×

ঢালিউড

সালমান শাহ: তিন দশক পরও জট খোলেনি মৃত্যু রহস্যের

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩১ পিএম

সালমান শাহ: তিন দশক পরও জট খোলেনি মৃত্যু রহস্যের

সালমান শাহ। ফাইল ছবি

ঢালিউডের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্ণ হলো আজ। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও তার মৃত্যুরহস্যের জট এখনও খোলেনি। মৃত্যুর ২৯ বছর পর এ ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ এরই মধ্যে নয়বার পিছিয়েছে। আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে।

সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী এখনও বিচারের অপেক্ষায়। ৩০ বছর ধরে ছেলের মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে চেয়ে আসছেন তিনি। তার দাবি, দ্রুত এ মামলার বিচার শেষ করে প্রকৃত সত্য সামনে আনা হোক।

মৃত্যুর পরও অমলিন জনপ্রিয়তা

১৯৯০-এর দশকে অল্প সময়ের ক্যারিয়ারেই দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিলেন সালমান শাহ। ১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেকের পর রাতারাতি তারকা বনে যান তিনি। মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে অভিনয় করেন ২৭টি চলচ্চিত্রে। এর বেশিরভাগই ব্যবসাসফল হয়।

কিন্তু ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে আকস্মিক মৃত্যুর মধ্য দিয়ে থেমে যায় তার পথচলা। এরপর তিন দশক পেরিয়ে গেলেও নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও তার জনপ্রিয়তা কমেনি।

ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহমিদা জামান ইষ্টি বলেন, সালমান শাহকে নিজের চোখে দেখতে না পারাটা তার জীবনের বড় আফসোস।

সালমান শাহ ও তাঁর মা নীলা চৌধুরী

তার ভাষায়, “আমার জীবনের একটা বড় আফসোস হলো সালমান শাহকে নিজের চোখে দেখতে না পারা। উনি বেঁচে থাকলে অবশ্যই গিয়ে দেখা করতাম। এতটা ভালো লাগে সালমান শাহকে।”

ইষ্টির জন্ম সালমান শাহর মৃত্যুর কয়েক বছর পর। তাহলে তার মতো নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে সালমানের জনপ্রিয়তার কারণ কী?

ইষ্টি বলেন, “আমার বাবা-মা দুজনই সালমান শাহর ভক্ত। ছোটবেলায় তাদের কাছ থেকেই সালমান শাহ সম্পর্কে জানতে পারি। অল্প সময়ের ক্যারিয়ারে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে তার সাফল্য এবং এরপর হঠাৎ রহস্যজনক মৃত্যু—এসব বিষয় আমাকে পরে আগ্রহী করে তোলে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিছা নূজহাতের কাছে সালমান শাহর জনপ্রিয়তার কারণ কিছুটা ভিন্ন।

আরও পড়ুন: ‘একদিন শাকিবকে লাঞ্ছিত করেছি, আজ সে নিজের উচ্চতায় প্রতিশোধ নিচ্ছে’

তিনি বলেন, “উনাকে ভালো লাগে, কারণ উনি বাংলা সিনেমার অন্য নায়ক-নায়িকাদের মতো ছিলেন না। বেশ ব্যতিক্রমী ছিলেন এবং তার সবকিছুই ছিল আইকনিক।”

তার মতে, অভিনয় থেকে শুরু করে ফ্যাশন—সব ক্ষেত্রেই সালমান শাহ ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে।

“তার ফ্যাশন, সিনেমা, গান এখনও জনপ্রিয়। বলা যায়, তিনি একটি প্রজন্মের আইকন,” বলেন নাফিছা।

কবরেও ভক্তদের ভিড়

সিলেটের হযরত শাহজালালের দরগাহসংলগ্ন কবরস্থানে সমাহিত করা হয়েছে সালমান শাহকে। মৃত্যুর ৩০ বছর পরও সেখানে ভক্তদের আনাগোনা দেখা যায়।

জামালপুর থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সালমান শাহর কবর জিয়ারত করতে এসেছিলেন এক ভক্ত।

