত অভিযোগ ও সংবাদে প্রকৃত তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। এর প্রতিবাদে সমিতির নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবাদলিপি ও স্মারকলিপি দিয়েছেন।
ঠিকাদার সায়েম আহমেদের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলী কোনো ধরনের অনিয়ম বা অনৈতিক সুবিধার সঙ্গে আপস না করায় একটি পক্ষ তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ ও নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে। কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে নির্দিষ্ট নথি ও প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা উচিত। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে। প্রমাণ ছাড়া একের পর এক অভিযোগ প্রকাশ করা হলে একজন কর্মকর্তার প্রশাসনিক ও পেশাগত ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
