প্রধানমন্ত্রী
শেয়ারবাজার স্থিতিশীলতায় ১৭ দফা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকার ১৭ দফা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে অতীতে শেয়ারবাজারে কারসাজি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য তুলে ধরেন। অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সভাপতিত্ব করেন।
খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এস কে আজিজুল বারীর পক্ষে পটুয়াখালী-৪ আসনের এক সংসদ সদস্য জানতে চান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শেয়ারবাজারে ধারাবাহিক পতনের কারণ কী ছিল এবং এতে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে কি না।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শেয়ারবাজার-সংক্রান্ত অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। তদন্তে কয়েকজন ব্যক্তি চিহ্নিত হওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে মামলাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এ ধরনের অনিয়মের সঙ্গে আরও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে বিশেষজ্ঞ, বিনিয়োগকারী সংগঠন এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলোর পর্যালোচনায় শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক পতনের পেছনে একাধিক কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে বাজার কারসাজি, কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো-কমানো, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও), বন্ড ও অন্যান্য ইস্যুতে অনিয়ম, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল তদারকি, করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি, আর্থিক তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণ, নীতিগত অসঙ্গতি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, শেয়ারবাজারে কারসাজি, অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে মোট ১ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করেছে। পাশাপাশি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিষয়গুলো দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার একটি উন্নত, স্বচ্ছ ও টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, বাজারে নতুন পণ্যের সংযোজন, বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে ১৭ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অগ্রাধিকার অনুসারে কর্মসূচিসমূহ নিম্নরূপ
১. বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সরকার ৪ জুন পুঁজিবাজার বিষয়ে দক্ষ এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন চেয়ারম্যান ও তিনজন কমিশনারকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে নিয়োগ দিয়েছে।
২. নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বাজারে বিদ্যমান ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করেছে।
৩. লাভজনক সরকারি মালিকাধীন কোম্পানিসমূহের শেয়ার স্টক এক্সচেঞ্জে অফলোডের মাধ্যমে সরাসরি তালিকাভুক্তিকরণে উদ্বুদ্ধ করা। এছাড়া বহুজাতিক কোম্পানিসহ উচ্চ মূলধনসম্পন্ন কোম্পানিসমূহের শেয়ারও স্টক এক্সচেঞ্জে অফলোডের মাধ্যমে সরাসরি তালিকাভুক্তিকরণের সুযোগ সৃষ্টি করা।
৪. এসএমই কোম্পানিসহ ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিসমূহকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা।
৫. পুঁজিবাজার কারসাজি বন্ধে অনিয়ম সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ ও প্রদানকারীর প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও উৎসাহ দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া।
৬. তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের হিসাব নিরীক্ষা, উপর্যুক্ত অডিটরের মাধ্যমে নিরীক্ষার নিমিত্ত নিরীক্ষক ও নিরীক্ষা সংস্থাগুলির প্যানেলে তালিকাভুক্তি নীতিমালা প্রণয়ন করা।
৭. বৈদেশিক পোর্টফোলিও বিনিয়োগ (এফপিআই) অনবোর্ডিং পোর্টাল চালু, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান সংস্কার, ওয়ান স্টপ সিকিউরিটিজ কাস্টডিয়ান সার্ভিস চালু, ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স হ্রাসকরণ, লভ্যাংশ আয়ে দ্বৈত কর বাতিল এবং বিও অ্যাকাউন্ট খোলা ও মূলধন প্রত্যাবসান প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা।
৮. পুঁজিবাজার সংক্রান্ত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলা দায়ের সংক্রান্ত বিধান সিকিউরিটিজ আইনে অন্তর্ভুক্ত করা।
৯. পুঁজিবাজারের সংস্কারকল্পে একটি ‘পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন’ এবং অনিয়ম তদন্তে একটি বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন করা।
১০. পুঁজিবাজারে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে মার্কেট ও পণ্য উভয়ই সম্প্রসারিত করা।
১১. ই-কেওয়াইসির মাধ্যমে অনলাইন ও মোবাইল ভিত্তিক বিও হিসাব খোলা ও ট্রেডিং সুবিধা চালু করা।
১২. বিনিয়োগবান্ধব ও যুক্তিসঙ্গত করনীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া।
১৩. ব্যাংক ও এমএফএস এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবে টাকা জমা ও উত্তোলনের সুবিধা দেওয়া।
১৪. এআইভিত্তিক শক্তিশালী নজরদারির মাধ্যমে বাজারের অনিয়ম ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্তকরণ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ চলমান রাখা।
১৫. তালিকাভুক্ত ইস্যুয়ার কোম্পানিসমূহে সুশাসন জোরদারকরণে সমন্বিত গ্রাহক হিসাবে অর্জিত সুদ আয়ের অংশ বিশেষ বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিলে জমা করার বিধান প্রণয়ন করা।
১৬. আইনকানুন যুগোপযোগী করার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সম্পদ আরও সুরক্ষিত করা।
১৭. সরকারি সিকিউরিটিজসমূহের (ট্রেজারি বন্ড, ট্রেজারি বিল ও সরকারি সুকুক) লেনদেন স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে নিষ্পন্ন করার মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা ইত্যাদি।