তিনি বলেন, “আমি জামালপুর থেকে আসছি। উনাকে অনেক ভালো লাগে। এজন্য মাজারে এসে তার কবর জিয়ারত করলাম।”

চলচ্চিত্র গবেষক, নির্মাতা ও অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন রাজুর মতে, সালমান শাহকে ঘিরে যে ধরনের দীর্ঘস্থায়ী ভক্তগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বিরল।

তার ভাষায়, সালমানের ফ্যাশন, অভ্যাস ও ব্যক্তিত্ব এখনও দর্শকের একটি অংশ অনুসরণ করে। এ ধরনের প্রভাব অন্য নায়কদের ক্ষেত্রে এতটা দেখা যায়নি।

সালমান শাহ'র কবর

স্কুলে বাদ পড়া নামেই পরিচিতি

সালমান শাহর জন্ম সিলেটের দাড়িয়াপাড়ায়, তার নানাবাড়িতে। আদর করে বাবা-মা তার নাম রেখেছিলেন চৌধুরী মোহাম্মদ সালমান শাহরিয়ার। ডাকনাম ছিল ইমন।

বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। বাবার বদলির কারণে ইমনের শিক্ষাজীবনের শুরু কুমিল্লায়। স্কুলে ভর্তির সময় তার দীর্ঘ নাম নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। শিক্ষকদের পরামর্শে নাম ছোট করার সময় ‘সালমান’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়।

নীলা চৌধুরী বলেন, “তখন স্কুলে সালমানটা বাদ দিয়ে চৌধুরী মোহাম্মদ সালমান শাহরিয়ার রাখা হয়।”

পরবর্তীতে চলচ্চিত্রে অভিষেকের আগে পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের পরামর্শে তার নামের সেই বাদ পড়া ‘সালমান’ শব্দটি আবার ফিরে আসে। নামের সঙ্গে ‘শাহ’ যুক্ত করার ঘটনাটিও ছিল অনেকটা আকস্মিক।

নীলা চৌধুরীর ভাষায়, অভিনেতা নাসিরুদ্দীন শাহর প্রতি তার ভালো লাগা এবং ছেলের নামের ‘শাহরিয়ার’ অংশ থেকেই ‘শাহ’ নেওয়ার প্রস্তাব আসে। শেষ পর্যন্ত নাম হয়—সালমান শাহ।

ছোট পর্দা থেকে বড় পর্দায়

সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন সালমান শাহ। তার নানা কামরুজ্জামান বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এ অভিনয় করেছিলেন। মা নীলা চৌধুরীও রেডিও ও টেলিভিশনে গান করতেন।

মায়ের হাত ধরেই আশির দশকের শুরুতে টেলিভিশনে শিশুশিল্পী হিসেবে সালমানের যাত্রা শুরু হয়। পরে বিটিভির তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে নাটকে অভিনয় করেন। বিজ্ঞাপনচিত্রেও মডেল হিসেবে কাজ করেন তিনি।

সিনেমায় তার প্রথম বড় সুযোগ আসে চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবিরের মাধ্যমে। সেলিনা হোসেনের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ অবলম্বনে নির্মাণাধীন একটি সিনেমায় রইস চরিত্রে অভিনয় করছিলেন সালমান শাহ। তবে ১৯৮৯ সালে আলমগীর কবিরের আকস্মিক মৃত্যুর পর সিনেমাটির কাজ আর শেষ হয়নি।

এরপর আসে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’।

বলিউডের ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’-এর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশে সিনেমাটির অনুমোদিত পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেয় আনন্দমেলা সিনেমা লিমিটেড। পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান নতুন মুখ খুঁজছিলেন। ১৯৯২ সালে সালমান শাহর কাছে আসে সেই প্রস্তাব।

১৯৯৩ সালের মার্চে মুক্তির পর ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ব্যাপক সাফল্য পায়। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।

চার বছরের ক্যারিয়ারে ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে সালমান শাহ হয়ে ওঠেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক।

যে সকালে থেমে যায় জীবন

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। সালমান শাহ তখন স্ত্রী সামিরা হককে নিয়ে ঢাকার নিউ ইস্কাটনের একটি ভবনের ১১ তলার ফ্ল্যাটে থাকতেন। তার বাবা-মা থাকতেন গ্রিন রোড এলাকায়।

সেদিন সকালে ছেলে সঙ্গে দেখা করতে ইস্কাটনের বাসায় গিয়েছিলেন বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও ছেলের দেখা না পেয়ে তিনি ফিরে যান।

পরে পরিবারের কাছে খবর আসে, সালমান শাহ অসুস্থ। দ্রুত ইস্কাটনের বাসায় পৌঁছান তার মা নীলা চৌধুরী।

সালমান শাহর ব্যবহৃত মোটরসাইকেল

তিনি জানান, বাসায় গিয়ে সালমানকে শোবার ঘরের খাটে পড়ে থাকতে দেখেন। পরিবারের সদস্য ও কর্মচারীরা তখন তাকে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

আরও পড়ুন: এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক, তিন দশকেও যার বিকল্প নেই!

পরে তাকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল এবং সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।

ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ নেওয়া হয় এফডিসিতে। সেখানে সহকর্মী ও অসংখ্য ভক্ত তাকে শেষবারের মতো দেখতে ভিড় করেন। পরে সিলেটে দ্বিতীয় জানাজা শেষে হযরত শাহজালালের মাজারসংলগ্ন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

আত্মহত্যা নাকি হত্যা?

সালমান শাহর মৃত্যুর পর তার বাবা রমনা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

তবে মরদেহ দেখে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। তারা দাবি করেন, সালমানকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

পরবর্তীতে কবর থেকে মরদেহ তুলে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত করা হয় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তিন সদস্যের মেডিকেল বোর্ডও আত্মহত্যার আলামত পাওয়ার কথা জানায়। তবে সালমানের পরিবার সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি।

এদিকে ১৯৯৭ সালে রেজভী আহম্মেদ নামে এক ব্যক্তিকে সালমানের পরিবার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে সে সময় জানানো হয়। আদালতে দেওয়া তার জবানবন্দিতে সালমানের সাবেক স্ত্রী সামিরা হকসহ কয়েকজনের নাম উঠে আসে।

তবে পরবর্তীতে রেজভী সেই স্বীকারোক্তি অস্বীকার করেন। তার দাবি, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর এবং তাকে যা বলা হয়েছিল, তিনি তাই বলেছিলেন।

একের পর এক তদন্ত

১৯৯৭ সালের নভেম্বরে দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনসহ তদন্ত শেষে সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

পরিবার ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করলে ২০০৩ সালে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। প্রায় ১১ বছর পর, ২০১৪ সালে কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানেও সালমানের মৃত্যুকে ‘অপমৃত্যু’ বলা হয়।

এরপর সালমানের মা আবারও নারাজি আবেদন করেন। ২০১৬ সালে আদালত তদন্তের দায়িত্ব দেয় র‍্যাবকে।

২০১৭ সালে সালমান হত্যার অন্যতম অভিযুক্ত রাবেয়া সুলতানা রুবির একটি ফেসবুক ভিডিও নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। সেখানে তিনি সালমানকে হত্যা করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় তার স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন জড়িত বলে দাবি করেন। পরে অবশ্য তিনি নিজের সেই বক্তব্য প্রত্যাহার করেন।

পরবর্তীতে তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ২০২০ সালে পিবিআই প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানেও সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তদন্তকারীরা একটি কথিত সুইসাইড নোটের কথাও জানান।

তবে পিবিআইয়ের প্রতিবেদনও প্রত্যাখ্যান করে সালমানের পরিবার।

২৯ বছর পর হত্যা মামলা

পরিবারের দীর্ঘদিনের দাবির পর ২০২৫ সালে আদালত সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা গ্রহণ করে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেয়।

এরপর গত বছরের অক্টোবরে সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় সালমানের সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, সাবেক শাশুড়ি লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, অভিনেতা আশরাফুল হক ডন, বিউটিশিয়ান রাবেয়া সুলতানা রুবি এবং রেজভী আহম্মেদসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়।

অভিযুক্তদের মধ্যে দেশে থাকা ব্যক্তিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। গত ৯ আগস্ট বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করলে অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি।

শাহরুখ খানের সঙ্গে সালমান শাহ। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তোলা

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এবং এর আগে বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রতিবারই বাদীপক্ষ নারাজি জানিয়েছে।

তার ভাষায়, “আমরা আমাদের সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রেখে তদন্ত করছি এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি।”

অভিযুক্তদের বক্তব্য কী?

সালমান শাহর মৃত্যুর জন্য শুরু থেকেই সাবেক স্ত্রী সামিরা হককে দায়ী করে আসছে তার পরিবার। সর্বশেষ হত্যা মামলাতেও তাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। তবে ২০২৪ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সামিরা হক হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন।

তবে সালমানের মৃত্যুর আগে তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহের কথা স্বীকার করেন তিনি। এর কেন্দ্রে ছিলেন নায়িকা শাবনূর। সামিরার দাবি, শাবনূরের সঙ্গে সালমানের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়েছিল।

শাবনূরের সঙ্গে সালমানের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময় গুঞ্জন থাকলেও শাবনূর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, কাজের সম্পর্কের বাইরে সালমানের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না।

অভিনেতা আশরাফুল হক ডনও সালমান হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, সালমান শাহ মারা যাওয়ার দিন তিনি ঢাকার বাইরে ছিলেন।

অন্যদিকে রেজভী আহম্মেদও বিভিন্ন সময় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন।

মামলার অন্য অভিযুক্তদের বেশিরভাগই বর্তমানে দেশের বাইরে অথবা আত্মগোপনে রয়েছেন। তাদের অনেকেই অতীতে সালমান হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

‘এখনও তাকে মিস করি’

সালমান শাহর মৃত্যুর সময় তার হাতে বেশ কয়েকটি সিনেমা ছিল। এর মধ্যে কয়েকটির শুটিং চলছিল। তার আকস্মিক মৃত্যুতে এসব সিনেমার নির্মাতা ও প্রযোজকদের অনেকেই বিপাকে পড়েন।

যেসব সিনেমার সামান্য অংশের শুটিং বাকি ছিল, সেগুলোর কাজ শেষ করতে সালমানের মতো দেখতে তরুণদের ব্যবহার করা হয়। আবার যেসব সিনেমার বড় অংশের কাজ বাকি ছিল, সেগুলোর কিছু বন্ধ হয়ে যায়, কিছুতে নতুন নায়ক নিয়ে কাজ শুরু করতে হয়।

পরিচালক ড. মতিন রহমান বলেন, সালমানের মৃত্যুর কারণে তার একটি সিনেমার অর্ধেক শুটিং বাদ দিতে হয়েছিল এবং এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে।

পরিচালক জাকির হোসেন রাজুর মতে, সালমানের মৃত্যুতে পুরো চলচ্চিত্র অঙ্গনে শোক নেমে এসেছিল।

তিনি বলেন, “প্রযোজক, পরিচালক থেকে শুরু করে শিল্পী, কলাকুশলী—সবাই তখন ভেঙে পড়েছিল। কারণ সালমানের অভাব কাউকে দিয়ে পূরণ করা সম্ভব ছিল না।”

এখনও সিনেমায় রোমান্টিক বা দুরন্ত কোনো চরিত্র লিখতে গেলে সালমান শাহর কথা মনে পড়ে বলে জানান এই পরিচালক।

“এখনও তাকে মিস করি,” বলেন তিনি।

কেন এত বছর পরও জনপ্রিয় সালমান?

সালমান শাহর জনপ্রিয়তার বড় একটি কারণ তার অভিনয়ের স্বাভাবিকতা, ব্যক্তিত্ব এবং ফ্যাশন। নব্বইয়ের দশকে তার পোশাক, চুলের স্টাইল, হাঁটাচলা ও কথাবলার ধরন তরুণদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।

সেই প্রভাব এখনও দেখা যায়।

সালমানের এক ভক্ত মোস্তফা জামান বলেন, তার পোশাক ও কিছু অভ্যাসও সালমানের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত।

নতুন প্রজন্মের দর্শকরাও সালমান শাহর অভিনয় ও ব্যক্তিত্বে আকৃষ্ট হচ্ছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, “উনি একটা ট্রেন্ড সেটার। ওই সময়ই তার ফ্যাশন সেন্স, অভিনয় এবং মার্জিত ভাষায় সুন্দর করে কথা বলা—সবকিছু এখনও মানুষ পছন্দ করে।”

আরেক তরুণ দর্শক আল মুক্তাদিরের কাছে সালমানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় তার স্বাভাবিক অভিনয় ও সংলাপ বলার ধরন।

“তাকে ভালো লাগার অন্যতম বড় কারণ তার ন্যাচারাল ডায়ালগ ডেলিভারি এবং এক্সপ্রেশন। এছাড়া সালমান শাহর ফ্যাশন সেন্সও আমাকে মুগ্ধ করে,” বলেন তিনি।

চলচ্চিত্র গবেষক ও নির্মাতা ড. জাকির হোসেন রাজুর মতে, সালমানের সিনেমার বড় একটি অংশ কিশোর-তরুণ দর্শকদের আবেগ ও রোমান্টিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও তার উপস্থিতি সহজেই তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে পরিচালক ড. মতিন রহমান মনে করেন, সালমানের অস্বাভাবিক মৃত্যুও তার জনপ্রিয়তাকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।

তার ভাষায়, স্বাভাবিকভাবে মৃত্যু হলে হয়তো সালমান এত দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের আলোচনায় থাকতেন না। তার আকস্মিক মৃত্যু তাকে দর্শকের স্মৃতিতে আরও গভীরভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে।

রহস্যের অবসান চান ভক্তরা

সালমান শাহর মৃত্যুর ৩০ বছর পরও সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রয়ে গেছে—তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছিল?

অতীতে একাধিক তদন্তে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও সালমানের পরিবার ও ভক্তদের একটি অংশ তা মেনে নেয়নি। সর্বশেষ হত্যা মামলার তদন্ত এখন সেই পুরোনো প্রশ্নকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

সালমান শাহ স্মৃতি সংসদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মাসুদ রানা নকীবের মতে, যদি আত্মহত্যাই হয়ে থাকে, তাহলে এর পেছনে কারও দায় ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তার ভাষায়, সালমানের মৃত্যু শুধু তার পরিবারকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি; বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনও এর প্রভাব বহন করেছে।

তিন দশক পরও তাই সালমান শাহকে ঘিরে আলোচনা থামেনি। নতুন প্রজন্মের কাছে তার সিনেমা, অভিনয়, ফ্যাশন ও ব্যক্তিত্ব এখনও আকর্ষণের বিষয়। পাশাপাশি তার মৃত্যুর রহস্যও জিইয়ে রেখেছে মানুষের কৌতূহল।

সালমান শাহ নেই, কিন্তু তার চার বছরের চলচ্চিত্রজীবনের প্রভাব এখনও দৃশ্যমান। তার ভক্তদের কাছে তিনি কেবল একজন প্রয়াত নায়ক নন—তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের এক অমলিন অধ্যায়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

প্যারিসে গ্যাস বিস্ফোরণে বাংলাদেশির মৃত্যু

প্যারিসে গ্যাস বিস্ফোরণে বাংলাদেশির মৃত্যু

তুমি আজও বেঁচে আছো আমাদের স্মৃতিতে, ভালোবাসায়: শাবনূর

তুমি আজও বেঁচে আছো আমাদের স্মৃতিতে, ভালোবাসায়: শাবনূর

সম্পত্তি হস্তান্তর বিল শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানোর দাবি

সম্পত্তি হস্তান্তর বিল শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানোর দাবি

ভাঙনে দিশেহারা নদীপাড়ের মানুষ

স্থায়ী বাঁধের দাবি ভাঙনে দিশেহারা নদীপাড়ের মানুষ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App